ইফতেখার আলম বিশাল রাজশাহী : নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (নেসকো)-এর নিয়োগ পরীক্ষায় ব্যাপক অনিয়ম, প্রশ্নের ফাঁদ এবং গোপন আঁতাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। নিয়োগ সিন্ডিকেটের কারসাজি ও অনিয়মের তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর এবং অভিযোগ দায়েরের পর অবশেষে ৫টি ক্যাটাগরির নিয়োগ সংক্রান্ত মৌখিক পরীক্ষা অনিবার্য কারণ দেখিয়ে স্থগিত করেছে কর্তৃপক্ষ।
নেসকোর চেয়ারম্যান বরাবরে প্রেরিত এক লিখিত অভিযোগে জানা গেছে, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে নেসকোতে কয়েকটি শুন্য পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
তড়িঘড়ি করে গত ০২ অক্টোবর ২০২৬ রুয়েটে (রাজশাহী) লিখিত পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, মূলত ২৬ জন ‘সাহায্যকারী’ (গ্রেড-১৫) পদের জন্য সার্কুলার দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে কোন প্রকার নতুন বিজ্ঞপ্তি বা নতুন আবেদনের সুযোগ না দিয়েই পদের সংখ্যা ২৬টি থেকে বাড়িয়ে ৬৫টিতে উন্নীত করা হয়।
অভিযোগকারী মোঃ আসকর আলী প্রামানিকের দাবি, নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করে গোপনে পদসংখ্যা বাড়িয়ে ৬৫ করা এবং ৩২৫ জনকে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ দেখানোর পেছনে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন ও সিন্ডিকেটের হাত রয়েছে। এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে এবং সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের সুযোগ কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার আগের রাতে (১ অক্টোবর) রাজশাহী মাস্টার পাড়াস্থ নেস্কোর রেস্টহাউজে একটি গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো: মশিউর রহমান, প্রধান প্রকৌশলী মিজানুর রহমান (বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি) এবং রুয়েটের প্রফেসর ড. নুরুল ইসলাম (ম্যাকানিকাল ইঞ্জিয়ারিং বিভাগ) উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, গত ১ অক্টোবর রাতে রাজশাহীর মাস্টারপাড়ায় অবস্থিত নেসকোর রেস্ট হাউসে বৈঠক শেষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মশিউর রহমান, প্রধান প্রকৌশলী (বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি) মিজানুর রহমান এবং রুয়েটের প্রফেসর ড. নুরুল ইসলাম একই গাড়িতে করে সেখান থেকে চলে যান। এরপর তাঁদের গন্তব্য সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি বলে সূত্রটি জানিয়েছে। পরীক্ষার আগের রাতে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠক এবং বৈঠক শেষে তিনজনের একসঙ্গে স্থান ত্যাগের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের মতে, নিয়োগ পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের প্রেক্ষাপটে বৈঠকের উদ্দেশ্য, আলোচনার বিষয়বস্তু এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
নজিরবিহীন এই অনিয়মের অভিযোগের পরপরই গত ১৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে নেসকোর উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও মানব সম্পদ উন্নয়ন) মো: আফাজ উদ্দিনের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় যে, গত ২ অক্টোবর রুয়েটে অনুষ্ঠিত লিখিত পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে ঘোষিত ৫টি ক্যাটাগরির সকল মৌখিক পরীক্ষা আগামী ২৮ অক্টাবর থেকে ২৩ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হওয়ার কথা ছিল। তা "অনিবার্য কারণবশত" স্থগিত করা হয়েছে।
স্থগিত হওয়া পদসমূহ: ১. সহকারী ব্যবস্থাপক (অর্থ/অডিট/রেভিনিউ অ্যাসিওরেন্স) ২. টেকনিশিয়ান-আঞ্চলিক মেরামত কারখানা ৩. জুনিয়র সহকারী ব্যবস্থাপক (অর্থ/অডিট/রেভিনিউ অ্যাসিওরেন্স) ৪. সহকারী প্রকৌশলী (বিক্রয় ও বিতরণ/প্রকৌশল/বাণিজ্যিক পরিচালন/গ্রাহক সেবা/ক্রয়) ৫. সাহায্যকারী
চাকরি প্রার্থী ও সচেতন মহলের দাবি, অবিলম্বে এই বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়া পুরোপুরি বাতিল করে নতুন করে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে সার্কুলার দিতে হবে। একই সাথে সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জন্য কর্তৃপক্ষের নিকট জোর দাবি জানানো হয়েছে।
নেসকোর ১৬ সেপ্টেম্বরের একটি অফিস আদেশে ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির আওতায় সাব-স্টেশন অ্যাটেনডেন্ট এবং প্রধান শিক্ষক (মাধ্যমিক বিদ্যালয়) পদ ছাড়া অন্যান্য পদের নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে ছয় সদস্যের কমিটি গঠনের তথ্য রয়েছে। নথি অনুযায়ী, কমিটিতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (প্রশাসন), নেসকোর নির্বাহী পরিচালক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ উন্নয়ন), প্রধান প্রকৌশলী (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন), বিদ্যুৎ বিভাগের মনোনীত প্রতিনিধি, নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ উন্নয়ন) রয়েছেন।
কমিটিতে নেসকোর প্রধান প্রকৌশলীকে বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি হিসেবে রাখা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ পদে প্রতিষ্ঠানের বাইরের কোনো স্বাধীন বিশেষজ্ঞকে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ ছিল কি না, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি জ্যেষ্ঠতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নেসকোর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) এবং পরিচালক (ডিস্ট্রিবিউশন অ্যান্ড অপারেশনস)-কেও কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা যেত কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তবে কমিটির গঠন মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধি, কমিটির কার্যপরিধি, সদস্যদের যোগ্যতা ও দায়িত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা জরুরি।
এদিকে নেসকোর নিয়োগ পরীক্ষায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-৩-এর সহকারী প্রকৌশলী রতনা বেগমের ছোট ভাই রতন, নির্বাহী পরিচালক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ উন্নয়ন) কার্যালয়ের পিয়ন কাজলের ছেলে এবং কাশিয়াডাঙ্গা বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের এক লাইনম্যানের ছেলেসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর আত্মীয় লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। অথচ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ও স্নাতক পর্যায়ের অনেক শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেননি। এ নিয়ে ফলাফল প্রণয়নে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে স্বজনপ্রীতির অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে পরীক্ষার নম্বর ও মূল্যায়নপ্রক্রিয়া খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে নেসকোর নির্বাহী পরিচালক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ উন্নয়ন) আফাজ উদ্দিন বলেন, " আগেই বোর্ড সভায় পদসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এখন পদাধিকারবলে নিয়োগ কমিটির সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। পূর্বের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে পদসংখ্যা বাড়ানো বা কমানোর বিষয়টি উল্লেখ ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে সাহায্যকারী পদে পদসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়ে নতুন কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি।”
মাস্টারপাড়া রেস্ট হাউসে পরীক্ষার আগের রাতে বৈঠকের বিষয়ে তিনি বলেন, “ঢাকা থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসেছিলেন। পরীক্ষা কীভাবে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা যায়, সে বিষয়ে রুয়েটের শিক্ষকদের সমন্বয়ে একটি বৈঠক হয়েছিল। পরীক্ষাটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিল রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট)।”
এব্যাপারে নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মশিউর রহমানকে ফোন দিলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি ফলে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।