দেশের অর্থনৈতিক মানচিত্র বদলে দিতে বর্তমান সরকারের সুনীল অর্থনীতি বা ব্লু-ইকোনমি মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে বঙ্গোপসাগরে নামছে আন্তর্জাতিক মানের এক বিশাল গবেষণা জাহাজ। প্রায় ১৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে খুলনা শিপইয়ার্ডে তৈরি হতে যাওয়া এই বিশেষায়িত নৌযানটির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা নিজস্ব সক্ষমতায় গভীর সমুদ্রের তলদেশ থেকে জ্বালানি, গ্যাস হাইড্রেট ও মূল্যবান খনিজ সম্পদের নিখুঁত তথ্য অনুসন্ধান করতে পারবেন। বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট (বোরি) এর জন্য প্রথমবারের মতো গবেষণার জন্য এই জাহাজটি প্রস্তুত করতে যাচ্ছে সরকার। সূত্র: ঢাকা পোস্ট প্রতিবেদন
প্রায় ১৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে খুলনা শিপইয়ার্ডে তৈরি হচ্ছে এই আন্তর্জাতিক মানের জাহাজ, যার নকশা করেছে যুক্তরাজ্যের ‘কিল মেরিন’। এর ভেতরের উচ্চপ্রযুক্তির বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি আনা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে; যা ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে বোরির বহরে যুক্ত হবে।
বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা জানান, গবেষণার এই জাহাজ তৈরির মাধ্যমে বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতি বা ব্লু-ইকোনমির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনের খনিজ সম্পদ, জ্বালানি ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের বিশাল ভাণ্ডারকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে কাজে লাগাতে এবার নিজস্ব অত্যাধুনিক গবেষণা জাহাজ দেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটকে (বোরি)।
এই বিশাল উদ্যোগকে সচল ও কার্যকর করতে কক্সবাজার শহরের অদূরে খরুশকূলে মহেশখালী চ্যানেল এলাকায় পন্টুন, জেটি ও গ্যাংওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বোরির বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতা দূর করে গভীর সমুদ্রে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা পরিচালনার মাধ্যমে সমুদ্র অর্থনীতির পথ আরও সুগম হবে।
বোরি জানায়, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে এই বিশেষায়িত জাহাজের নকশা প্রস্তুত করেছে যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক জাহাজ নির্মাণ বিষয়ক খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান ‘কিল মেরিন’। কুয়েত এনভায়রনমেন্টাল এজেন্সির ব্যবহৃত একটি পরীক্ষিত ও সফল গবেষণা জাহাজের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে এই নতুন নকশাটি তৈরি করা হয়েছে। প্রায় ১৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এই জাহাজের ভেতরের আধুনিক বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও উচ্চপ্রযুক্তি সংগ্রহ করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ, চীন, তুরস্ক ও সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত দেশগুলো থেকে।
বোরি ও খুলনা শিপইয়ার্ডের মধ্যকার চুক্তি অনুযায়ী ২০২৮ সালের জুন মাসের মধ্যে এই ভাসমান গবেষণাগারটি সম্পূর্ণ প্রস্তুত করে বোরির বহরে যুক্ত করার কথা রয়েছে। এর পাশাপাশি সমুদ্রের অগভীর উপকূলীয় এলাকা ও মোহনায় দ্রুত যোগাযোগের জন্য তৈরি করা হচ্ছে দুটি ২৫ ফুট দৈর্ঘ্যের উচ্চগতির স্পিডবোট, যা আগামী এক বছরের মধ্যে বোরির হাতে হস্তান্তর করা হবে।
আগে সাধারণ ট্রলারের ওপর নির্ভর করায় বিজ্ঞানীরা গভীর সমুদ্রে গবেষণা করতে পারতেন না। নতুন এই জাহাজের ৩টি বিশেষায়িত ল্যাব এবং সাব-বটম প্রোফাইলার ও সোনার প্রযুক্তির সাহায্যে দেশের ১ লাখ ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটার অর্থনৈতিক অঞ্চলে গ্যাস হাইড্রেট ও মূল্যবান খনিজের নিখুঁত অনুসন্ধান চালানো সম্ভব হবে।
সংস্থাটি জানায়, ২০১৬ সালে সমুদ্রবিদ্যার ছয়টি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীদের এতদিন সাগরের নমুনা সংগ্রহ ও গবেষণার জন্য সাধারণ মাছ ধরার ট্রলার কিংবা বিদেশি জাহাজের ওপর নির্ভর করতে হতো। সাধারণ নৌযানের সীমাবদ্ধতার কারণে সাগরের ওপরের স্তরের কিছু প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হলেও গভীর সমুদ্র বা সমুদ্রতল নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত গবেষণা চালানো সম্ভব ছিল না।
