জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট প্রতিনিধি : সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাটে মাদকাসক্তদের সুচিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক মাদক নিরাময় কেন্দ্র ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রোববার (১৬ আগষ্ট) দুপুরে লালমনিরহাটে মজিদা খাতুন মহিলা মহাবিদ্যালয়ের ৬তলা বিশিষ্ট একাডেমিক ভবনের উদ্বোধনকালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন।
জেলা শহরের ঐতিহ্যবাহী মজিদা খাতুন সরকারি মহিলা কলেজের নবনির্মিত ছয়তলা একাডেমিক ভবনের শুভউদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত এক সুধী সমাবেশ, মতবিনিময় সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
মাদক নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দিয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ার কারণে লালমনিরহাটে মাদকের প্রবেশ ও এর ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। তাই শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের ওপর নির্ভর না করে, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং সামাজিক সচেতনতা কার্যক্রমকে একসঙ্গে জোরালোভাবে এগিয়ে নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, মাদকাসক্ত তরুণদের চিকিৎসার পাশাপাশি তাদের পরিবারগুলোকেও প্রয়োজনীয় মানসিক ও সামাজিক সহায়তার আওতায় আনা জরুরি। বিষয়টি সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে উপস্থাপনের পর লালমনিরহাটে একটি পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক মাদক নিরাময় কেন্দ্র ও হাসপাতাল নির্মাণের এই বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এর জন্য সরকার ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে এবং খুব শিঘ্রই এর বাস্তবায়ন কাজ শুরু হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ত্রানমন্ত্রী মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং জনপ্রতিনিধিদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
আলোকিত লালমনিরহাট উদ্যোগের প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী আরও বলেন, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য কেবল চারপাশ আলোকিত করা নয়, বরং মানুষের বিবেক, মূল্যবোধ ও মানবিক চেতনাকে জাগ্রত করা। মাদক, বাল্যবিবাহ, যৌতুক, জুয়া, ঘুষ ও দুর্নীতির মতো সামাজিক ব্যাধিগুলো দূর করতে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর কাজ চলছে। পরিবারে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং সমাজে সকল ধরনের অপরাধ ও অসঙ্গতির বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলাই এর মূল উদ্দেশ্য।
বাল্যবিবাহের নেতিবাচক দিক তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বাড়লে তারা উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সফলতার সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে। তাই মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি বাল্যবিবাহ রোধে পরিবার, শিক্ষক ও সমাজকে সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর আলোকপাত করে তিনি বলেন, শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থীদের যথাযথ সম্মান ও আদব বজায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ ও সহনশীলতার সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করা আবশ্যক। শিক্ষাঙ্গনে কোনো ধরনের হয়রানি বা নির্যাতন শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশকে নষ্ট করে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
মজিদা খাতুন সরকারি মহিলা কলেজের প্রশংসা
মজিদা খাতুন সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষা ও ফলাফলের উচ্চ প্রশংসা করে মন্ত্রী বলেন, লালমনিরহাটের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কলেজটি বর্তমানে অন্যতম সেরা অবস্থানে রয়েছে। সঠিক নিয়মনীতি, গতিশীল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং দক্ষ শিক্ষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত ভালো ফলাফল করে আসছে। ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে কলেজটি এই অঞ্চলের নারী শিক্ষায় অনন্য অবদান রেখে চলেছে। জেলার অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্তাব্যক্তিরা এ কলেজ পরিদর্শন করে এর শিক্ষা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার ভালো দিকগুলো অনুসরণ করলে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের মান আরও বাড়াতে পারবেন।
কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক দিলীপ কুমার রায়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক মুহঃ রাশেদুল হক প্রধান, জেলা পরিষদ প্রশাসক এ কে এম মমিনুল হক এবং পুলিশ সুপার মোঃ আসাদুজ্জামান।
এছাড়া অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন ও উপস্থিত ছিলেন কলেজের উপাধ্যক্ষ ও আহ্বায়ক মোঃ শরিফুল ইসলাম, প্রকৌশলী মোঃ গোলাম মোস্তফা এবং শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম সাদেকীসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
আলোচনা সভা শেষে কলেজের শিক্ষার্থীরা এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নেন। মন্ত্রী ও আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিবেশনা উপভোগ করেন।