শিরোনাম
◈ নবম পে-স্কেলের বেতন কাঠামো প্রকাশ ◈ লর্ডসে পাকিস্তানের ভরাডুবি, সি‌রিজ জিত‌লো ইংল‌্যান্ড ◈ মন্ত্রিসভার বৈঠকে নবম পে-স্কেলের প্রস্তাব অনুমোদন, জানুন প্রজ্ঞাপন ও বেতন কার্যকরের তারিখ ◈ আসিম মুনিরের অস্ত্র কারখানা পরিদর্শন : পূজার আগে পাকিস্তানের হামলার শঙ্কা, নজরদারি বাড়িয়েছে ভারত ◈ ‘পরীক্ষিত’ সিল ছাড়া মাংস বিক্রি করলে দোকান বন্ধ: ডিএসসিসি প্রশাসক ◈ সেপ্টেম্বরেও অপরিবর্তিত জ্বালানি তেলের দাম ◈ যুব এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে রাতে মুখোমুখি বাংলাদেশ ও উজবেকিস্তান ◈ সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের জন্য সুখবর, ৭ সেপ্টেম্বর থেকে মূল টাকা তুলতে পারবেন গ্রাহকেরা ◈ রা‌তে নারী এশিয়া কা‌পে ইন্দোনেশিয়ার বিরু‌দ্ধে ম্যাচ দিয়ে লড়াই শুরু বাংলা‌দে‌শের ◈ পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তে বাস উল্টে আহত ৮

প্রকাশিত : ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ০৮:৪৯ রাত
আপডেট : ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:২২ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

সুন্দরবন ঘিরে পর্যটনের রমরমা, লাভের বাইরে স্থানীয় মানুষ

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সুন্দরবন : দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও মৎস্যভান্ডার হিসেবে খ্যাত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের  উপকূলজুড়েতিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে আবার খুলছে সুন্দরবনের দ্বার। জেলে পল্লিতে ফিরছে কর্মচাঞ্চল্য। জীবিকার সন্ধানে বাঘ-কুমির ও বনদস্যুর আতঙ্ক উপেক্ষা করে নদী-খালে নামবেন জেলেরা। অন্যদিকে দেশি-বিদেশি পর্যটকের অপেক্ষায় প্রস্তুত হচ্ছে ট্যুর অপারেটর, লঞ্চ ও বোট। আবারও সুন্দরবনের নদী কেটে ছুটবে পর্যটকবাহী নৌযান।

ভোরে কুয়াশা নামে। জোয়ার আসে। কেওড়ার পাতায় সূর্যের আলো পড়ে। নদীর বুক চিরে নৌকা এগিয়ে যায়। হঠাৎ কোথাও দেখা মেলে চিত্রল হরিণের। পর্যটকের ক্যামেরায় বন্দি হয় পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভের অপরূপ দৃশ্য।

দৃশ্যটি অসাধারণ।

কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে আরও বড় এক প্রশ্ন—

সুন্দরবনকে ঘিরে যে পর্যটন অর্থনীতি ফুলে-ফেঁপে উঠছে, তার লাভ যাচ্ছে কার ঘরে?

পর্যটক আসছেন। নৌকা চলছে। গাইড কাজ করছেন। খাবারের ব্যবসা হচ্ছে। পরিবহন চলছে। আবাসনের চাহিদা বাড়ছে। স্থানীয় পণ্য বিক্রির সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।

অর্থাৎ সুন্দরবনকে ঘিরে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন অর্থনীতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

কিন্তু সেই অর্থনীতির কেন্দ্রে কি সুন্দরবনের মানুষ?

নাকি সুন্দরবনের মানুষই রয়ে যাচ্ছেন পর্যটন অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বল অংশীদার?

সুন্দরবনের আশপাশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে স্থানীয় মানুষ, পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে যে চিত্র পাওয়া যায়, তাতে দেখা গেছে—পর্যটনের সম্ভাবনা বিশাল হলেও স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ, দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা তৈরি এবং আয় বণ্টনের কাঠামো এখনো প্রয়োজনের তুলনায় দুর্বল।

পর্যটক বাড়ছে, স্থানীয় মালিকানা বাড়ছে কি?

সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়। এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশগত নিরাপত্তার অন্যতম রক্ষাকবচ, জীববৈচিত্র্যের আধার এবং হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি প্রাকৃতিক সম্পদ।

প্রতিবছর পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। তাদের ঘিরে তৈরি হচ্ছে নৌভ্রমণ, গাইডিং, খাবার, পরিবহন, আবাসন ও স্থানীয় পণ্য বিক্রির বাজার।

কিন্তু একজন পর্যটক সুন্দরবনে এসে যে অর্থ ব্যয় করেন, তার কত অংশ স্থানীয় মানুষের হাতে থাকে—এই প্রশ্নের উত্তর স্থানীয় পর্যায়ে স্পষ্ট নয়।

পর্যটনের অর্থনীতি তখনই স্থানীয় উন্নয়নের শক্তিশালী হাতিয়ার হয়, যখন পর্যটকের ব্যয় স্থানীয় পরিবার, তরুণ উদ্যোক্তা, নারী, কৃষক, জেলে, মাঝি ও কারুশিল্পীদের মধ্যে ঘুরে ফিরে আয় সৃষ্টি করে।

অন্যথায় পর্যটক বাড়বে, ব্যবসা বাড়বে—কিন্তু স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন সেই হারে বাড়বে না।

অনুসন্ধানী বক্স–১
তথ্য-উপাত্তে যে চিত্র

সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনের বর্তমান বাস্তবতায় কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট—

তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে পর্যটন কার্যক্রম পুনরায় শুরু হচ্ছে। পর্যটক পরিবহনের জন্য লঞ্চ, বোট ও ট্যুর অপারেটররা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পর্যটনের সঙ্গে নৌযান, গাইড, খাবার, পরিবহন ও আবাসনসহ একাধিক সেবা খাত যুক্ত।সুন্দরবনকেন্দ্রিক কমিউনিটি বেইজড ইকোট্যুরিজমে স্থানীয় গাইড, হোমস্টে, হস্তশিল্প, স্থানীয় খাবার ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সম্ভাবনা রয়েছে।

স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইড, ট্যুর অপারেটর, হসপিটালিটি কর্মী ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। সুন্দরবনের পর্যটনের জন্য স্থানীয় দক্ষতা উন্নয়নের একটি সমন্বিত ‘স্কিল ম্যাপ’ এখনো বড় প্রয়োজন। সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের স্থানীয় তরুণদের পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। পর্যটকের ব্যয়ের কত অংশ স্থানীয় অর্থনীতিতে থাকছে—এ বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত ও সহজলভ্য হিসাবের ঘাটতি রয়েছে।

মূল অনুসন্ধানী প্রশ্ন: পর্যটক বাড়ছে, কিন্তু স্থানীয় মালিকানা ও আয় কতটা বাড়ছে?

সবচেয়ে বড় ঘাটতি—দক্ষ মানুষ

সুন্দরবনের পর্যটন উন্নয়নের কথা উঠলেই জেটি, নৌযান, পর্যটন স্পট, অবকাঠামো ও প্রচারণার কথা বলা হয়।

কিন্তু পর্যটনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো—দক্ষ মানুষ—থেকে যায় আড়ালে।

একজন পেশাদার ট্যুর গাইড শুধু পর্যটককে একটি জায়গা দেখিয়ে দেবেন না।

তিনি জানবেন সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য। জানবেন নদীর জোয়ার-ভাটা। জানবেন বন্যপ্রাণীর কাছাকাছি পর্যটকের আচরণ। জানবেন পরিবেশগত বিধিনিষেধ। জরুরি পরিস্থিতিতে কী করতে হবে, সেটিও জানবেন।

সবচেয়ে বড় কথা, তিনি সুন্দরবনের গল্প বলতে পারবেন।

‘ওখানে হরিণ দেখা যাচ্ছে’—এই তথ্যের বাইরে গিয়ে একজন দক্ষ গাইড পর্যটককে বোঝাতে পারবেন কেন হরিণ সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের অংশ, কেন বন্যপ্রাণীকে বিরক্ত করা যাবে না এবং কেন বন সংরক্ষণ পর্যটকেরও দায়িত্ব।

এই জ্ঞানভিত্তিক পর্যটনই সুন্দরবনকে সাধারণ নৌভ্রমণ থেকে প্রকৃত ইকোট্যুরিজমে নিয়ে যেতে পারে।

মাঝি আছেন, কিন্তু প্রশিক্ষণ কতটা?

