নিনা আফরিন ,পটুয়াখালী : শুভ্র কাশফুল, শারদীয় দুর্গোৎসবের ছুটি আর দিগন্তজোড়া সমুদ্র সৈকতের রূপ—সব মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে সাগরকন্যা কুয়াকাটায়। ৯ বছর পর আগামী ২৩ ও ২৪ অক্টোবর কুয়াকাটায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত 'পর্যটন কার্নিভাল'। এই বিশেষ আয়োজনকে কেন্দ্র করে দেশের নানা প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পর্যটক ছুটে আসছেন সাগর কন্যা কুয়াকাটায়। একই সঙ্গে শারদীয় দুর্গাপূজার টানা ছুটি যুক্ত হওয়ায় পর্যটকদের আগমন বেড়ে গেছে বহুগুণ। ফলে স্থানীয় বেশিরভাগ হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট শতভাগ বুকিং হয়ে গেছে। পর্যটকদের চাপ সামাল দিতে ইতিমধ্যে কুয়াকাটা সংলগ্ন ৬ শতাধীক স্থানীয়দের বাড়ি প্রস্তুত করা হয়েছে। টানা কয়েকদিন কুয়াকাটায় পযর্টককদের ঢলে স্বস্তি বিরাজ করছে এ ব্যবসার সাথে জড়িতদের।
কার্নিভাল ঘিরে সৈকতে উৎসবের আমেজ
পর্যটন শিল্পকে বিকশিত করা এবং দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে কুয়াকাটার অপার সৌন্দর্য তুলে ধরতে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের উদ্যোগে দীর্ঘ ৯ বছর পরে ২৩ ও ২৪ অক্টোবর আড়ম্বরপূর্ণভাবে উদযাপিত হতে যাচ্ছে কুয়াকাটা পর্যটন কার্নিভাল ২০২৬।
বর্ণিল, নিরাপদ এবং আনন্দময় অভিজ্ঞতার সাক্ষী হতে পুরো কুয়াকাটা এখন সেজেছে নতুন সাজে। সাধারণ পর্যটক থেকে শুরু করে স্থানীয় বাসিন্দা—সবার প্রত্যাশা, এই কার্নিভাল কুয়াকাটার পর্যটন খাতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
পর্যটন কর্পোরেশন সুত্র জানায়, ২৩ অক্টোবর সকাল ০৯ টায় কুয়াকাটা সৈকতের জিরো পয়েন্টে বিচ ফুটবলের মধ্য দিয়ে পর্যটন কার্নিভালের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। বিকাল ০৩ টায় ফিস ফ্রাই মার্কেট সংলগ্ন সৈকতে পর্যটন কার্নিভালের উদ্বোধন করা হবে।
বিকেল সাড়ে ৩টায় ফুড ফেস্টিভালের স্টল পরিদর্শন,পৌনে ৪টায় বিচ ফুটবলের ফাইনাল ম্যাচ,বিকাল সোয়া ৪টায় লেম্বুর বন সৈকতে ঘুড়ি উৎসব,শিশুদের চিত্রাঙ্গন প্রতিযোগিতা ও সূর্যাস্ত উপভোগ,সন্ধ্যা ৬ টা ৩৫ মিনিটে ফিস ফ্রাই মার্কেট সংলগ্ন সৈকতের মূল মঞ্চে পুঁথিপাঠের আসর, রাত পৌনে ৮টায় স্থানীয় রাখাইন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, রাত ৯টায় তারকা শিল্পীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে।
২৪ অক্টোবর ভোর ৫ টায় জিরো পয়েন্ট থেকে গঙ্গামতির চর পর্যন্ত ৬ কিলোমিটারের বীচ ম্যারাথন,সাড়ে ৫ টা থেকে ৮ টা পর্যন্ত গঙ্গামতির চর এলাকায় সূর্যদয় উপভোগ ও পিঠা উৎসব,সকাল ৯ টায় ফিশ ফ্রাই মার্কেট সংলগ্ন সৈকত পরিচ্ছন্নতা অভিযান,সকাল ১০ টায় জিরো পয়েন্ট থেকে স্পিডবোড যোগে চর বিজয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা এবং সেখানে ভলিবল খেলার আয়োজন,বিকাল ৪টায় জিরো পয়েন্টে সেলিব্রেটি ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণে বিচ ক্রিকেট,সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ফিস ফ্রাই মার্কেট সংলগ্ন সৈকতে মূল মঞ্চে বাউল গানের আসর,রাত সাড়ে ৭টায় ফ্যাশন সো,রাত ০৮ টায় স্থানীয় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান,রাত সাড়ে ৮ টায় কমেডি শো,রাত সোয়া ৯টায় তারকা শিল্পীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও রাত সাড়ে ১০টায় সম্মাননা, পুরষ্কার বিতরনী অনুষ্ঠান এবং বর্ণিল আতশবাজি আয়োজন রয়েছে।
এছাড়া দুই দিনে পটুয়াখালীর সকল পর্যটন স্পট এবং জেলার ঐতিহ্যবাহী পণ্য সামগ্রী প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে প্রদর্শনী করা হবে।
২৫ অক্টোবর সকালে সৈকত পরিচ্ছন্নতা অভিযানের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি হবে এ অনুষ্ঠান।
পর্যটন কর্পোরেশন সুত্র জানায় কুয়াকাটার এ কার্নিভালকে সফল করতে গত ১৫ অক্টোবর জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা,ব্যবসায়ী এবং রাজনৈতিক নেতাদের অংশগ্রহণে উৎসব আয়োজন ও পর্যটক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক নিয়ে একটি প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে কার্নিভালের সকল দিক নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে কুয়াকাটার প্রায় শতভাগ হোটেলকক্ষের বুকিং হয়ে গেছে। এখানে ছোট-বড় ৩০০টির বেশি আবাসিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার পর্যটকের রাতযাপনের ব্যবস্থা রয়েছে। বাড়তি পর্যটকের চাপ সামাল দিতে আশপাশের পাঁচটি গ্রামের প্রায় ৬০০ বাসাবাড়ি হোমস্টে হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। একটি স্মরনীয় কার্নিভাল উপহার দিতে সকল প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে বলে জানান তারা।
আনন্দমুখর পরিবেশ ও ব্যবসায়ীদের উচ্ছ্বাস
