শিরোনাম
◈ এমপি গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার ◈ সিগারেট-ওষুধ-মোবাইলসহ ১১ খাতের জন্য এনবিআরের নতুন আদেশ  ◈ সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৯ দিনে রেমিট্যান্স এলো ১৮১ কোটি ডলার ◈ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে বাংলাদেশ-ভারত বিটুবি টাস্কফোর্সের তাগিদ ◈ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও সা‌বেক ভি‌সি  মাকসুদ কামালসহ ৫ জ‌নের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি ◈ এশিয়ান গেমস ম‌হিলা ক্রিকে‌টে স্বর্ণ-রৌপ্যের সুযোগ শেষ, এবার ব্রোঞ্জের লড়াইয়ে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ পা‌কিস্তান ◈ রাজধানীতে বাসে আগুন দেওয়ার চেষ্টার সময় যুবক আটক ◈ আরও ৪ শিশুর মৃত্যু হামের উপসর্গে, মোট ১০৫৭ ◈ আরও ৬ জনের মৃত্যু ডেঙ্গুতে, হাসপাতালে ১৫৯৩ ◈ জাল টাকার বস্তা ময়লার ভাগাড়ে, আসল ভেবে হুলস্থুল কাণ্ড

প্রকাশিত : ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:৩৭ রাত
আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:৩৭ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

পশুরের ভাঙনে বিপন্ন বানীশান্তার যৌনপল্লী

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সুন্দরবন : সুন্দরবনের উপকূলে দাকোপের বানীশান্তা পশুর নদী তীরে গড়ে ওঠা পল্লীর যৌনকর্মিদের জীবন হয়ে উঠেছে দূর্বিষহ। অর্থনৈতিক দৈন্যতার সাথে নদী ভাঙন আতংকে ঝুঁকিপূর্ন বসবাস। পল্লীর স্বঘোষিত গডফাদার মানিকের নিয়ন্ত্রনে মাদক আর জুয়ার আসর বসে সেখানে।সামনে পশুর নদী। পেছনে চিংড়িঘের। মাঝখানে বাঁশ-কাঠের টোঙঘর। একটু পানি বাড়লেই ঘুম হারাম, নদীভাঙন শুরু হলে ঘর সরানোর তাড়া। এরই মধ্যে কমেছে আয়, বেড়েছে খাবারের সংকট। সন্তানদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। সুন্দরবন উপকূলের দাকোপের বানীশান্তা যৌনপল্লীর প্রায় ১৩০ নারী এখন যেন নদী, দারিদ্র্য আর সামাজিক বঞ্চনার ত্রিমুখী চাপে আটকে থাকা এক জনপদের বাসিন্দা।

একদিকে পশুর নদীর ভাঙন তাঁদের বসতভিটা কেড়ে নেওয়ার আতঙ্ক তৈরি করছে, অন্যদিকে পল্লীর ভেতরে মাদক ও জুয়ার আসর বসার অভিযোগ নতুন করে নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মানিক নামে এক ব্যক্তির প্রভাবেই পল্লীর নানা কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রিত হয়। এমনকি একটি এনজিওর স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম নিয়েও তাঁর হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে।

advertisement

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্যও এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

এক সময়ের চালনা বন্দর নদীর নাব্যতা সংকটের কারনে স্থানান্তরিত হয়ে চলে যায় মোংলায়। মূলত ওই বন্দর ঘিরে দ্বিগরাজের বিপরীত পাড়ে পশুর নদী তীরে দাকোপের বানীশান্তা এলাকায় গড়ে ওঠে যৌনপল্লী। সামাজিক নানা পরিস্থিতির শিকার হয়ে জীবনের তাগিদে ঘৃনিত এই পেশা বেছে নেয়া ভাগ্য বিড়ম্বিত নারীরা সেখানে যৌনকর্মি হিসাবে কাজ করে। বর্তমানে বানীশান্তার এই পল্লীতে অবস্থান করছে ১৩০ জন নারী কর্মি। সামনে পশুর নদীর অব্যহত ভাঙন আর পিছে চিংড়ী চাষের ঘের। দু’পাশেই অথৈ পানির মাঝখানে টোঙ ঘরে তাদের ঝুঁকিপূর্ন বসবাস। নদীতে পানির চাপ একটু বাড়লেই তাদের অনেকটা নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়। বর্তমানে ওই পল্লীতে অন্তত অর্ধশত শিশু আছে। সামাজিক ঘৃনার দৃষ্টি আর শিশু সুরক্ষার কোন ব্যবস্থা না থাকায় পল্লীর শিশুদের স্বাস্থ্য শিক্ষায় আছে নানা সমস্যা। অতীতে সমাজ ব্যবস্থায় তাদেরকে যেভাবে ঘৃনা আর অবহেলার চোখে দেখা হত সে অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। অতীতে কোন যৌনকর্মি মারা গেলে কোন ধর্মীয় বিধান ছাড়াই তাদের মরদেহ পশুর নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হত। এখন অবস্থার পরিবর্তন হয়ে তাদের জন্য পৃথক কবরস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু এই পেশাকে ঘৃনা ও পাপের কাজ বলে এখনও যৌনকর্মিদের দাফন প্রক্রিয়ায় স্থানীয়রা অংশ নিতে চায়না।