সুন্দরবনের নদী-খাল স্থানীয় মাঝিদের কাছে অপরিচিত নয়।

তারা স্রোত বোঝেন। জোয়ার-ভাটা বোঝেন। নদীর বাঁক চেনেন। আবহাওয়ার পরিবর্তন সম্পর্কে প্রজন্মের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাদের।

কিন্তু পর্যটক ব্যবস্থাপনা, প্রাথমিক চিকিৎসা, অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি উদ্ধার, পর্যটকের সঙ্গে আচরণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ ছাড়া সেই অভিজ্ঞতা আধুনিক পর্যটনসেবায় পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন।

একজন স্থানীয় মাঝিকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ ইকোট্যুরিজম কর্মীতে পরিণত করা সম্ভব।

এতে স্থানীয় কর্মসংস্থান যেমন বাড়বে, তেমনি পর্যটকের নিরাপত্তা ও সেবার মানও উন্নত হবে।

হোমস্টে হতে পারে নতুন অর্থনীতির দরজা

সুন্দরবনের আশপাশের গ্রামগুলোকে এখনো অনেকাংশে সুন্দরবনে প্রবেশের পথ হিসেবে দেখা হয়।

অথচ এই গ্রামগুলো নিজেরাই পর্যটনের গন্তব্য হতে পারে।

পর্যটক শুধু বন দেখতে চান না। তিনি স্থানীয় মানুষের জীবন দেখতে চান। স্থানীয় খাবার খেতে চান। নদীঘেরা জনপদের গল্প শুনতে চান। গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে চান।

এখানেই সম্ভাবনা হোমস্টের।

একটি পরিচ্ছন্ন বাড়ি। নিরাপদ থাকার ব্যবস্থা। স্থানীয় খাবার। স্বাস্থ্যবিধি। প্রশিক্ষিত আতিথেয়তা। অনলাইন বুকিং—এসব সুবিধা তৈরি করতে পারলে একটি সাধারণ পরিবারও পর্যটন উদ্যোক্তায় পরিণত হতে পারে।

কিন্তু হোমস্টে মানেই কয়েকটি ঘর ভাড়া দেওয়া নয়।

প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা, মান নিয়ন্ত্রণ, বাজারসংযোগ ও পর্যটক ব্যবস্থাপনা।

অনুসন্ধানী বক্স–২
স্থানীয় মানুষের কণ্ঠ

স্থানীয় মাঝি:
“সুন্দরবনের নদী আমরা চিনি। কোথায় স্রোত বেশি, কোথায় জোয়ারের চাপ—এসব আমাদের জানা। কিন্তু পর্যটকের সঙ্গে কীভাবে পেশাদারভাবে কাজ করতে হয়, সে ধরনের প্রশিক্ষণ খুব দরকার।”

স্থানীয় তরুণ:
“সুন্দরবন দেখতে প্রতিদিন মানুষ আসে। কিন্তু আমাদের এলাকার ছেলেরা সেই পর্যটন থেকে স্থায়ী কাজ কতটা পাচ্ছে? প্রশিক্ষণ ও সুযোগ থাকলে বাইরে যেতে হতো না।”

স্থানীয় নারী:
“আমরা স্থানীয় খাবার তৈরি করতে পারি, হস্তশিল্প করতে পারি। পর্যটকদের কাছে এসব বিক্রি করা গেলে সংসারে আয় বাড়ত। কিন্তু কোথায় বিক্রি করব, কীভাবে বাজার পাব—সেটা জানি না।”

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিন্ন প্রত্যাশা:
পর্যটক আসুক, ব্যবসা হোক; তবে সুন্দরবনের পাড়ের মানুষ যেন শুধু শ্রমিক না থেকে এই পর্যটন অর্থনীতির অংশীদার হন।

নারী উদ্যোক্তারা কোথায়?

সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন অর্থনীতিতে স্থানীয় নারীদের যুক্ত করার বিশাল সুযোগ রয়েছে।

স্থানীয় খাবার, হোমস্টে, হস্তশিল্প, মধু, মোম, শুকনা মাছ, কৃষিপণ্যসহ নানা স্থানীয় পণ্য পর্যটকদের কাছে তুলে ধরা যেতে পারে। একজন নারী নিজের বাড়ির একটি অংশ হোমস্টে হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। নিজের রান্না করা খাবার পর্যটকের কাছে বিক্রি করতে পারেন। নিজের তৈরি পণ্য বাজারজাত করতে পারেন।

কিন্তু এজন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন, বাজারসংযোগ এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ। নারীকে বাদ রেখে সুন্দরবনের পর্যটন অর্থনীতি পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।