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দুর্গাপূজার ছুটির কারণে এমনিতেই সৈকতে পর্যটকদের আনাগোনা বেশি ছিল। তার সাথে যোগ হয়েছে ২৩ ও ২৪ অক্টোবরের কার্নিভাল। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কুয়াকাটার প্রায় সব হোটেল, মোটেল ও কটেজের শতভাগ রুম ইতোমধ্যে আগাম বুক হয়ে গেছে। অনেক পর্যটক রুম না পেয়ে স্থানীয় বাসা-বাড়ি ও বিকল্প থাকার ব্যবস্থার সন্ধান করছেন।
দীর্ঘদিন মন্দা ভাব কাটানোর পর এমন পর্যটকের ঢল দেখে মুখে হাসি ফুটেছে স্থানীয় ব্যবসায়ী, শুঁটকি বিক্রেতা, ট্যুর গাইড এবং এ শিল্পের সাথে জড়িত সকলের।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোতালেব শরীফ জানান, "পূজা ও কার্নিভাল—এই দুটি উপলক্ষ একসঙ্গে আসায় কুয়াকাটায় রেকর্ড পরিমাণ পর্যটকের সমাগম ঘটছে। আমরা পর্যটকদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে প্রস্তুত। হোটেলগুলোতে বাড়তি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।" তিনি আরো জানান, ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত দুর্গাপূজা ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে টানা পাঁচ দিনের ছুটি রয়েছে। এর মধ্যে ২৩ ও ২৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে দুদিনব্যাপী বিচ কার্নিভাল। দীর্ঘ ছুটি ও উৎসব ঘিরে কুয়াকাটায় দুই থেকে তিন লাখ পর্যটক-দর্শনার্থীর সমাগম হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
ঢাকার টঙ্গী এলাকায় বসবাসরত সনাতন সম্প্রদায়ের সদস্য দেবাশিষ সাহা জানান,পূজার ছুটিতে বেড়াতে আসার পরিকল্পনা ছিলো। তারপর দেখলাম একদিন পরে কার্নিভাল। এখন সিদ্ধান্ত নিলাম কুয়াকাটা কার্নিভালে অংশ নিয়ে তারপর ঢাকায় ফিরবো। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্যের পাশাপাশি বর্ণিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগের এমন সুযোগ বারবার হয়তো পাওয়া যাবে না।
কুয়াকাটা ট্যুর গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কেএম বাচ্চু সাংবাদিকেরদ জানান, দীর্ঘ ছুটিতে পর্যটকদের স্বাগত জানাতে হোটেল, মোটেল, রেস্টুরেন্টসহ পর্যটননির্ভর প্রায় ১৬টি পেশার ক্ষেত্রে পাঁচ থেকে সাত হাজারের বেশি শ্রমিক প্রস্তুত রয়েছেন। এছাড়া শতাধিক প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইডের পাশাপাশি অন্যান্য খাতের আরো দুই শতাধিক কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
সার্বিক নিরাপত্তায় বিশেষ পুলিশি ব্যবস্থা
পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় এবং কার্নিভালের মতো বড় আয়োজনকে ঘিরে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য জেলা পুলিশ ও ট্যুরিস্ট পুলিশ ও নৌ পুলিশের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে কঠোর ও সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ট্যুরিস্ট পুলিশ কুয়াকাটা রিজিয়নের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে: সৈকতের মূল পয়েন্টসহ ঝাউবন, গঙ্গামতির চর, শুঁটকি পল্লী ও লেম্বুর চর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ওয়াচ টাওয়ারের পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে পুরো এলাকা নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। সমুদ্রস্নানে নামা পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য উদ্ধারকারী দল ও লাইফগার্ড সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
পর্যটকদের কেনাকাটা ও খাবার গ্রহণে যাতে অতিরিক্ত মূল্য দিতে না হয়, সে জন্য সার্বক্ষণিক কাজ করবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত।
ট্যুরিস্ট পুলিশের কুয়াকাটা জোনের ইনচার্জ নাজমুল আহসান জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ট্যুরিস্ট পুলিশ, জেলা পুলিশ ও বন বিভাগের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হবে। আগত পর্যটকেরা যাতে নিরাপদে ভ্রমণ করতে পারেন, সেজন্য নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কুয়াকাটা পৌর প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেক জানান, পাঁচ দিনের সরকারি ছুটি ও বিচ কার্নিভালকে কেন্দ্র করে কুয়াকাটাকে নতুন রূপে সাজানো হচ্ছে। থানা পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে পর্যটকদের নিরাপত্তা জোরদারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পর্যটকদের আগমন নির্বিঘ্ন করতে সৈকতের সৌন্দর্য রক্ষা, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রশাসন। ইতোমধ্যে সৈকতের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সরিয়ে নিতে নির্দেশনা দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। পাশাপাশি সৈকত এলাকায় ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার কার্যক্রমও চালানো হয়েছে।