রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার ও এক রাকসু নেতাকে মারধরের ঘটনায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক এক কর্মীসহ তিন শিক্ষার্থীকে দফায় দফায় পিটিয়েছে রাকসু ও শাখা ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তর ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে সামনে এ ঘটনা ঘটে। সূত্র: প্রথম আলো
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত রোববার সংস্কৃত বিভাগের এক নারী শিক্ষার্থী তার নিজ বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থী মহসিন আলমের বিরুদ্ধে প্রেমের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ায় হুমকির অভিযোগ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গতকাল রাতে একটি সভায় বসেন প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান।
এ সময় তার সঙ্গে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০১৭-১৮ বর্ষের আনাস, একই বিভাগের শিক্ষার্থী হাসিব, সংস্কৃত বিভাগের মাহমুদুল হাসানসহ কয়েকজন সেখানে যায়। পরে তারা অভিযোগটি অস্বীকার করে প্রক্টরের সঙ্গে উচ্চবাচ্য করেন।
এ বিষয়ে সোমবার দুপুরে আবারও একটি সভা ডাকেন প্রক্টর। ওই সভায় উপস্থিত হয়ে আনাসকে ছাত্রলীগ কর্মী বলে অভিযোগ করেন রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার ও এসজিএস সালমান সাব্বিরসহ রাকসুর নেতারা। পরে রাকসু নেতারা আনাসের মোবাইল ফোন চেক করে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহ হিল গালিবসহ কয়েকজন নেতার সঙ্গে আনাসের ছবি খুজেঁ পান। পরে তাকে প্রক্টর দপ্তরে আম্মার ও সালমান সাব্বির মারধর করেন। পরে দুপুরেই প্রক্টর বিষয়টির সাময়িক সমাধান করে দেন এবং আনাসসহ বাকিরা প্রক্টর দপ্তর থেকে চলে আসেন।
এ ঘটনার জেরে বিকাল তিনটার দিকে আনাস, হাসিব, মাহমুদুলসহ কয়েকজন রাকসু ভবনে ঢুকে আম্মারসহ কয়েকজনের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এতে রাকসুর তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক নাজমুস সাকিব আহত হন। পরে রাকসু নেতারা তাদের ওপর পালটা চড়াও হলে সেখান থেকে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষের সামনে দুই পক্ষ অবস্থান নেয়।
এক পর্যায়ে সেখানে উপস্থিত হন রাকসু জিএস আম্মার, এজিএস সালমান সাব্বির, বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান লস্কর, আহত বিএম নাজমুস সাকিব, সহ-তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সিফাত আবু সালেহ, শাখা শিবিরের সেক্রেটারি মেহেদী হাসান, প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক মেহেদী সজীব, দপ্তর সম্পাদক মানাজির আহাসান, অর্থ সম্পাদক শামীম পাটোয়ারী, সিনেট সদস্য ফজলে রাব্বি মোহাম্মদ ফাহিম রেজা, শহীদ জিয়াউর রহমান হল সংসদের জিএস আরিফুল ইসলাম, শহীদ হবিবুর রহমান হল সংসদের ভিপি আহসানুল্লাহ ফারহান, জিএস আশিক শিকদার, নবাব আব্দুল লতীফ হল জিএস নুরুল ইসলাম শহীদ, শাহ মখদুম হল শাখা শিবিরের সভাপতি তাসনিম রাফি এবং সাবেক শিবির নেতা রমজান আলীসহ অন্যান্যরা।
এক পর্যায়ে সালাহউদ্দিন আম্মার ইট-পাটকেল নিক্ষেপ শুরু করেন। এ সময় প্রক্টর মাহবুবর রহমান তাদেরকে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে পাঠকক্ষের ভেতরে নিয়ে যান। পরে শিবির ও রাকসু নেতারা অতর্কিতভাবে পাঠকক্ষের ফটক থেকে প্রক্টরকে ধাক্কা দিয়ে পাঠকক্ষে প্রবেশ করেন। ভেতরে ঢুকেই তারা ওই শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে তুমুল মারধর শুরু করেন। এ সময় তারা হাতের কাছে পাওয়া কাঠ, বাঁশ, রড, বেল্টসহ লাঠিসোটা দিয়ে তাদেরকে পেটান রাকসু ও শিবির নেতারা। পরে তাদের হামলা ঠেকাতে পাঠাগারের অন্যান্য শিক্ষার্থী এগিয়ে আসলে তাদেরও মারধর করেন উত্তেজিত শিবির ও রাকসু নেতারা।
