মনজুর এ আজিজ: বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারকে সবচেয়ে বড় রফতানি গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। দেশের মোট তৈরি পোশাক রফতানির প্রায় অর্ধেকই যায় ইউরোপের ২৭টি দেশে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, সেই বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এখন আগের মতো শক্তিশালী নেই। বরং ইউরোপের ক্রেতারা ধীরে ধীরে বিকল্প সরবরাহকারী দেশের দিকে ঝুঁকছেন, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে ভারত।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপে পোশাকের সামগ্রিক চাহিদা কমেছে ঠিকই, কিন্তু সব দেশ সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। চীন বাজার অংশীদারিত্ব বাড়িয়েছে, ভিয়েতনাম প্রায় আগের অবস্থান ধরে রেখেছে, আর ভারত তুলনামূলকভাবে অনেক কম ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশ শুধু রপ্তানি আয় হারায়নি, বাজার অংশীদারিত্বও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—ইউরোপের বাজারে কি বাংলাদেশের জায়গা ধীরে ধীরে ভারত ও অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের দখলে চলে যাচ্ছে?
ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে ৬ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ইউরো। আগের বছরের একই সময়ে এই রফতানি ছিল ৭ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ইউরো। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে রফতানি কমেছে ১ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ইউরো বা ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ।
একই সময়ে ইইউর মোট পোশাক আমদানি কমেছে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ বাজার সংকুচিত হলেও বাংলাদেশের রফতানি কমেছে বাজার সংকোচনের প্রায় দ্বিগুণ হারে। ফলে ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ২১ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে এত বড় বাজার অংশীদারিত্ব আর কেউ হারায়নি। ইউরোপীয় বাজারে ভারতের রফতানিও কিছুটা কমেছে। তবে সেই পতনের হার মাত্র ১২ দশমিক ১ শতাংশ, যা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম এবং ইইউর সামগ্রিক আমদানি হ্রাসের কাছাকাছি। ফলে ভারত তার বাজার অবস্থান অনেকটাই ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে দ্রুত অগ্রগতি হওয়ায় অনেক ক্রেতা ভবিষ্যতের সুবিধা বিবেচনায় ভারত থেকে সোর্সিং বাড়াচ্ছেন। ভারত তুলনামূলকভাবে বৈচিত্র্যময় পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য রপ্তানি করে দেশটিতে ম্যান-মেড ফাইবার (এমএমএফ) ভিত্তিক পোশাক উৎপাদন দ্রুত বাড়ছে, যেখানে ইউরোপের চাহিদা বেশি।
বিশাল অভ্যন্তরীণ শিল্পভিত্তি এবং কাঁচামাল উৎপাদনের কারণে ভারতের উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকে। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর অনেকেই ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ কৌশলের অংশ হিসেবে ভারতকে বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্ব দিচ্ছে।
বাংলাদেশের তুলনায় ভারতের সরবরাহ শৃঙ্খল আরও বৈচিত্র্যময় হওয়ায় বড় অর্ডার দ্রুত বাস্তবায়নের সক্ষমতাও বেশি।
জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে চীনের রপ্তানি কমেছে মাত্র ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। ফলে ইইউ বাজারে তাদের অংশীদারিত্ব ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৮ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনার পর চীনা রপ্তানিকারকেরা ইউরোপীয় বাজারে আরও আগ্রাসী মূল্যনীতি গ্রহণ করেছেন। সরকারি সহায়তা, দ্রুত উৎপাদন, উন্নত লজিস্টিকস এবং কম লিড টাইমের কারণে ইউরোপীয় ক্রেতাদের একটি অংশ আবারও চীনের দিকে ঝুঁকছেন।
