নিনা আফরিন, পটুয়াখালী : দীর্ঘ ১৮ বছর পর পটুয়াখালী ২৫০ শয্যা হাসপাতালের রোগীদের খাবার সরবরাহে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে। তবে নতুন ঠিকাদার নিয়োগেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। আলতাফ হোসেন নামের এক ঠিকাদার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসক ও হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের কাছে এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
লিখিত অভিযোগ সুত্রে জানাযায়, চলতি বছরের ১১ জুলাই রোগীদের খাবার (পথ্য),স্টেশনারিসহ কয়েকটি প্যাকেজে দরপত্র আহ্বান করেন পটুয়াখালী ২৫০ শয্যা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. দিলরুবা ইয়াসমিন লিজা। এতে অভিযোগকারীসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রোগীর পথ্য (খাবার) ও স্টেশনারি সরবরাহ গ্রুপে অংশ গ্রহন করে। ১১ আগস্ট দরপত্রের নীতিমালা অনুযায়ী অভিযোগকারী সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে বিবেচিত হন। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে কার্যাদেশ না দিয়ে উচ্চমূল্যে দর প্রস্তাব করা এক প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দিয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়।
অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, রোগীর পথ্য সরবরাহের দরপত্রে তিনি ১ কোটি ২৭ লাখ টাকা মূল্য প্রস্তাব করেন। তবে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে তাঁকে অগ্রাহ্য করে ১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা প্রস্তাবকারী প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ৩২ লাখ টাকা বেশি দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে।
একই ভাবে স্টেশনারি সামগ্রী সরবরাহের ক্ষেত্রেও অনিয়ম করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে তিনি বলেন, স্টেশনারি সরবরাহের ক্ষেত্রে তিনি ১২ লাখ টাকা মূল্য প্রস্তাব করেন। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে কার্যাদেশ না দিয়ে ১৮ লাখ টাকা মূল্য প্রস্তাবকারীকে কার্যাদেশ দিয়েছেন। এখানেও ৬ লাখ টাকা বেশি দরে কাজ দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগকারী তাঁর অভিযোগে কার্যাদেশ দেয়া প্রতিষ্ঠানটির পরিচয় উল্লেখ করেননি। এছাড়া হাসপাতাল সূত্রেও অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানটির পরিচয় পাওয়া যায়নি।
পটুয়াখালী ২৫০ শয্যা হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে রোগীদের পথ্য সরবরাহকারী হিসেবে পটুয়াখালী পৌর আওয়ামী লীগের অর্থবিষয়ক সম্পাদক সহিদুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তিকে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়েছিলো। এরপর ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত তাঁকে বহাল রাখা হয়। দীর্ঘদিন ধরে একই কার্যাদেশের মাধ্যমে ঠিকাদার সহিদুল ইসলামকে বহাল রাখার ঘটনায় জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভা, আইন শৃংখলা কমিটির সভায় একাধিকবার আলোচনা, মানববন্ধন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দেওয়া হলেও দীর্ঘ ১৮ বছরে তাঁকে পরিবর্তন করা হয়নি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১ জুলাই এ-সংক্রান্ত ঘটনায় জনৈক মো. আবুল কালাম নামের এক ব্যক্তি পটুয়াখালী দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। ওই অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, ঠিকাদার সহিদুল ইসলাম ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরষ্পরের যোগসাজশে কোনো কারণ ছাড়াই দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে হাসপাতালের খাবারের টেন্ডার বন্ধ রেখেছে। অভিযোগে হাসপাতালের হিসাবরক্ষক মু. হাসানুজ্জামানকে ঠিকাদারের ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া অভিযোগকারী তাঁর অভিযোগে রোগীদের খাবার পরিমাণে কম দেওয়াসহ বিভিন্ন অসংগতি তুলে ধরেন।
অন্যদিকে জানা যায়,২০০৮-০৯ অর্থ বছরে পাওয়া একটি কার্যাদেশ দিয়ে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত অর্থাৎ টানা ৯ বছর রোগীদের পথ্য সরবরাহ করেন আওয়ামী লীগ নেতা সহিদুল ইসলাম। এসব বিষয়ে নানা মহলে অভিযোগ ওঠার পর ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ২০ আগস্ট নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করা হয়। এরপর টেন্ডার স্থগিত চেয়ে ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট পটুয়াখালী সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে একটি মামলা করেন ঠিকাদার সহিদুল ইসলাম। তবে আদালত থেকে এখন পর্যন্ত টেন্ডার স্থগিত রাখার কোন আদেশ দেয়া হয়নি বলে জানিয়েছে একাধিক সুত্র।
মামলার নথি অনুযায়ী, সহিদুল ইসলামের মামলাটি নথিভুক্ত হওয়ার পর একই বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, অর্থাৎ মামলার বিবাদী, আপত্তি দিয়ে আদালতে বর্ণনা দাখিলের জন্য সময় চান। বিবাদী আদালতে সময় চেয়ে ২০১৭ সালের ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত বহাল রাখে। পরে ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি আদালত বিবাদীর (হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ) সময়ের আবেদন নাকচ করেন। এরপর ২০১৮ সালের ২৩ মে আদালতে বর্ণনা দাখিল করা হলে ৩০ আগস্ট ইস্যু গঠনের দিন ধার্য করা হয়। এর পরবর্তী পাঁচ বছরে মামলার কোনো অগ্রগতি হয়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আদালতের সঙ্গে কার্যত যোগাযোগ না রাখায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান একাধিক আইনজীবী।
মামলার নথি অনুযায়ী আরও জানা যায়, ২০২৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বর আদালত পুনরায় ইস্যু গঠনের দিন ধার্য করেন। এরপর ২০২৪ সালের ২৮ এপ্রিল, ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট আদালতে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শেষের শুনানিতে সিনিয়র সিভিল জজ আদালতের বিচারক মো. রাসেল মজুমদার মামলার নথিপত্র বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে বলে মনে করে চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি শুনানির দিন ধার্য করেন। পরবর্তীতে ২৬ ফেব্রুয়ারির শুনানি হলে ৩০ আগস্ট নতুন করে ইস্যু গঠনের দিন নির্ধারণ করা হয়। আদালতের তথ্য অনুযায়ী, ২৬ ফেব্রুয়ারির শুনানিতে শুধুমাত্র বাদীপক্ষের আইনজীবীর উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে পটুয়াখালী ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ দিলরুবা ইয়াসমিন লিজা এবং হিসাব রক্ষক মু. হাসানুজ্জামানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তাঁরা ফোন রিসিভ করেননি।
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী অভিযোগের বিষয়ে বলেন,‘সব সরকারি দপ্তর সরকারি ক্রয়বিধি, ২০২৫ অনুযায়ী সব ধরনের ক্রয় কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অর্থের যথাযথ ব্যবহার ও সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করার নীতিকে অগ্রাধিকার দেয়ার বিধান রয়েছে। কেউ যদি এ বিধি উপেক্ষা করেন তা হলে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে।