সরকারি চাকরিজীবীদের অনেকেই যখন পরিবারের মাসিক বাজেটে স্বস্তির হিসাব কষতে শুরু করেছেন, তখনই সেই হিসাবের পাশে বসতে পারে একটি বড় ‘মাইনাস’ চিহ্ন! মূল বেতন বাড়বে—এমন প্রত্যাশার বিপরীতে প্রশ্ন উঠেছে, বর্তমানে পাওয়া ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ‘বিশেষ সুবিধা’ কি নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন থেকে বাদ যাবে? যদি যায়, তাহলে কাগজে বেতন বাড়ার অঙ্ক যতটা বড় দেখাবে, বাস্তবে ততটা নয়।
একজন নিম্ন বা মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীর জন্য এই প্রশ্নটি দুশ্চিন্তার। বাসা ভাড়া, নিত্যপণ্যের বাজার, সন্তানের স্কুল-কলেজের খরচ, চিকিৎসা, যাতায়াত এবং ইউটিলিটি বিল মিটিয়ে মাসের শেষ দিকে যখন বেতনের হিসাব শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসে, তখন নতুন পে স্কেলকে অনেকেই দেখছেন মূল্যস্ফীতির ধাক্কা সামাল দেওয়ার শেষ ভরসা হিসেবে। কিন্তু বাড়তি মূল বেতনের সঙ্গে যদি বিদ্যমান বিশেষ সুবিধা আর আলাদা না থাকে, তবে প্রত্যাশিত স্বস্তির অঙ্ক কমে যেতে পারে—এমন উদ্বেগ আছে কর্মচারীদের মধ্যে।
সরকার বুধবার (১ জুলাই) থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে। প্রায় ১১ বছর ধরে একই বেতন কাঠামোয় থাকা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবায়নের চূড়ান্ত পদ্ধতি, বেতন নির্ধারণ এবং ভাতা পুনর্গঠনের বিষয়গুলো এখনও গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়নি। আগামী ১৫ জুলাই নাগাদ গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে।
বেতন বাড়ার আগে কেন ‘বাদ যাওয়ার’ হিসাব
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বর্তমানে মূল বেতনের সঙ্গে আলাদা করে বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন। গ্রেড-১ থেকে গ্রেড-৯ পর্যন্ত কর্মচারীরা মূল বেতনের ১০ শতাংশ এবং গ্রেড-১০ থেকে গ্রেড-২০ পর্যন্ত কর্মচারীরা ১৫ শতাংশ হারে এই সুবিধা পান। চাকরিরতদের ক্ষেত্রে এর ন্যূনতম পরিমাণ ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে ৭৫০ টাকা।
এই বিশেষ সুবিধার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে ২০২৩ সালে সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের জন্য মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বিশেষ সুবিধা চালু করা হয়েছিল। পরে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বাড়িয়ে গ্রেডভেদে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ করা হয়। অর্থাৎ বর্তমানে কর্মচারীদের মাসিক আয়ের একটি দৃশ্যমান অংশ হয়ে গেছে এই বিশেষ সুবিধা।
নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের আলোচনায় অর্থ মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যমান বিশেষ সুবিধা ও বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করা হতে পারে। এর অর্থ হলো— বিশেষ সুবিধাটি আলাদা ভাতা হিসেবে আর নাও থাকতে পারে। নতুন মূল বেতনের হিসাবেই সেটি অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে কর্মচারীদের উদ্বেগ এখানেই। তারা বলছেন, কেবল ‘সমন্বয়’ শব্দটি ব্যবহার করলেই হবে না। একজন কর্মচারী বর্তমানে কত পাচ্ছেন, নতুন কাঠামোতে কত পাবেন, বিশেষ সুবিধা বাদ গেলে নেট বৃদ্ধি কত দাঁড়াবে—এ হিসাব সরকারকে গ্রেডভিত্তিক স্পষ্ট করতে হবে। না হলে বেতন বাড়ার ঘোষণার পরও প্রকৃত আয় বাড়ার বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি থাকবে।
ধরা যাক, কোনও কর্মচারীর নতুন পে স্কেলে মূল বেতন ১০ হাজার টাকা বাড়লো। কিন্তু বর্তমানে পাওয়া বিশেষ সুবিধা ৪ বা ৫ হাজার টাকা বন্ধ হয়ে গেলে তার হাতে প্রকৃত বাড়তি অর্থ দাঁড়াবে ৫ বা ৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ ঘোষিত বৃদ্ধির অঙ্ক এবং বাস্তবে ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়া বাড়তি অর্থের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হতে পারে। কর্মচারী সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এই ব্যবধানটি পরিষ্কার না করলে পে স্কেল নিয়ে প্রত্যাশার বদলে অসন্তোষ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের সভাপতি মো. বাদিউল কবীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “সাধারণত যখন নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন বা বেতন বৃদ্ধি করা হয়, তখন বিশেষ ভাতা বাতিল করা হয়। এবারও বিশেষ সুবিধাটি বাদ যেতে পারে।’’
তিনি বলেন, “আজ থেকে নতুন পে স্কেল কার্যকরের ঘোষণা থাকলেও বর্ধিত বেতন হাতে পেতে অক্টোবর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। আর নতুন ভাতাগুলো কার্যকর হতে পারে আগামী অর্থবছরের বাজেট থেকে।’’
জুলাইয়ের ঘোষণা, গেজেটের অপেক্ষা
সরকার ১ জুলাই থেকে নতুন পে স্কেল কার্যকরের ঘোষণা দিলেও বর্ধিত বেতন হাতে পাওয়া এবং কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়নের মধ্যে সময়ের ব্যবধান থাকতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বেতন পুনর্নির্ধারণ, বিদ্যমান বেতন ও ইনক্রিমেন্টের সঙ্গে সমন্বয়, আইবাস প্লাস সফটওয়্যার হালনাগাদ, দফতরভিত্তিক বিল প্রস্তুত এবং প্রজ্ঞাপন জারির মতো প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ করতে সময় লাগবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন মূল বেতন একবারে কার্যকর করা এবং সংশোধিত ভাতাগুলো পরের অর্থবছরে চালুর একটি প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে। আগে তিন ধাপে বাস্তবায়নের বিকল্প বিবেচনায় থাকলেও কারিগরি জটিলতার কারণে পুরো মূল বেতন একসঙ্গে কার্যকর এবং ভাতা দ্বিতীয় ধাপে দেওয়ার পক্ষে মত জোরালো হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন ও গেজেট প্রকাশের ওপর নির্ভর করছে।
এ কারণে ‘জুলাই থেকে পে স্কেল’ কথাটির সঙ্গে বাস্তবতার একটি পার্থক্য রয়েছে। জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হলেও বর্ধিত অর্থ কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাবে পৌঁছাতে অক্টোবর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের বকেয়া কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় দেওয়া হবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট নির্দেশনা চান সংশ্লিষ্টরা।
নতুন ভাতা পরের বছর, চাপ কমবে কবে?
নতুন পে স্কেলে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ও অন্যান্য ভাতা কী হারে বাড়বে, তা এখনও চূড়ান্ত নয়। তবে আলোচনায় থাকা পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন মূল বেতন কার্যকরের পর ভাতাগুলো ২০২৭-২৮ অর্থবছরে নতুনভাবে নির্ধারিত হতে পারে। এতে কর্মচারীদের মূল বেতন বাড়লেও মোট মাসিক আয় কতটা বাড়বে, তা অনিশ্চিত থেকে যাচ্ছে।
কারণ সরকারি কর্মচারীদের বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয়ে মূল বেতনের পাশাপাশি বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত ভাতার ভূমিকা বড়। বিশেষ করে ঢাকাসহ বড় শহরে কর্মরত নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ব্যয়ই মাসিক আয়ের বড় অংশ চলে যায়। ফলে মূল বেতন বাড়লেও নতুন ভাতা কার্যকর হতে আরও এক বছর অপেক্ষা করতে হলে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি পুরোপুরি মিলবে না।
নবম জাতীয় বেতন কমিশন সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করেছে। তবে কমিশনের সুপারিশ পুরোপুরি কার্যকর হবে, নাকি আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় কিছু পরিবর্তন আসবে—তা এখনও পরিষ্কার নয়।
সরকারের জন্য নতুন পে স্কেল শুধু বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নয়—এটি মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আয়, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত একটি বড় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত। কর্মচারীদের হাতে বাড়তি অর্থ গেলে ভোগব্যয় বাড়বে, বাজারে চাহিদা বাড়বে এবং অর্থনীতিতে গতি আসতে পারে। আবার বাজার তদারকি দুর্বল হলে অতিরিক্ত চাহিদার সুযোগে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকিও থাকে।
তবে নতুন পে স্কেলের পর হাতে কত টাকা বাড়বে? বিশেষ সুবিধা পুরোপুরি বাদ যাবে, নাকি নতুন বেতনের সঙ্গে সমন্বয় হবে? জুলাই থেকে কার্যকরের বকেয়া মিলবে কি না? নতুন ভাতার হার কবে থেকে কার্যকর হবে? এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর না এলে নতুন পে স্কেল সরকারি চাকরিজীবীদের কাছে স্বস্তির ঘোষণার বদলে নতুন অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে উঠতে পারে। উৎস: বাংলা ট্রিবিউন।