পর্যটন ব্যবসা নয়, তৈরি করতে হবে পর্যটন অর্থনীতি

সুন্দরবনের পর্যটনকে শুধু নৌভ্রমণকেন্দ্রিক ব্যবসা হিসেবে দেখলে সম্ভাবনার বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যাবে।

একজন দক্ষ ট্যুর অপারেটর সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন সার্কিট তৈরি করতে পারেন।

সেখানে থাকতে পারে—

সুন্দরবন ভ্রমণ, পাখি দেখা, স্থানীয় খাবার, মধু ও মোম, হস্তশিল্প, নদীকেন্দ্রিক জীবন, গ্রামীণ সংস্কৃতি, স্থানীয় ইতিহাস, ফটোগ্রাফি ও হোমস্টে।

তখন একজন পর্যটক শুধু একটি বন দেখে ফিরবেন না; তিনি একটি অঞ্চলকে অনুভব করে ফিরবেন।

আর তার ব্যয়ের একটি বড় অংশ স্থানীয় অর্থনীতিতে থাকার সুযোগ তৈরি হবে।

প্রশাসনের দায় কোথায়?

এখানেই সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি আসে প্রশাসনের দিকে। স্থানীয় মানুষকে পর্যটনের অংশীদার করতে হলে শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগ যথেষ্ট নয়।

  • প্রয়োজন সরকারি পরিকল্পনা।
  • প্রয়োজন প্রশিক্ষণ।
  • প্রয়োজন সহজ অর্থায়ন।
  • প্রয়োজন নিরাপদ নৌযান।
  • প্রয়োজন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।
  • প্রয়োজন পর্যটক তথ্যকেন্দ্র।
  • প্রয়োজন প্রশিক্ষিত ও স্বীকৃত ট্যুর গাইড।
  • প্রয়োজন মানসম্মত হোমস্টে নীতিমালা।
  • প্রয়োজন স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বাজারসংযোগ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সুন্দরবনের পরিবেশগত ধারণক্ষমতার সঙ্গে পর্যটন কার্যক্রমের ভারসাম্য নিশ্চিত করা।

পর্যটন বাড়াতে গিয়ে যদি প্লাস্টিক, বর্জ্য, শব্দদূষণ কিংবা অনিয়ন্ত্রিত নৌচলাচলে বন ও বন্যপ্রাণীর ক্ষতি হয়, তাহলে যে সম্পদকে ঘিরে পর্যটন—সেই সম্পদই একদিন হুমকির মুখে পড়বে।

অনুসন্ধানী বক্স–৩
প্রশাসনের জবাব—করণীয় কী?

সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও পর্যটন ব্যবস্থাপনার সামনে এখন কয়েকটি মৌলিক দায়িত্ব—

১. স্থানীয় প্রশিক্ষণ:
গাইড, মাঝি, হোমস্টে পরিচালনাকারী, রাঁধুনি ও পর্যটন উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।

২. নিরাপত্তা:
নৌযানের নিরাপত্তা, জরুরি চিকিৎসা, অগ্নিনিরাপত্তা ও উদ্ধারব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

৩. স্বীকৃত গাইড:
সুন্দরবন বিষয়ে প্রশিক্ষিত স্থানীয় তরুণদের স্বীকৃত ট্যুর গাইড হিসেবে গড়ে তোলা।

৪. নারী উদ্যোক্তা:
নারীদের হোমস্টে, স্থানীয় খাবার ও হস্তশিল্প ব্যবসায় সহজ অর্থায়ন ও বাজারসংযোগ দেওয়া।

৫. স্থানীয় পণ্যের বাজার:
পর্যটনকেন্দ্র ও প্রবেশপথে স্থানীয় পণ্য বিক্রির নির্দিষ্ট ও মানসম্মত ব্যবস্থা তৈরি করা।

৬. বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ:
সুন্দরবনে পর্যটকের প্লাস্টিক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কঠোর ব্যবস্থা করা।

৭. পরিবেশগত ধারণক্ষমতা:
একসঙ্গে কত পর্যটক, কত নৌযান ও কত ধরনের কার্যক্রম সুন্দরবনের পরিবেশ সহ্য করতে পারে—তা বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করা।

৮. আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা:
পর্যটন থেকে স্থানীয় অর্থনীতিতে কত অর্থ প্রবেশ করছে এবং সংরক্ষণে কত অর্থ ব্যয় হচ্ছে—তার স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ করা।