পরে ওই শিক্ষার্থীদের আহত অবস্থায় রেখে শিবির ও রাকসু নেতাদের পাঠ কক্ষ থেকে বের করে দেন প্রক্টরিয়াল বডি, পুলিশ সদস্য ও পাঠাগারের শিক্ষার্থীরা। এর কিছু সময় পরে গুরুতর আহত মাহমুদুল হাসানকে মূল ফটক দিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিনসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক।
হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে পাঠকক্ষে অধ্যয়নরত পদার্থ বিজ্ঞানের ১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হেলাল উদ্দীন বলেন, আমরা এখানে পড়ছিলাম। তারপর তারা অতর্কিত সবাই রিডিং রুমে ঢুকে পড়েন। তারা যাকে পাচ্ছে তাকেই ছাত্রলীগ ট্যাগ দিচ্ছে। অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের দিকেও তারা উগ্র হয় এবং হামলা করে। মতের পার্থক্য থাকলেই তাকে ছাত্রলীগ ট্যাগ দিয়ে মেরে ফেলতে চাচ্ছে। ছাত্রলীগ হলেও তাকে মেরে ফেলার অধিকার তো কারও নাই। বিচারের জন্য দেশে আইন আছে।
হামলার শিকার সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী আনাস বলেন, আজকে আমাদের প্রক্টর অফিসে ডাকা হয়। সেখানে তারা আমাকে ছাত্রলীগ ট্যাগ দেয়। সালাউদ্দিন আম্মার লোকজন নিয়ে এসে আমাকে মারা শুরু করে। তারপর আমাদের প্রক্টর অফিস থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তারপর আমরা সেখান থেকে লাইব্রেরিতে চলে আসি। এরপর অন্য কেউ হয়তো রাকসুর সামনে তাদের সঙ্গে হাতাহাতি করে। তারপর আম্মার লোকজন নিয়ে এসে লাইব্রেরির ভেতরে ঢুকে আমাকে মারধর করে। আমার ওপর কমপক্ষে ২০০টিরও বেশি আঘাত করা হয়েছে।
হামলার বিষয়ে শিবিরের দায় অস্বীকার করে শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান বলেন, এখানে শিবিরের কেউ ছিল না। আমরা আমাদের ভাই রাকসু নেতাদের হামলার কথা শুনে দ্রুত এখানে আসি। এখানে এসে এই পরিস্থিতি দেখতে পাই।
রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, আমাদের রাকসু ভবনে গিয়ে মারধর করেছে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। প্রশাসনকে আমরা ছাত্রলীগের ওই নেতাকে পুলিশে দেওয়ার আহ্বান জানাই। তবে তারা তাকে কিছুই করেনি। আমাদের ওপর হামলার পরে বাধ্য হয়ে আমাদের এখানে আসতে হলো।
এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, যে নারীকে নিয়ে ঝামেলার শুরু, আমরা জেনেছি তাকে শিবিরের এক নেতা পছন্দ করতেন। এ কারণে একটি নারীঘটিত বিষয়কে গোপনে সমাধান না করে শিবিরের সন্ত্রাসী বাহিনী রাজনৈতিক রূপ দিয়েছে। আমরা আমাদের পবিত্র জায়গা লাইব্রেরিতে শিবিরের এ হামলার তীব্র নিন্দা জানাই। যারা সাধারণ শিক্ষার্থীদেরকে ছাত্রলীগ ট্যাগ দিয়ে নির্মম হামলা চালিয়েছে তাদের ছাত্র সংসদের পদ ও ছাত্রত্ব উভয়ই বাতিল করেত হবে।
উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আব্দুল আলীম বলেন, দিনব্যাপী যে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটি অত্যন্ত নিন্দনীয়। আমরা এখন পুলিশ, প্রক্টরিয়াল বডির সঙ্গে একটি সভায় বসেছি। দ্রুত এ ঘটনা তদন্ত করতে একটি কমিটি গঠন করা হবে। সংশ্লিষ্ট সবার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী বিচার করা হবে।