advertisement

কাষ্টমার কমে যাওয়ায় তারা এখন চরম আর্থিক দৈন্যতার মাঝে আছে এমন দাবী করেছেন পল্লীর নারী সংগঠনের সাধারণ সম্পাদিকা আনজুমা বেগম।

পল্লীর কেউ মারা গেলে স্থানীয়দের কাছ থেকে দাফন সহায়তা না পাওয়ার আক্ষেপের কথা তুলে ধরে পল্লীর সভানেত্রী লাভলী বেগম বলেন, অধিকাংশ নারী কর্মি তিনবেলা ঠিকমত খেতে পারেনা। নদী ভাঙনের কারনে প্রতি নিয়ত তাদের ঘর স্থানান্তর করতে হয় এমন দাবী করে তিনি বলেন, আমরা চাই এখানে বসবাসের নিরাপত্তা।

advertisement

অনুসন্ধানে উঠে আসে পল্লীতে রমরমা মাদক ও জুয়ার আড্ডার কথা। স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্র ছায়ায় চিহ্নিত ব্যবসায়ী মানিক সেখানে সব ধরনের মাদকের সাপ্লাইয়ার। ওই পল্লীর স্বঘোষিত গডফাদার এই মানিকের ইচ্ছের বাইরে সেখানে কোন কাজ হয়না। জানা গেছে সেখানে ৩ টি এনজিও যৌন কর্মিদের মর্জিমত নাম মাত্র স্বাস্থ্য সেবা দেয়। উপজেলা প্রশাসনের সাথে তাদের আইনী বৈধতার বাইরে জবাবদিহি মূলক কোন যোগাযোগ নেই। স্বাস্থ্য সেবার নামে এমন অনিয়মের বিষয়ে কর্মরত পিএইচডি নামের এক এনজিও’র কর্মি অর্পিতা বিশ্বাস পূজার সাথে কথা বলার চেষ্টা করলে পল্লীর সেই স্বঘোষিত গড ফাদার মানিক সেখানে বাঁধা দেয়। আর এনজিও কর্মিরাও নিজেদের জবাবদিহিতার বাইরে রাখতে মানিককে খুশী রেখে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে বলে জানা গেছে। বানীশান্তার যৌন কর্মিরা সেখানে নিরাপদ পরিবেশ আর মানবিক অধিকার গুলো পেতে প্রশাসনের সদয় দৃষ্টি কামনা করেছে। আর সচেতন মহল পল্লীকে মাদকমুক্ত করতে প্রশাসনের বিশেষ অভিযান এবং সার্বক্ষনিক নজরদারীর দাবী করেছে।কমেছে আয়, বাড়ছে খাবারের সংকট

পল্লীর নারী সংগঠনের সাধারণ সম্পাদিকা আনজুমা বেগমের দাবি, কাস্টমার কমে যাওয়ায় নারী কর্মীদের আয় কমেছে। ফলে তাঁরা এখন চরম আর্থিক দৈন্যতার মধ্যে রয়েছেন।

পল্লীর সভানেত্রী লাভলী বেগম বলেন, “অধিকাংশ নারী কর্মী তিনবেলা ঠিকমতো খেতে পারেন না।”

নদীভাঙনের কারণে প্রতিনিয়ত ঘর স্থানান্তর করতে হয় জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা চাই এখানে বসবাসের নিরাপত্তা।”

জীবিকার অনিশ্চয়তার পাশাপাশি বসতভিটা হারানোর আশঙ্কাও তাঁদের সংকট আরও বাড়িয়ে তুলছে বলে জানিয়েছেন পল্লীর বাসিন্দারা।

