রাজশাহী জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। শ্রমিকেরা সাধারণ সভা করে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠনের দাবি তুলেছিলেন। তবে রাজশাহীর জেলা প্রশাসক (ডিসি) কাজী শহিদুল ইসলাম তা নাকচ করে নিজেই নির্বাচনি কমিটি করার প্রস্তাব রেখেছিলেন। সেই প্রস্তাব না মেনে শ্রমিকেরা বাস চলাচল বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।
এর ফলে আজ সোমবার রাত ৮টা থেকে রাজশাহী থেকে আন্তঃজেলা বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। রাতের মধ্যে শুধু দূরপাল্লার বাসগুলো ছেড়ে যাবে। মঙ্গলবার সকাল থেকে সব রুটেরই বাস চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে শ্রমিকদের আরেকটি পক্ষ বাস চলাচল চালু রাখার কথা বলছেন।
রাজশাহী জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের অধিকাংশ সদস্যই বেশ কয়েকমাস ধরে সংগঠনের নির্বাচন দাবি করে আসছেন। এ নিয়ে শ্রমিকেরা দুইভাগে বিভক্ত। যারা নির্বাচন দাবি করছেন তাদের ওপর গত ২৩ এপ্রিল হামলার ঘটনা ঘটে। জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও মহানগর শ্রমিক দলের আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম পাখিসহ তার অনুসারীরা সেদিন টার্মিনাল এলাকায় ব্যাপক বোমাবাজি করেন।
পরে এই রফিকুল ইসলাম পাখিকেই সভাপতি করে ইউনিয়নের নতুন কমিটি ঘোষণা করে সড়ক পরিবহন ফেডারেশন। এই কমিটি প্রত্যাখান করে শ্রমিকেরা গত মে মাসে কয়েকদফা ধর্মঘট করেন। পরে জেলা প্রশাসক গিয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ঈদের পর নির্বাচন হবে।
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচন আয়োজন করতে সোমবার বিকেলে নিজের কার্যালয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে বসেন জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম। ওই সভায় রাজশাহী সড়ক পরিবহন গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম হেলালও ছিলেন। শ্রমিক নেতা রফিকুল ইসলাম পাখি তার অনুসারী। তাদের বিরোধী শ্রমিক নেতারা জেলা প্রশাসককে পরামর্শ দেন, সংগঠনের সাধারণ সভা করে যেন নির্বাচনি বোর্ড গঠন করা হয়।
কিন্তু জেলা প্রশাসক জানান, এখন সাধারণ সভা করা সম্ভব নয়। কয়েকজনের কথা শোনার পর তিনি বলেন, নজরুল ইসলাম হেলালসহ পুলিশ-প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দিয়ে তিনি একটি নির্বাচনি কমিটি গঠন করে দিচ্ছেন। তারা নির্বাচন সম্পন্ন করবেন। তখন হেলাল-পাখিবিরোধী শ্রমিক নেতারা এই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। একপর্যায়ে দুইপক্ষের শ্রমিক নেতাদের কথা কাটাকাটি হয়। তখন হেলাল-পাখিবিরোধী শ্রমিকেরা ডিসির সামনেই বাস বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলে চলে আসেন। এরপর রাত থেকে বাস বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এদিকে ডিসির কার্যালয় থেকে দুইপক্ষের শ্রমিক নেতারা শিরোইল বাস টার্মিনাল এলাকায় এলে উত্তেজনা দেখা দেয়। একপর্যায়ে কিছু শ্রমিক নজরুল ইসলাম হেলালের ব্যক্তিগত চেম্বার ভাঙচুর করেন। চেম্বারে লুটপাট চালানো হয়েছে বলেও অভিযোগ নজরুল ইসলাম হেলালের।
পরে রাত থেকেই আন্তঃজেলা বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। রাতে শুধু দূরপাল্লার দেশ ট্রাভেলস, ন্যাশনাল ট্রাভেলস ও গ্রামীণ ট্রাভেলস যাত্রী নিয়ে চলে যাবে।
মঙ্গলবার সকাল থেকে এগুলো চলবে না। হানিফ ও একতা ট্রান্সপোর্ট রাতে রাজশাহী থেকে বের হয়ে যাবে। সকাল থেকে আসবে না।
জানতে চাইলে শ্রমিক নেতা মোমিনুল ইসলাম মোমিন বলেন, ডিসি স্যার একটা পক্ষ নিয়েছেন। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আমরা সাধারণ সভা করে নির্বাচনি কমিটি করার কথা বলেছিলাম। কিন্তু তিনি দুই একজনের কথা শুনেই নজরুল ইসলাম হেলালকে রেখে কমিটি করে দিতে চাইলেন। তিনি থাকলে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। তাই শ্রমিকেরা বাস বন্ধ করে দিয়েছেন।
মোমিনুল ইসলাম অভিযোগ করেন, জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম হেলাল ও রফিকুল ইসলাম পাখির পক্ষেরই ২৪ জনকে এই সভায় ডেকেছিলেন। এ থেকে বোঝা যায় তিনি তাদের পক্ষে কাজ করছেন। তাঁর দাবি, নজরুল ইসলাম হেলাল মালিক। তিনি শ্রমিকদের নির্বাচনের কমিটিতে থাকতে পারেন না।
জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের একটা অংশ সাধারণ সভা করে নির্বাচনি কমিটি গঠন করতে চান। কিন্তু এখন তো সেটা সম্ভব না। এ জন্য তারা বাস চলাচল বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। বিষয়টি কীভাবে সমাধান করা যায় সেটা আমরা দেখছি।
রাজশাহী সড়ক পরিবহন গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম হেলাল বলেন, মিটিং হলে সেখানে কথা কাটাকাটি হতেই পারে। এর জেরে বাস বন্ধ রাখা কিংবা চেম্বারে হামলা করা ঠিক না। কিন্তু এটিই করা হয়েছে। তারা আমার চেম্বারে হামলা-লুটপাট করে বাস চলাচল বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। তবে আমরা মালিকপক্ষ। আমরা বলছি, বাস চলাচল করবে।