দরকার ‘সুন্দরবন ট্যুরিজম স্কিল ম্যাপ’

  • কোন এলাকায় কতজন প্রশিক্ষিত গাইড প্রয়োজন?
  • কোথায় হোমস্টে করা সম্ভব?
  • কোন এলাকায় নারী উদ্যোক্তা তৈরি করা যায়?
  • কতজন মাঝিকে পর্যটন নিরাপত্তার প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন?
  • কোথায় স্থানীয় খাবারের বাজার তৈরি করা যায়?
  • কোথায় হস্তশিল্পের ক্লাস্টার গড়ে উঠতে পারে?
  • কতজন তরুণ ট্যুর অপারেটর হিসেবে কাজ করতে পারেন?

এসব প্রশ্নের উত্তর তথ্যভিত্তিকভাবে বের করতে হবে। এ জন্য তৈরি করা যেতে পারে ‘সুন্দরবন ট্যুরিজম স্কিল ম্যাপ’।

বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরার স্থানীয় তরুণদের অগ্রাধিকার দিয়ে তৈরি করা যেতে পারে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি।

সুন্দরবনের পাড়ের মানুষকে পর্যটনের শ্রমিক নয়—অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে।

সাতক্ষীরা থেকে মোরেলগঞ্জ—তরুণদের সামনে নতুন সম্ভাবনা

সুন্দরবনঘেঁষা সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের বহু তরুণ কর্মসংস্থানের সন্ধানে শহরমুখী হন। অথচ তাদের পায়ের নিচেই রয়েছে একটি সম্ভাবনাময় পর্যটন অর্থনীতি।

সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের মতো শিক্ষাক্রমগুলোকে সুন্দরবনকেন্দ্রিক দক্ষতা উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে স্থানীয় তরুণদের সামনে নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।

  • প্রশিক্ষিত গাইড।
  • ট্যুর অপারেটর।
  • হোমস্টে উদ্যোক্তা।
  • হসপিটালিটি কর্মী।
  • নৌযান নিরাপত্তাকর্মী।
  • পর্যটন বিপণনকর্মী।
  • স্থানীয় পণ্য উদ্যোক্তা।

এসবই হতে পারে সুন্দরবনকেন্দ্রিক নতুন প্রজন্মের পেশা।

অনুসন্ধানী বক্স–৪
‘কোথায় গলদ?’

গলদ এক—পর্যটককেন্দ্রিক পরিকল্পনা:
পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও স্থানীয় মানুষের আয় ও মালিকানা বৃদ্ধির সূচক যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।

গলদ দুই—দক্ষতার ঘাটতি:
স্থানীয় মানুষের প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক জ্ঞান আছে, কিন্তু পর্যটন ব্যবস্থাপনার পেশাগত প্রশিক্ষণ সীমিত।

গলদ তিন—হোমস্টে কাঠামোর দুর্বলতা:
স্থানীয় পরিবারগুলো পর্যটন উদ্যোক্তা হতে পারলেও প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন, মান নিয়ন্ত্রণ ও বাজারসংযোগের ঘাটতি রয়েছে।

গলদ চার—নারীর সীমিত অংশগ্রহণ:
নারীদের জন্য পর্যটনভিত্তিক উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ থাকলেও সংগঠিত সহায়তা ও বাজারব্যবস্থা প্রয়োজন।

গলদ পাঁচ—স্থানীয় পণ্যের বাজার দুর্বল:
মধু, মোম, হস্তশিল্প, স্থানীয় খাবারসহ সম্ভাবনাময় পণ্য পর্যটন বাজারের সঙ্গে যথেষ্টভাবে যুক্ত নয়।

গলদ ছয়—আয়ের স্বচ্ছ হিসাবের ঘাটতি:
পর্যটকের ব্যয়ের কত অংশ স্থানীয় অর্থনীতিতে থাকছে, তার দৃশ্যমান সমন্বিত হিসাব নেই।

গলদ সাত—পরিবেশের ঝুঁকি:
পর্যটন সম্প্রসারণের সঙ্গে বর্জ্য, শব্দ, নৌযান ও পর্যটকের আচরণ নিয়ন্ত্রণ না করলে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সুন্দরবনের লাভ সুন্দরবনের মানুষের ঘরে পৌঁছাবে কবে?

সুন্দরবনের বুক চিরে পর্যটকের নৌকা চলছে। ক্যামেরায় বন্দি হচ্ছে হরিণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে কেওড়া, গোলপাতা, নদী আর সবুজ বনভূমির ছবি।পর্যটনের বাজার বড় হচ্ছে।

কিন্তু সুন্দরবনের পাড়ের সেই পরিবারটি?

যে পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই বন ও নদীর সঙ্গে বসবাস করছে—তার ঘরে কতটা পৌঁছাচ্ছে এই অর্থ? সেই তরুণটি কি সুন্দরবন ছেড়ে শহরে না গিয়ে নিজের এলাকায় সম্মানজনক পেশা খুঁজে পাচ্ছেন? সেই নারীটি কি নিজের রান্না, হস্তশিল্প কিংবা আতিথেয়তাকে ব্যবসায় পরিণত করতে পারছেন?

সেই মাঝিটি কি শুধু নৌকা চালাচ্ছেন, নাকি প্রশিক্ষিত পর্যটনকর্মী হিসেবে নিজের মূল্য বাড়াতে পারছেন?

এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

কারণ সুন্দরবনের পর্যটন যদি স্থানীয় মানুষকে বাদ দিয়ে বড় হয়, তাহলে সেটি পর্যটন ব্যবসা হতে পারে—কিন্তু টেকসই কমিউনিটি ইকোট্যুরিজম হবে না।

পর্যটনের সাফল্য মাপতে হবে নতুন মানদণ্ডে

সুন্দরবনের পর্যটন উন্নয়নের সাফল্য শুধু পর্যটকের সংখ্যা দিয়ে মাপা যাবে না।

সাফল্যের সূচক হতে হবে—

  • কতজন স্থানীয় তরুণ পর্যটন থেকে আয় করছেন?
  • কতজন নারী উদ্যোক্তা হয়েছেন?
  • কতটি পরিবার হোমস্টে পরিচালনা করছে?
  • কতজন মাঝি প্রশিক্ষিত পর্যটনকর্মী হয়েছেন?
  • কতজন স্থানীয় গাইড স্বীকৃতি পেয়েছেন?
  • কতজন স্থানীয় ট্যুর অপারেটর তৈরি হয়েছে?
  • পর্যটকের ব্যয়ের কতটা স্থানীয় অর্থনীতিতে থাকছে?
  • আর কতটা অর্থ সুন্দরবন সংরক্ষণে ফিরে যাচ্ছে?

এই হিসাব সামনে এলেই বোঝা যাবে—সুন্দরবনের পর্যটন সত্যিকার অর্থে এগোচ্ছে কি না।

শেষ কথা—সুন্দরবনকে বিক্রি নয়, বুঝতে হবে

সুন্দরবন কোনো সাধারণ পর্যটন স্পট নয়। এটি একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। এখানে প্রতিটি গাছের ভূমিকা আছে। প্রতিটি নদীর ভূমিকা আছে। প্রতিটি প্রাণীর ভূমিকা আছে। আর প্রতিটি স্থানীয় মানুষের জীবন কোনো না কোনোভাবে এই পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত।

তাই সুন্দরবনের পর্যটন এমন হতে হবে, যেখানে পর্যটক আনন্দ পাবেন, স্থানীয় মানুষ আয় করবেন এবং বন তার স্বাভাবিক অস্তিত্ব ধরে রাখবে।

  • এই তিনটির কোনো একটি বাদ পড়লে পর্যটন টেকসই হবে না।
  • সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় পর্যটন অবকাঠামো কোনো জেটি নয়।
  • কোনো ভবন নয়।
  • কোনো বিলাসবহুল নৌযানও নয়।
  • সবচেয়ে বড় অবকাঠামো একজন দক্ষ মানুষ।
  • যিনি সুন্দরবনকে শুধু দেখাতে জানেন না—বুঝিয়ে বলতে জানেন।
  • যিনি পর্যটককে শুধু বিনোদন দেন না—প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল হতে শেখান।
  • যিনি নিজের এলাকার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেন।
  • আর যিনি জানেন—সুন্দরবনকে বাঁচিয়ে রেখেই পর্যটন করতে হবে।

কারণ সুন্দরবন বাঁচলে পর্যটন বাঁচবে। পর্যটন টেকসই হলে স্থানীয় মানুষ বাঁচবেন। আর স্থানীয় মানুষকে বাদ দিয়ে সুন্দরবনের কোনো উন্নয়নই শেষ পর্যন্ত টেকসই হবে না।

  • সর্বশেষ