শিরোনাম
◈ প্রধানমন্ত্রী বেতনের ১০% সরকারি কোষাগারে জমা দেন, মন্ত্রীদেরও একই আহ্বান ◈ রেফারিদের খেলা প‌রিচালনার মান নিয়ে ক্ষুব্ধ ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টু‌খেল  ◈ খাদ্যপণ্যের দাম কমায় জুনে মূল্যস্ফীতি কমে ৯.১৬ শতাংশ ◈ টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের শঙ্কা, প্রশাসনের মাইকিং ◈ অক্টোবরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, প্রস্তুতি শুরু করেছে ইসি ◈ ভ্যান্সের ‘একমাত্র মিত্র’ মন্তব্যে নেতানিয়াহু: ভারতের মতো আরও বন্ধু রয়েছে আমাদের ◈ অতিরিক্ত বিল নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের নতুন বার্তা ◈ ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ, মহাসড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজট ◈ 'খেলা শেষ, খোদা হাফেজ': কী ইঙ্গিত করে লিখলেন মাহফুজ আলম ◈ বরিশালের আলোচিত নির্যাতনকাণ্ড: লিটুর পাশে ছিলেন যুবদলের পদধারী নেতা, ভাইরাল ভিডিওতে নতুন তথ্য

প্রকাশিত : ০৬ জুলাই, ২০২৬, ০৬:১১ বিকাল
আপডেট : ০৬ জুলাই, ২০২৬, ০৭:১৬ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

চট্টগ্রাম বন্দরে নিখোঁজ কাস্টমসের লক করা ২৫০ ঝুঁকিপূর্ণ কনটেইনার, বারবার তাগিদেও মিলছে না হদিস

দেশের অন্যতম কঠোর কার্গো ক্লিয়ারেন্স ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও চট্টগ্রাম বন্দরে কাস্টমস অপরাধের সন্দেহে চিহ্নিত অন্তত ২৫০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ আমদানি কনটেইনারের কোনো ভৌত অবস্থান বা হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর পর্যালোচনা করা সরকারি চিঠিপত্র থেকে জানা গেছে, চোরাচালান, পণ্যের মিথ্যা ঘোষণা কিংবা শুল্ক ফাঁকির সন্দেহে—কাস্টমসের সফটওয়্যার অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে লক বা অবরুদ্ধ করে রাখা—২৫০টি কনটেইনারের প্রকৃত অবস্থান শনাক্ত করতে, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস গত ৯ মাসে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে (সিপিএ) বারবার তাগিদ দিয়েছে।

কাস্টমসের অডিট, ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট (এআইআর) শাখা থেকে চলতি বছরের এপ্রিলে পাঠানো সর্বশেষ তাগাদাটির আগে একই তথ্য চেয়ে অন্তত তিনটি চিঠি পাঠানো হয়েছিল। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ এখনো পর্যন্ত সেসব কনটেইনারের অবস্থান জানাতে পারেনি।

এদিকে হদিস না মেলা কনটেইনারগুলোর তালিকায় ২০২১ সালের ৮৩টি; ২০২২ সালের ৬১টি; ২০২৩ সালের ৪০টি এবং ২০২৪ সালের ৬৬টি কনটেইনার রয়েছে। কাস্টমসের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, তদন্ত কর্মকর্তারা সরেজমিনে পরীক্ষা না করা পর্যন্ত এই চালানগুলো খালাস করার কোনো সুযোগ নেই।

কাস্টমস কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কনটেইনারগুলোর অবস্থানই খুঁজে না পাওয়ায় কোনো ধরনের পরিদর্শন বা তদন্ত প্রক্রিয়া চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

"আমরা এই কনটেইনারগুলোর অবস্থান জানতে চেয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষকে তিন থেকে চারবার চিঠি দিয়েছি। আমাদের শেষ রিমাইন্ডার গত এপ্রিলে পাঠানো হলেও– আমরা এখনো কোনো তথ্য পাইনি," এআইআর শাখার ডেপুটি কমিশনার তারেক মাহমুদ টিবিএস-কে বলেন।

তিনি আরও বলেন, "আমরা বলতে পারছি না যে সবগুলো কনটেইনারই নিখোঁজ রয়েছে, তবে আমরা বন্দরের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাচ্ছি না। তাই জোরালো একটা আশঙ্কা রয়েছে যে, এর মধ্যে অনেক কনটেইনারই আসলে গায়েব হয়ে গেছে।"

এদিকে কনটেইনারগুলোর সুনির্দিষ্ট অবস্থান জানতে না পারায়—কাস্টমস কর্তৃপক্ষ আমদানিকৃত পণ্য যাচাই করতে পারছে না, তদন্ত শেষ করতে পারছে না এবং শুল্ক জালিয়াতির সন্দেহে থাকা আমদানিকারকদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপও নিতে পারছে না।

আলাদা চুরির ঘটনায় উদ্বেগ আরও গভীর

লক করা কনটেইনারগুলোর হদিস না মেলার এই চাঞ্চল্যকর তথ্য এমন সময়ে সামনে এলো, যখন এক বছরের মধ্যে বন্দর থেকে ফ্যাব্রিক-বোঝাই অন্তত তিনটি লোডেড কনটেইনার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার তদন্ত চলছে।

এর মধ্যে একটি ঘটনা ঘটেছে ব্যবসায়ী সেলিম রেজার সাথে, যিনি শাহ আমানত ট্রেডিংয়ের মালিক। তিনি কাস্টমসের একটি ইলেকট্রনিক নিলামের (ই-অকশন) মাধ্যমে ২৭ টন আমদানিকৃত ইনডিগো ফ্যাব্রিকের একটি কনটেইনার কিনেছিলেন। এই পণ্যের জন্য তিনি ৮৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেন এবং ভ্যাট, অগ্রিম আয়কর ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক চার্জ মিলিয়ে তার মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ৬ লাখ টাকা।

নিলামে অংশ নেওয়ার আগে কনটেইনারটি নিজে দেখে যাচাই করার পর, গত ২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তিনি পণ্য খালাস নিতে বন্দরে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন যে কনটেইনারটি উধাও হয়ে গেছে।

এর চার মাস পর, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে যে বন্দরের অভ্যন্তরে কোথাও ওই কনটেইনারটির কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ২০২৫ সালের ২ জুলাই এক চিঠিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, একটি যৌথ তদন্ত কমিটি কনটেইনারটির হদিস বের করতে ব্যর্থ হয়েছে, যারে ফলে নিলামে ক্রয়কারীর কাছে সেটি হস্তান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না।

এদিকে, পণ্যবোঝাই আরও দুটি কনটেইনার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় বন্দর কর্তৃপক্ষ আলাদা দুটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছে।

তদন্তকারীদের অভিযোগ, জাল সিল, ভুয়া স্বাক্ষর এবং জালিয়াতি করা গেট পাসের নথিপত্র ব্যবহার করে বন্দর থেকে একটি কনটেইনার বের করে নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে নগরীর হালিশহর এলাকা থেকে খালি অবস্থায় কনটেইনারটি উদ্ধার করে বন্দর থানা পুলিশ। তবে সেটির ভেতরে থাকা আনুমানিক ২ কোটি টাকা মূল্যের আমদানিকৃত ফেব্রিক বা কাপড়ের সন্ধান মেলেনি।

এই ঘটনায় পুলিশ দুই বন্দরের কর্মচারীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং অপর এক সন্দেহভাজন এখনও পলাতক রয়েছে। এছাড়া চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রায় আড়াই কোটি টাকা মূল্যের আমদানিকৃত ফেব্রিকসহ আরও একটি কনটেইনার উধাও হয়, যার কোনো হদিস এখন পর্যন্ত মেলেনি।

ডিজিটাল রেকর্ড নিয়ে প্রশ্ন

এই তদন্ত প্রক্রিয়ায় বন্দরের কার্গো ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির মধ্যকার বড় ধরনের অসঙ্গতিও উঠে এসেছে।

তদন্তকারীরা দেখতে পান, একটি কনটেইনার ভৌতভাবে গায়েব হয়ে যাওয়ার পরও বন্দর কর্তৃপক্ষের ওরাকল-ভিত্তিক কার্গো ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে সেটিকে সিসিটি (চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল) ইয়ার্ডের ভেতরেই সংরক্ষিত হিসেবে দেখানো হচ্ছিল। অথচ বাস্তবে ইয়ার্ডের কোথাও সেই কনটেইনারের অস্তিত্ব খুঁজে পাননি তদন্তকারীরা, এমনকি বন্দরের মূল 'টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম'-এও এর কোনো মিল বা সামঞ্জস্যপূর্ণ রেকর্ড পাওয়া যায়নি।

সিস্টেম ও বাস্তবের মধ্যকার এমন চরম বৈপরীত্যের ঘটনা কাস্টমস কর্মকর্তাদের— বন্দর কর্তৃপক্ষের কাগজবিহীন, শতভাগ ডিজিটাল বন্দর পরিচালনার লাগাতার দাবি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তোলার সুযোগ করে দিয়েছে।

তারেক মাহমুদ বলেন, "বন্দরের ইয়ার্ডগুলো এখন বিভিন্ন স্থানে সম্প্রসারিত হয়েছে, তাই কার্গো মুভমেন্ট পর্যবেক্ষণ করা আগের চেয়ে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে।"