এদিকে শীর্ষ রফতানিকারকদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভিয়েতনাম। চার মাসে দেশটির রপ্তানি কমেছে মাত্র ০ দশমিক ৭ শতাংশ। বরং নিটওয়্যার রফতানি বেড়েছে ২ দশমিক ৩ শতাংশ। ফলে ইউরোপীয় বাজারে ভিয়েতনামের অংশীদারিত্ব ৪ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪.৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইইউ-ভিয়েতনাম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (ইভিএফটিএ), উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদন, আধুনিক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং দ্রুত ডেলিভারি ভিয়েতনামকে বড় সুবিধা দিচ্ছে।
বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, শুধু রফতানি কমেনি, বাংলাদেশের পোশাকের গড় রপ্তানি মূল্যও কমেছে। জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য ১৫ দশমিক ৫৯ ইউরো থেকে কমে ১৩.৯৬ ইউরোতে নেমে এসেছে। অর্থাৎ রফতানিকারকদের শুধু কম অর্ডারই নয়, কম দামেও পণ্য বিক্রি করতে হয়েছে। অপরদিকে ভিয়েতনামের ইউনিট মূল্য বেড়েছে এবং চীনের দাম কমলেও বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম হারে কমেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশ এখন মূল্য প্রতিযোগিতার চাপে রয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক কারণের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সমস্যাও বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল করছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার, গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব, বন্দরে জট ও দীর্ঘ লিড টাইম, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, এলডিসি উত্তরণ নিয়ে ক্রেতাদের অনিশ্চয়তা।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ইউরোপে বাংলাদেশের রফতানি কমার পেছনে শুধু অর্ডার কমে যাওয়া নয়, ইউনিট মূল্য কমে যাওয়াও বড় কারণ। বৈশ্বিক চাহিদা দুর্বল থাকলেও বাংলাদেশকে এখন উৎপাদন ব্যয় কমানো, বন্দর ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং উচ্চমূল্যের মূল্যসংযোজনকারী পণ্যের দিকে দ্রুত অগ্রসর হতে হবে।
অপরদিকে বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক মনে করেন, চীন সরকারিভাবে রফতানিকারকদের সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, ব্যাংকিং সংকটের কারণে অনেক কারখানা পর্যাপ্ত অর্থায়ন পায়নি। ফলে প্রতিযোগীদের মতো মূল্যছাড় দেওয়ার সক্ষমতাও অনেক প্রতিষ্ঠানের ছিল না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য শুধু স্বল্পমেয়াদি সংকট নয়; এটি ভবিষ্যতেরও একটি সতর্ক সংকেত। ২০২৯ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশ বর্তমানে যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে, তা আর থাকবে না। তখন ভারত, ভিয়েতনাম ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হবে। যদি এখনই উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, বন্দর সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা, সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং উচ্চমূল্যের ফ্যাশন ও প্রযুক্তিনির্ভর পোশাক উৎপাদনের দিকে জোর দেওয়া না হয়, তাহলে ইউরোপে বাংলাদেশের বাজার আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে বিশ্ববাজারে মন্দা থাকলেও প্রতিযোগিতায় সবাই সমানভাবে পিছিয়ে পড়েনি। কেউ সংকটের মধ্যেও বাজার ধরে রেখেছে, কেউ বাজার অংশীদারিত্ব বাড়িয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ একই সঙ্গে রপ্তানি আয়, বাজার অংশীদারিত্ব এবং ইউনিট মূল্য—তিন দিক থেকেই চাপে পড়েছে। ইউরোপের বাজারে ভারতের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি, চীনের আগ্রাসী মূল্যনীতি এবং ভিয়েতনামের নীতিগত সুবিধা বাংলাদেশের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। ফলে শুধু স্বল্পমূল্যের পোশাক রপ্তানির ওপর নির্ভর করে আগের অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব হবে না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এখন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কম দামে নয়, বেশি মূল্যসংযোজন, দ্রুত সরবরাহ, উন্নত অবকাঠামো এবং নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা পুনর্গঠন করা। অন্যথায় ইউরোপের বাজারে যে জায়গা বাংলাদেশ গত তিন দশকে তৈরি করেছে, তার একটি অংশ স্থায়ীভাবেই প্রতিযোগী দেশগুলোর দখলে চলে যেতে পারে।