ইফতেখার আলম বিশাল: রাজশাহীর পুঠিয়ায় বিয়ের দাওয়াতকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে রুহুল (১৯) নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে প্রতিবেশী শাহীন ও তাঁর ছেলে স্বাধীনের বিরুদ্ধে। পরিবারের দাবি, দাওয়াত দিয়ে অপমানজনকভাবে ফিরিয়ে নেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত। এর জের ধরে রুহুলকে মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে তিন দিন পর তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্বজন ও স্থানীয়রা।
গত ১৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টার দিকে উপজেলার বাড়ইপাড়া (সরদারপাড়া) গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। পরে ১৯ অক্টোবর দুপুরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রুহুলের মৃত্যু হয়।
রুহুলের মা রজিনা বেগম অভিযোগ করেন, শাহীন তাঁর ভাতিজা। শাহীনের বড় ছেলের বিয়েতে তাঁকে ও তাঁর বড় বোন রাজিয়া বেগমকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দাওয়াত দেওয়ার এক দিন পর শাহীন তাঁকে জানান, তাঁর বড় বোন মাছের ব্যবসা করেন। হাটে-বাজারে ব্যবসা করার কারণে বিয়েতে গেলে তাঁদের পরিবারের মানসম্মান ক্ষুণ্ন হবে। এ কারণে তাঁদের অনুষ্ঠানে যেতে নিষেধ করা হয়।
রজিনা বেগম বলেন, “দাওয়াত দিয়ে আবার ফিরিয়ে নেওয়ায় খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। তাঁর কথামতো আমরা বিয়েতে যাইনি। আমিও বাড়ি ছেড়ে বোনের বাসায় চলে যাই। দুই বোন মিলে সন্তানদের নিয়ে নিজেরাই রান্না করে খেয়েছি।”
তিনি অভিযোগ করেন, শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বৌভাতের অনুষ্ঠান শেষে বিকেলে তাঁরা বাড়িতে ফেরেন। পরে শাহীন, তাঁর ছেলে স্বাধীনসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা তাঁদের গালিগালাজ করেন। এর প্রতিবাদ করলে মারধরের জন্য তেড়ে আসেন তাঁরা। একপর্যায়ে পরিস্থিতি শান্ত হলে তাঁরা বাড়ির বাইরে যান। পরে বাড়ি থেকে চিৎকার শুনে ফিরে এসে রুহুলকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। তাঁর মাথা থেকে প্রচুর রক্ত ঝরছিল এবং তিনি অচেতন ছিলেন।
রুহুলের বড় খালা রাজিয়া বেগম বলেন, “আমি নারী হয়েও কষ্ট করে মাছের ব্যবসা করি। অভাবের সংসার হলেও কারও কাছে হাত পাতি না। আমাকে দাওয়াত দিয়ে ফিরিয়ে নেওয়ায় আমার বোনও ওই অনুষ্ঠানে যায়নি। এরপর আমার সন্তানতুল্য ভাগনে রুহুলকে মারধর করা হয়েছে। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।”
অভিযুক্ত শাহীনের চাচা মুন্তাজও ঘটনার বিচার দাবি করেছেন। তাঁর অভিযোগ, শাহীন ও তাঁর ছেলে স্বাধীন বিভিন্ন ছোটখাটো বিষয় নিয়ে এলাকার মানুষের সঙ্গে বিরোধে জড়ান। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গেও তাঁদের বিরোধ রয়েছে। রুহুলকে তিনি ভালো ছেলে হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ঘটনার সময় শাহীনের হাতে জ্বলন্ত বস্তু এবং তাঁর ছেলে স্বাধীনের হাতে হাতুড়ি ছিল। সেগুলো দিয়ে রুহুলকে একের পর এক আঘাত করা হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ, হামলায় কারা জড়িত এবং কীভাবে রুহুলের মৃত্যু হয়েছে, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, শাহীন ও তাঁর ছেলে স্বাধীনের বিরুদ্ধে মাদক কারবারসহ নানা কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের দাবি, এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখে অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা হোক। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে পুঠিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদুল ইসলাম বলেন, ১৯ অক্টোবর তাঁরা ঘটনাটি জানতে পারেন। ভুক্তভোগীর পরিবার মামলা দেওয়ার পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঘটনার দিন স্থানীয় কেউ বা পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশকে জানানো হয়নি। ফলে সেদিন পুলিশের কোনো সদস্য ঘটনাস্থলে যাননি।
তিনি আরও বলেন, “ঘটনার দিন পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়েও অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করেনি—এমন তথ্য সঠিক নয়। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিরা যে-ই হোক, তাঁদের গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে।”
বিয়ের দাওয়াত নিয়ে বিরোধের অভিযোগ থেকে এক তরুণের মৃত্যু—ঘটনাটি এলাকায় উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে অভিযোগের সত্যতা, হামলার প্রকৃত কারণ এবং দায়ীদের শনাক্ত করতে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। একই সঙ্গে মামলার অগ্রগতি ও অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে পুলিশের কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন স্বজনরা।