তিনি আরও বলেন, "ব্যবস্থার কোথাও না কোথাও বড় ধরনের ফাঁকফোকর রয়ে গেছে। না হলে একটা কনটেইনার স্রেফ উধাও হয়ে যেতে পারে না।" বন্দরের তথাকথিত ডিজিটালাইজেশনের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

"বন্দর কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, তারা পেপারলেস এবং ডিজিটাল হচ্ছে। কিন্তু যদি আস্ত কনটেইনারই গায়েব হয়ে যায়, তবে ঠিক কোন জিনিসটাকে ডিজিটাইজড করা হলো?" তিনি বলেন।

তিনি আরও যোগ করেন যে, এলসিএল (লেস-দ্যান-কনটেইনার-লোড) বা আংশিক পণ্যবাহী কার্গো খালাসের গুদামগুলোতে ট্র্যাকিং বা নজরদারি ব্যবস্থা আরও বেশি দুর্বল। সেখানে মাঝেমধ্যেই এক আমদানিকারকের পণ্য অন্য আমদানিকারক নিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে।

কঠোর খালাস প্রক্রিয়াকে ফাঁকি

ব্যাপক অনুমোদন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকার পরও – দেশের অন্যতম সুরক্ষিত নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে কীভাবে একটি কনটেইনার বাইরে চলে যেতে পারে, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে এসব ঘটনা।

কাস্টমস এজেন্টদের মতে, সাধারণত একটি পূর্ণ কনটেইনার (এফসিএল) খালাস করতে বন্দর কর্তৃপক্ষের ওয়ান স্টপ সার্ভিস, টার্মিনাল কর্তৃপক্ষ, ইয়ার্ড কর্মকর্তা, ডেলিভারি স্টাফ এবং কাস্টমস গেট কর্মীসহ বিভিন্ন দপ্তরের প্রায় ২৪টি পৃথক স্বাক্ষর ও অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।

তদন্তকারীদের ধারণা, এই সমস্ত কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে জাল স্বাক্ষর, ভুয়া সিল ও জাল করা গেট পাস ব্যবহার করা হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে ডিজিটালাইজেশনের চেষ্টা সত্ত্বেও এই ব্যবস্থাটি এখনো যে কতটা ম্যানুয়াল বা সনাতনী যাচাইকরণের ওপর নির্ভরশীল এবং এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর, তা এসব জালিয়াতির মধ্যে দিয়ে উন্মোচিত হয়েছে।

আইনি দায়বদ্ধতা

কাস্টমস আইন ২০২৩-এর ৮ ও ১৩০ ধারা অনুযায়ী, বন্দরে সংরক্ষিত সমস্ত আমদানিকৃত কার্গো বা পণ্যের আইনি অভিভাবক হলো চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। আইনসম্মতভাবে খালাস বা হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত পণ্যের নিরাপদ হেফাজতের দায়িত্ব সম্পূর্ণ তাদের।

এই আইনি বিধির বরাত দিয়ে, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ নিখোঁজ হওয়া কনটেইনারটির জন্য সরকারের ঘরে জমা হওয়া নিলাম মূল্য, ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর বাবদ সংগৃহীত মোট ১ কোটি ৬ লাখ টাকা শাহ আমানত ট্রেডিংকে ফেরত বা ক্ষতিপূরণ দিতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে তাগিদ দিয়েছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষ যখন কনটেইনারটি সরবরাহে তাদের অক্ষমতার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে, তখনই সংশ্লিষ্ট ক্রেতা তার পুরো টাকা ফেরত চেয়ে আবেদন করেন।

যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি

কাস্টমসের পক্ষ থেকে বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও— বন্দর কর্তৃপক্ষ এখনো স্পষ্ট করতে পারেনি যে কেন তারা ওই ২৫০টি লক করা কনটেইনারের অবস্থান শনাক্ত করতে পারছে না, কিংবা বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ সুরক্ষিত একটি রাষ্ট্রীয় স্থাপনা থেকে কীভাবে একের পর এক পণ্যবোঝাই কনটেইনার উধাও হয়ে যাচ্ছে।

এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে টিবিএস-এর পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত সচিব নাসির উদ্দিনের সাথে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সফল হয়নি। এমনকি বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে এবিষয়ে বিস্তারিত প্রশ্ন পাঠানো হয়েছিল। বার্তাটি তিনি দেখলেও কোনো উত্তর দেননি।

তবে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী সেলিম রেজার প্রশ্ন খুবই সহজ ও সোজাসাপ্টা।

তিনি বলেন, "সরকার আমার কাছে যে টাকা দাবি করেছিল, তার প্রতিটি আনা-পয়সা আমি পরিশোধ করেছি। এখন সবাই একবাক্যে স্বীকার করছে যে আমার কনটেইনারটি নিখোঁজ, কিন্তু সেটি কোথায় গেল—সেই উত্তর দেওয়ার মতো কেউ নেই।"

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়