এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সুন্দরবন : বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে অন্যতম রক্ষাকবচ এবং ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। কিন্তু এই অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ এখন বহুমুখী হুমকির মুখে। বন বিভাগের ধারাবাহিক অভিযান, মামলা ও গ্রেফতার বাড়লেও থামছে না চোরা শিকারি, বনজ সম্পদ লুটেরা এবং অবৈধ মৎস্য শিকারি চক্রের তৎপরতা। বরং অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বন অপরাধীরা আগের চেয়ে আরও সংগঠিত ও কৌশলী হয়ে উঠছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জে বন অপরাধের ঘটনায় ২৯৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় ৩৯৬ জনকে গ্রেফতার করা হলেও এখনও পলাতক রয়েছেন ৬৩ জন। একই সময়ে উদ্ধার করা হয়েছে ৪৮৭ কেজি হরিণের মাংস, ৫ হাজার ৭১২ মিটার হরিণ ধরার ফাঁদ, ৬ হাজার ৯৮৬টি অবৈধ কাঁকড়া ধরার ফাঁদ এবং বিপুল পরিমাণ মাছ ও কাঁকড়া আহরণের সরঞ্জাম।
অভিযান বাড়ছে, অপরাধও থামছে না সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বন অপরাধ এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি অনেক ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। হরিণ শিকার, বিষ প্রয়োগে মাছ ধরা, অভয়ারণ্যে প্রবেশ করে কাঁকড়া আহরণ এবং বনজ সম্পদ পাচারের সঙ্গে জড়িত রয়েছে একটি সক্রিয় নেটওয়ার্ক।
খুলনা রেঞ্জে গত এক বছরে অভয়ারণ্যে মাছ ও কাঁকড়া আহরণের অভিযোগে ১০৬টি এবং বিষ প্রয়োগে মাছ শিকারের ঘটনায় ৩৩টি মামলা হয়েছে। এছাড়া হরিণ শিকার ও বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৩৩টি।
বন বিভাগের একাধিক মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা জানান, অনেক সময় অভিযানের খবর আগেই ফাঁস হয়ে যায়। ফলে বন অপরাধীরা নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে সক্ষম হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে অপরাধীদের ধরতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সুন্দরবনে হরিণ শিকারে এখন আধুনিক ফাঁদ ও সংগঠিত দল ব্যবহৃত হচ্ছে। শিকারিরা গভীর বনের নির্জন এলাকায় দীর্ঘ ফাঁদ পেতে রাখে। অনেক ক্ষেত্রে রাতে প্রবেশ করে হরিণ জবাই করে মাংস দ্রুত নদীপথে পাচার করা হয়।
গত এক বছরে উদ্ধার হওয়া ৪৮৭ কেজি হরিণের মাংস এবং ৫ হাজার ৭১২ মিটার ফাঁদ পরিস্থিতির ভয়াবহতাই তুলে ধরে। বন বিভাগ ইতোমধ্যে হরিণ শিকার ও বন্যপ্রাণী নিধনের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ১৩৫ জনের একটি বিশেষ তালিকা তৈরি করেছে। তাদের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
বিষ দিয়ে মাছ শিকার নীরব পরিবেশ বিপর্যয়। হরিণ শিকারের পাশাপাশি সুন্দরবনের নদী ও খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার প্রবণতাও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এই পদ্ধতিতে শুধু মাছ নয়, নদীর সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ৮৭ বোতল নিষিদ্ধ কীটনাশক জব্দ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার সাময়িকভাবে বেশি মাছ ধরার সুযোগ তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি পুরো জলজ পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি।
বিশাল বন, সীমিত জনবল প্রায় ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত সুন্দরবন পাহারা দিতে বন বিভাগকে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি, জনবল ও সরঞ্জামের তুলনায় দায়িত্বের পরিধি অনেক বেশি।
খুলনা রেঞ্জের বিভিন্ন স্টেশন ও টহল ফাঁড়িতে কর্মরত কর্মকর্তারা জানান, অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত জনবল ছাড়াই দুর্গম এলাকায় অভিযান পরিচালনা করতে হয়। আধুনিক জলযান, যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার ঘাটতিও রয়েছে।
বননির্ভর মানুষের জীবন-সংকট বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের অপরাধের অন্যতম মূল কারণ বননির্ভর জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সংকট। উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার পরিবার মাছ, কাঁকড়া, মধু ও গোলপাতা আহরণের ওপর নির্ভরশীল। বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে বনাঞ্চলে প্রবেশ করেন।
বাগেরহাট রিপোর্টার্স ইউনিটি সভাপতি এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির বলেন, “আইন প্রয়োগ প্রয়োজন, তবে শুধু অভিযান দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। বননির্ভর মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে বন অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।”
সুন্দরবন খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক ও রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, “স্মার্ট টহল টিম, বিশেষ টহল টিম এবং ফুট পেট্রোলিংয়ের মাধ্যমে বন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ করা হচ্ছে। ড্রোন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো হয়েছে। তবে অপরাধ দমনে সামাজিক অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
তিনি বলেন, “অভিযানের সময় কিছু ক্ষেত্রে জেলেদের আগ্রাসী আচরণ দেখা যায়, যা আইন প্রয়োগে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। তবুও বনরক্ষীরা নিয়মিত অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন।”
পশ্চিম সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, “বনরক্ষীরা চরম ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি, ড্রোন ব্যবহার এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের কারণে বন অপরাধ আগের তুলনায় কমেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।”সমাধান কোথায়?
পরিবেশবিদ ও বন বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবন রক্ষায় কেবল অভিযাননির্ভর কৌশল যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বহুমাত্রিক উদ্যোগ। এর মধ্যে রয়েছে—
বননির্ভর মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
আধুনিক জলযান ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বৃদ্ধি।
স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা।
বন অপরাধীদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
সীমান্ত ও নদীপথে নজরদারি জোরদার করা।
বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়; এটি দেশের পরিবেশ, অর্থনীতি এবং উপকূলীয় জনপদের অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু বন অপরাধের বিরুদ্ধে চলমান লড়াইয়ে একটি প্রশ্ন এখনও রয়ে গেছে—অভিযান ও গ্রেফতারের পরও যদি শিকারি ও পাচারকারীরা সক্রিয় থাকে, তবে সুন্দরবনের প্রকৃত নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?