শিরোনাম
◈ ফের হরমুজ প্রণালী বন্ধ করল ইরান, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ ◈ ২৪ জেলার চিত্র বদলে দেবে পদ্মা ব্যারাজ ◈ স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম যেসব ঘটনায় আলোচনায় ◈ মেসি, রোনালদো, এমবাপ্পের মতো খেলোয়াড় তৈরি হবে বাংলাদেশেই : প্রধানমন্ত্রী ◈ কিশোর–কিশোরীদের নিয়মিত খেলাধুলার পাশাপাশি পড়াশোনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী ◈ ‘যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বাজি ধরলে পস্তাতে হবে না’ : মার্কিন রাষ্ট্রদূত ◈ বিশ্বকা‌পে আ‌র্জেন্টিনার ভেন্যুর শহরে বন্যা, সতর্কতা জারি ◈ দেশের স্বার্থেই কূটনৈতিক সফর, কারও মন জোগাতে নয়: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ◈ দুবাইয়ে আটক বেনজীরকে ফেরাতে ইউএইতে পাঠানো হয়েছে প্রত্যর্পণ আবেদন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ◈ ২১ জুন মালয়েশিয়া ও চীন সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান: কূটনীতি ও অর্থনীতিতে নতুন দিগন্তের প্রত্যাশা

প্রকাশিত : ২০ জুন, ২০২৬, ০৯:০৮ রাত
আপডেট : ২০ জুন, ২০২৬, ১১:০৩ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ধ্বংসের ধার প্রান্তে ঐতিহ্যবাহী সোনাদিয়া দ্বীপ 

সরওয়ার আজম মানিক, কক্সবাজার : বন বিভাগ ও বেজার জমির মালিকানা নিয়ে সমস্যা কে কাজে লাগিয়ে অব্যাহত প্যারাবন নিধন, আগুন দিয়ে বন জ্বালিয়ে দেওয়া, একের পর এক চিংড়ি প্রকল্প তৈরি সহনা প্রকার পরিবেশ ধ্বংসের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে কক্সবাজারের মহেশখালীর ভার্জিন দ্বীপ সোনাদিয়া। প্রশাসনের অবহেলাকে পুঁজি করে রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা দিনে দুপুরের বন কেটে গড়ে তুলছে একের পর এক চিংড়ি প্রকল্প।

এতে করে লালকাঁকড়া, কাছিম ও বিরল প্রজাতির পাখির আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত সোনাদিয়া দ্বীপের পরিবেশ পড়েছে চরম সংকটে। প্রশাসনের সমন্বয়হীনতা ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তাইনের কারণে ইতিমধ্যে ২০ হাজার একর প্যারাবন আগুনে পুড়িয়ে ও কেটে ধ্বংস করার অভিযোগ তুলেছেন পরিবেশবাদীরা। বিগত বিএনপি সরকারের সময়ে করা দুটি ব্রিজ অব্যবহারযোগ্য হয়ে পড়েছে, সড়ক দখল করে করা হয়েছে চিংড়ি প্রকল্প।

কক্সবাজার শহর থেকে ৭ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে মহেশখালী উপজেলার কুতুবজুম ইউনিয়নের মাত্র ৯ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত সোনাদিয়া দ্বীপ। কুতুবজুম ইউনিয়নের এ ওয়ার্ডে সাড়ে ৩ হাজার মানুষের বসবাস। এক সময় শুধুমাত্র একটি গ্রাম থাকলেও এখন পূর্বপাড়া ও পশ্চিমপাড়া নামে দুটি গ্রাম। আগে সামান্য একটু বসতি ছিল পুরোটাই ছিল বন। লালকাঁকড়া, কাছিম ও বিরল প্রজাতির পাখির আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত পাওয়ার পর সরকার এটি সংরক্ষণে এই দ্বীপ কে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে। ফলে আইন অনুযায়ী, সোনাদিয়ার মাটি, পানিও প্রাকৃতিক পরিবেশে কোনো ধরনের পরিবর্তন বা বাণিজ্যিক রূপান্তর নিষিদ্ধ। তবে ইকোট্যুরিজম পার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে গত আওয়ামী লীগ সরকার ১ হাজার ১ টাকার বিনিময়ে সোনাদিয়ার ৯ হাজার ৪৬৬দশমিক ৯৩ একর বনভূমি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের(বেজা) কাছে বরাদ্দ দেয়। যেখানে সবুজ প্যারাবনে ভর্তি ছিল দ্বীপের চারপাশ। ২০১৭ সালের মে মাসে বেজা উপকূলীয় বন বিভাগের কাছথেকে জমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে। কিন্তু এরপর সেখানে ইকোট্যুরিজম প্রকল্পের দৃশ্যমান কোনো কাজ হয়নি। বেজা কে জমি দেওয়ার পর সেখান থেকে বন বিভাগের টহল সহ সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়। সেই সাথে ছিল না বেজার কোন নজরদারি। এই সুযোগে রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা সেখানে বন কেটে চিংড়ি প্রকল্প তৈরির কাজ শুরু করে। বর্ষা মৌসুমে চিংড়ি প্রকল্প শুষ্ক মৌসুমে লবণ চাষ শুরু হয় এভাবেই। ধ্বংস হতে থাকে সোনাদিয়ার প্যারাবন সহ প্রাকৃতিক বন।

কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ,না,ম হেলাল উদ্দিন বলেন, সোনাদিয়া দ্বীপ বাংলাদেশের জন্য একটি প্রাকৃতিক সম্পদ, কিন্তু রাজনৈতিক দুর্বৃত্তয়ইনের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা বিগত সরকারের সময় থেকে এখন পর্যন্ত ২০ হাজারএকর প্যারাবনের বাইন, কেওড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির ম্যানগ্রোভ গাছ কেটে ফেলার পাশাপাশি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা সেখানে দিনে দুপুরে এসকেব্যাটার দিয়ে মাটি কেটে চিংড়ি প্রকল্প তৈরি করলেও রহস্যজনক কারণে প্রশাসন নীরব রয়েছে। এভাবেই ধ্বংস হচ্ছে বাংলাদেশের পরিবেশ প্রকৃতি। 

সোনাদিয়া এলাকার বাসিন্দা ফরিদুল আলম বলেন, দিনে দুপুরে এখানে চিংড়ি প্রকল্প তৈরি করছে প্রভাবশালীরা। আমরা সাধারণ জনগণ তাদের কিছু বলতে পারি না। বন ধ্বংসের কারণে কিছু সমস্যা আমরা ইতিমধ্যে বুঝতে পারছি। শীতের মৌসুমে এখন আর আগের মত পাখি আসে না। অনেকগুলো পাখি এখন দেখা যাচ্ছে না। অনেক প্রভাবশালী এখানে কটেজ নির্মাণ করতেছে।

সোনাদিয়ার পাখি ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি গিয়াস উদ্দিন বলেন, সোনাদিয়া দ্বীপে আগের মত লাল কাঁকড়া দেখা যায় না, ডিম পাড়তে আসে না কচ্ছপ। ইতিমধ্যে নানা পরিবেশগত সংকট দেখা দিয়েছে। আমরা চাই আমাদের দ্বীপের পরিবেশ প্রতিবেশ কে সংরক্ষণ করা হোক। 

কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দীপু বলেন, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় প্রভাবশালীরা সোনাদিয়াকে ধ্বংস করছে, বিরল প্রজাতির পাখি আসতো একসময় এখানে, কিন্তু দিনদিন সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এই দ্বীপের। বেজা আর বন বিভাগের সমন্বয় হীনতার সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা সোনাদিয়াকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এটা যেকোনোভাবে বন্ধ করতে হবে।

আমাদের কাছে খবর রয়েছে, প্রভাবশালীরা কুতুবজোম থেকে সোনা দিয়ে যাওয়ার যে রাস্তা তৈরি করেছিল বিগত বিএনপি সরকারের সময়ে সে রাস্তাটি ও চিংড়ি প্রকল্পের মধ্যে ঢুকিয়ে নিয়েছে, ফলে নির্মিত দুটি ব্রিজ অকেজো হয়ে পড়েছে। সরকারকে এ ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ঘড়িভাঙ্গা থেকে সোনা দিয়ে পর্যন্ত বর্তমানে ১২০টির মতো চিংড়ি প্রকল্প গড়ে তোলা হয়েছে। আমরা চাই সরকার সেগুলো দ্রুত ভেঙে দিয়ে জমিগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেবে।

কক্সবাজারের পরিবেশবাদি সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি(ইয়েস) এর চেয়াম্যান অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক জানান, প্যারাবন

শুধু গাছের সমষ্টি নয়; এটি উপকূল রক্ষার প্রাকৃতিক দেয়াল। ঘূর্ণিঝড়,জলোচ্ছ্বাস ও সামুদ্রিক ঢেউয়ের আঘাত থেকে উপকূলীয় জনপদকে

রক্ষা করতে প্যারাবনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বন ধ্বংস হলেউপকূল আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। 

স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মী ও কবি জাহেদ সরওয়ার বলেন, সোনাদিয়া দ্বীপের বন নিধনের খবর প্রকাশ করার পর থেকে হুমকি পাচ্ছি। তবে আমরা তার পর ও নিয়মিত খবর প্রকাশ করে যাচ্ছি।