নতুন এই আধুনিক ভাসমান গবেষণাগারে ওয়েট ল্যাব, ড্রাই ল্যাব এবং ডেটা বিশ্লেষণ ল্যাব নামের তিনটি বিশেষায়িত ল্যাবরেটরি থাকবে। যার ফলে সমুদ্র থেকে সংগৃহীত নমুনা মাঝসাগরেই তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষা করা যাবে এবং স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সাহায্যে সেই গবেষণার তথ্য সরাসরি মূল ডেটা সেন্টারে পাঠানো সম্ভব হবে। এই জাহাজে একসঙ্গে ২৩ জন বিজ্ঞানী ও ক্রু সদস্য অবস্থান করে টানা ৮ থেকে ১০ দিন সমুদ্রে ২৪ ঘণ্টা গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন।
বোরি আরও জানায়, জাহাজটিতে যুক্ত হতে যাওয়া সাব-বটম প্রোফাইলার, মাল্টি-বিম ইকো সাউন্ডার এবং সাইড-স্ক্যান সোনারের মতো উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতির সাহায্যে সমুদ্রতলের নিচের স্তরের নিখুঁত ছবি ও ভূ-তাত্ত্বিক গঠন নির্ণয় করা যাবে। এর মাধ্যমে সাগরের নিচে জমে থাকা পলি, মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ভারী ধাতুর নমুনা বিশ্লেষণ করে অতীতের জলবায়ু পরিবর্তনের ইতিহাস এবং সমুদ্রের কার্বন সংরক্ষণের সক্ষমতা নিয়ে গবেষণা করা যাবে। একই সঙ্গে এই প্রযুক্তি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখবে, কারণ এর মাধ্যমে সমুদ্রের তলদেশের গ্যাস হাইড্রেট এবং মূল্যবান খনিজ সম্পদের অবস্থান ও সম্ভাবনা সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য পাওয়া যাবে।
অন্যদিকে, সহযোগী জলযান হিসেবে স্পিডবোট দুটি মূল জাহাজে রসদ সরবরাহ, জরুরি উদ্ধারকাজ এবং সমুদ্র চ্যানেলে দ্রুত নমুনা সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত হবে।
বোরির এই নতুন গবেষণা জাহাজের মাধ্যমে আমরা প্রথমবারের মতো গভীর সমুদ্র ও সমুদ্রতলে নিখুঁত গবেষণা চালাতে পারব। দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের আধুনিক সব যন্ত্রপাতি পরিচালনার শতভাগ সক্ষমতা থাকবে এই জাহাজে, যা বাংলাদেশের সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণ ও সুনীল অর্থনীতি (ব্লু-ইকোনমি) উন্নয়নে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে : আবু শরীফ মো. মাহবুব-ই-কিবরিয়া, জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বিভাগীয় প্রধান, বোরি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকারি দল বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে সুনীল অর্থনীতি ও সমুদ্র সম্পদ রক্ষার টেকসই পরিকল্পনা অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে স্থান পায়। সম্প্রতি কক্সবাজার সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের সুধীসমাজে সমুদ্র অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে তার প্রশাসনের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত খুলনা শিপইয়ার্ডে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম প্রধান অতিথি হিসেবে এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এই উদ্যোগকে দেশের সমুদ্র সম্পদের বিজ্ঞানভিত্তিক ও টেকসই ব্যবহারের একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও নাগরিক সমাজ, যা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনে এক নতুন শক্তির জোগান দেবে।
বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বোরি) পরিবেশ ওশানোগ্রাফি ও জলবায়ু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু শরীফ মো. মাহবুব-ই-কিবরিয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘প্রচলিত দেশীয় নৌযানের সীমাবদ্ধতার কারণে বর্তমানে আমাদের সামুদ্রিক পরিবেশগত গবেষণাগুলো মূলত উপকূলের কাছাকাছি এবং অগভীর পানিতেই সীমাবদ্ধ থাকে। সময়ের দিক থেকেও এগুলো খুব স্বল্প পরিসরে করতে হয়। ফলে সাগরের ওপরের স্তরের তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, প্ল্যাংকটনের উপস্থিতি বা দৃশ্যমান দূষণ পর্যবেক্ষণের বাইরে বড় কোনো অনুসন্ধান চালানো সম্ভব হয় না।’
তিনি বলেন, ‘বোরির এই নতুন গবেষণা জাহাজের (রিসার্চ ভেসেল) মাধ্যমে আমরা প্রথমবারের মতো গভীর সমুদ্র, সমুদ্রতল এবং সাগরের বিভিন্ন গভীরতার পানির স্তরে নিখুঁত গবেষণা চালাতে পারব। দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ও আধুনিক সব যন্ত্রপাতি বহন এবং পরিচালনার শতভাগ সক্ষমতা থাকবে এই জাহাজে, যা বাংলাদেশের সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণ ও সুনীল অর্থনীতি (ব্লু-ইকোনমি) উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।’