অর্ধশত শিশু, স্বাস্থ্য-শিক্ষায় সংকট

বর্তমানে ওই পল্লীতে অন্তত অর্ধশত শিশু রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। সামাজিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

পল্লীর বাসিন্দারা জানান, অতীতে যৌনকর্মীদের সন্তানদের প্রতি সামাজিক অবহেলা আরও প্রকট ছিল। সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হলেও শিশুদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা এখনও পর্যাপ্ত নয় বলে তাঁদের অভিযোগ।

মৃত্যুর পরও বঞ্চনার ইতিহাস

পল্লীর বাসিন্দাদের ভাষ্য, অতীতে কোনো যৌনকর্মী মারা গেলে ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী দাফনের সুযোগও মিলত না। এমনকি মরদেহ পশুর নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে তাঁরা দাবি করেন।

বর্তমানে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। যৌনকর্মীদের জন্য পৃথক কবরস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে তাঁদের দাবি, কোনো যৌনকর্মী মারা গেলে দাফন প্রক্রিয়ায় স্থানীয়দের অংশগ্রহণ এখনও সীমিত।

পল্লীর নারীরা বলছেন, জীবিত অবস্থায় যেমন তাঁরা মানুষের মর্যাদা চান, মৃত্যুর পরও তেমনি সম্মানজনক দাফনের অধিকার চান।

মাদক-জুয়ার আসর নিয়ে গুরুতর অভিযোগ

পল্লীতে অনুসন্ধানের সময় মাদক ও জুয়ার আসর বসার অভিযোগও উঠে এসেছে। স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় মানিক নামে এক ব্যক্তি সেখানে বিভিন্ন ধরনের মাদক সরবরাহ করেন।

তাঁদের আরও অভিযোগ, ওই ব্যক্তির প্রভাবের কারণে পল্লীর বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় এবং তাঁর ইচ্ছার বাইরে অনেক কাজ করা কঠিন।

তবে মাদক সরবরাহ, জুয়া পরিচালনা কিংবা পল্লীর কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের এসব অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। এসব বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য প্রয়োজন।

তিন এনজিওর স্বাস্থ্যসেবা, জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন

পল্লীর সংশ্লিষ্টদের দাবি, সেখানে তিনটি এনজিও যৌনকর্মীদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে থাকে। তবে এই স্বাস্থ্যসেবার পরিধি, নিয়মিততা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন বাসিন্দা।

স্বাস্থ্যসেবার নামে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে পিএইচডি নামের একটি এনজিওর কর্মী অর্পিতা বিশ্বাস পূজার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে স্থানীয় এক ব্যক্তি বাধা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পল্লীর কয়েকজনের দাবি, স্থানীয় প্রভাবের কারণে এনজিওগুলোর কার্যক্রমেও এক ধরনের নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এনজিওগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।

নিরাপদ পরিবেশ ও মানবিক অধিকার চান নারীরা

বানীশান্তার যৌনকর্মীরা নিরাপদ পরিবেশে বসবাস, নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা, সন্তানদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসুরক্ষা এবং মৃত্যুর পর মর্যাদাপূর্ণ দাফনের সুযোগ চান।

তাঁদের দাবি, নদীভাঙন থেকে বসতি রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি পল্লীতে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে।

সচেতন মহল মাদক ও জুয়ার অভিযোগ তদন্তে প্রশাসনের বিশেষ অভিযান এবং নিয়মিত নজরদারির দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে পল্লীতে থাকা শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পৃথক উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেছেন তাঁরা।

পশুর নদীর পানি বাড়লেই বানীশান্তার টোঙঘরে বাড়ে আতঙ্ক। ভাঙন শুরু হলে ঘর সরানোর তাড়া। আয় কমলে সামনে আসে খাবারের সংকট। আর সামাজিক বঞ্চনার দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিরাপত্তা ও শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন উদ্বেগ।

সামনে পশুর নদী, পেছনে চিংড়িঘের—মাঝখানে টোঙঘরে ১৩০ নারীর জীবন। নদীভাঙন, দারিদ্র্য ও নিরাপত্তাহীনতার এই বাস্তবতায় তাঁদের নিরাপদ বসবাস ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত হবে কবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

  • সর্বশেষ