উপকূলীয় বন বিভাগের কক্সবাজার জেলায় কর্মরত সহকারী বণ সংরক্ষক শেখ আবুল কালাম আজাদ বলেন, সরকার দুই দাফায় ২ টি বন্দোবস্তি মামলার মাধ্যমে বেজা কে সোনাদিয়ার প্রায় ২২ হাজার একর বনভূমি দিয়েছিল। এরমধ্যে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ‌বেজা থেকে সাড়ে নয় হাজার একরের মতো জমি বন বিভাগকে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করে। বর্তমানে সেটি ৬ ধারার পর কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

তারমধ্যে সোনা দিয়া, বিজয়ী ৭১ ও সমুদ্র বিলাস নামের তিনটি মৌজা বন বিভাগকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো পুরোপুরি গ্যাজেট প্রকাশ হয়নি। তারপরেও বন বিভাগ এই তিনটি মৌজার বন সংরক্ষণে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এই মৌসুমে আমরা ৫০ হেক্টর ঝাউ বাগান করব ওইসব এলাকায়। 

এ সহকারী বন সংরক্ষক বলেন, আগুন দিয়ে বন পোড়ানো ও বন উজাড় এর যেসব অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো আমাদের মৌজায় না। সম্প্রতি আমাদের মৌজায় কিছু বন কাটার কারণে ‌ ঘড়িভাঙ্গা বিট কর্মকর্তা বিভাস কুমার মালাকার বাদী হয়ে মহেশখালী থানায় একটি মামলাও করেছে। আমাদেরকে পুরোপুরি বুঝিয়ে দেওয়ার পর আমরা পুরোপুরি অপারেশন শুরু করব সোনাদিয়া দ্বীপে। তবে জেলা প্রশাসন থেকে আমাদেরকে এখনো বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ইমরান হোসাইন সজীব বলেন, বেজা ও বন বিভাগের জমি রয়েছে সোনাদিয়াতে । বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বেজাকে দেওয়া কিছু জমি বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেছে। ৬ ধারার পর অফিসের কাজগুলো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে আমরা সেখানে বন বিভাগকে বন সংরক্ষণের কথা বলেছি। বন বিভাগকে বলা হয়েছে তাদের জমির বন গুলো রক্ষা করার জন্য। একইভাবে বেজার কাছেও বিষয়টি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।

উপকূলীয় বন বিভাগ চট্টগ্রামের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম এ হাসান বলেন,সোনাদিয়া দ্বীপে প্রাকৃতিকভাবে ম্যানগ্রোভ বন জন্মালেও ১৯৭৩ সাল থেকে বন বিভাগ এখানে বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষরোপণ শুরু করে। ২০১৬ সাল নাগাদ বন বিভাগ প্রায় ৫ হাজার একর ম্যানগ্রোভ বন সৃজন করে। ১৯৮৫-৮৬ সালে সোনাদিয়ার বনভূমি বন আইন, ১৯২৭-এর ধারা ৪-এর আওতায় আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়।

উপকূলীয় বন বিভাগ সূত্র জানায়, কক্সবাজারের তৎকালীন জেলা প্রশাসক ২০১৬ সালে সোনাদিয়া দ্বীপের ৯ হাজার ৪৬৬ দশমিক ৯৩ একর জমি বেজার কাছে হস্তান্তর করেন। পরে ২০১৮ সালে আরও ১২ হাজার ২৭০ দশমিক ০০৮ একর জমি হস্তান্তর করা হয়।

সূত্রমতে, মন্ত্রিসভার এক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসক এসব জমি ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেন। হস্তান্তর করা জমির মধ্যে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকাও (ইসিএ) অন্তর্ভুক্ত ছিল।

শেখ হাসিনা সরকারের সময় পর্যটন ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগের অংশ হিসেবে বেজার কাছে জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। সোনাদিয়া দ্বীপে দেশের বৃহত্তম পরিবেশবান্ধব পর্যটন পার্ক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল প্রতিষ্ঠানটি।

বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক (সিসিএফ) মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, ‘বেজার কাছে জমি হস্তান্তরের ফলে দুর্বৃত্তচক্র এলাকাটি দখল করার সুযোগ পায়। তারা গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বন উজাড় করে সেখানে চিংড়ি চাষ শুরু করে। জমি হস্তান্তরের পর বন বিভাগ সোনাদিয়া কার্যালয় বন্ধ ও টহল কার্যক্রম স্থগিত করতে বাধ্য হয়।’

আমীর চৌধুরী আরও জানান, অন্তর্বর্তী সরকার বন আইন, ১৯২৭-এর ধারা ৪ ও ৬ অনুসারে বেজার কাছ থেকে ৯ হাজার ৪৬৬ দশমিক ৯৩ একর জমি ফেরত নেয়। তবে এই ধারা দুটি ওই জমির ওপর বন বিভাগকে সীমিত ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ দেয়। বেজা অবশিষ্ট জমি ফেরত দিতে এখনো অনিচ্ছুক।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়