শাহাজাদা এমরান, কুমিল্লা : কুমিল্লার পাঁচ উপজেলার ৪৭টি সীমান্ত পয়েন্ট যেন এখন মাদক পাচারের করিডরে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব পয়েন্ট ব্যবহার করে ভারত থেকে ইয়াবা, গাঁজা, ট্যাপেনডল, ফেনাড্রিল সিরাপ, স্কার্ফ সিরাপ, মদ ও বিয়ারসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য নিয়মিত দেশে প্রবেশ করছে। সীমান্তের একটি সংঘবদ্ধ চক্র নিখুঁত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এসব মাদকের চালান রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দিচ্ছে।
সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, জাতীয় সংসদে মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রণয়ন হলেও সীমান্তে মাদকের প্রবাহ কমেনি। তাদের দাবি, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিতে হবে। বিশেষ করে সীমান্তে টহল ও নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি পাচারের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুমিল্লা সীমান্তের অদূরে ভারতের বিভিন্ন এলাকায় বাংলাদেশে পাচারের উদ্দেশ্যে মাদক উৎপাদনের একাধিক কারখানা গড়ে উঠেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। সেখান থেকে উৎপাদিত মাদকদ্রব্য সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট ব্যবহার করে বাংলাদেশে আনা হচ্ছে। মাদকের পাশাপাশি যৌন উত্তেজক বিভিন্ন পণ্যও সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সীমান্তে ‘লাইনম্যান’ পরিচয়ে সক্রিয় একটি চক্র মাদক পাচারে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সীমান্তের দুই পাশের কিছু অসাধু ব্যক্তিকে প্রভাবিত করে তারা কাঁটাতারবিহীন বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে মাদকের চালান বাংলাদেশে প্রবেশ করায়। পরে জেলার বিভিন্ন সিন্ডিকেট চাহিদা অনুযায়ী এসব মাদক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করে।
মাদক পাচারের অভিযোগ থাকা সীমান্ত পয়েন্টগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সালদানদী, শশীদল, আশাবাড়ি, নয়নপুর, তেতাভূমি, বাগরা, মধুপুর, আন্দিকোট, বিষ্ণুপুর, শারেংগাঁও ও গঙ্গানগর; বুড়িচং উপজেলার চড়নল, বাকশিমুল, মিরপুর, বারেশ্বর, শঙ্কুচাইল, রাজাপুর, হায়দ্রাবাদনগর, শিবেরবাজার ও জামতলা; আদর্শ সদর উপজেলার বিবিরবাজার, বৌয়ারা, গোলাবাড়ি, সাহাপুর, শিবেরবাজার ও নিশ্চিন্তপুর; সদর দক্ষিণ উপজেলার একবালিয়া, তালপট্টি, সুবর্ণপুর, চৌয়ারা, যশপুর, শ্রীপুর, কনেশতলা, দড়িবটগ্রাম ও রাজেশপুর এবং চৌদ্দগ্রাম উপজেলার গোমারবাড়ি, আমানগন্ডা, ছুপুয়া, জগন্নাথদীঘি, গোলপাশা, বসন্তপুর, সাতবাড়িয়া, পানপট্টি, তারাপুর, কাইচ্ছুটি, কোমারডোগা ও পদুয়া।
বুড়িচং উপজেলার শঙ্কুচাইল সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা ইদ্রিস মিয়া বলেন, ‘সীমান্ত দিয়ে নিয়মিত মাদক পারাপার হচ্ছে। সরকার আন্তরিক হলেও সীমান্তে কঠোর নজরদারি না থাকলে মাদকের প্রবাহ বন্ধ করা কঠিন হবে।’
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার তেতাভূমি সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা ফারুক হোসেন বলেন, ‘কুমিল্লা সীমান্তজুড়ে মাদক কারবারিদের একটি বড় নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। নতুন আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।’
কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শামসুল আলম শাহ বলেন, ‘মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারের যেকোনো নির্দেশনা বাস্তবায়নে আমরা প্রস্তুত। জেলা গোয়েন্দা পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে।’
এ বিষয়ে কুমিল্লা-১০ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মীর আলী এজাজ বলেন, ‘মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধে সীমান্তে টহল ও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি বড় মাদকের চালান বিজিবির হাতে জব্দ হয়েছে। মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িতদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’
স্থানীয়দের দাবি, সীমান্তে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বৃদ্ধি, কাঁটাতারবিহীন এলাকায় অতিরিক্ত টহল
এবং মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে দেশের ভবিষ্যৎ
প্রজন্মকে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।