শিরোনাম
◈ ইরানের হুমকির পর ঘরবন্দি ট্রাম্পপুত্র ব্যারন, কাটছে অন্তর্মুখী জীবন ◈ কনটেইনার পরিবহন বাড়লেও সেরা ১০০ বন্দরে ৬৮তম চট্টগ্রাম ◈ সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা কী এবং কোন পাঁচ বিষয় চ্যালেঞ্জ হতে পারে? ◈ ঢাকার যানজট কমাতে টোল থেকে বাস টার্মিনাল, প্রধানমন্ত্রীর ৮ নির্দেশনা ◈ মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের করণীয়-বর্জনীয় নিয়ে জরুরি নির্দেশনা ◈ ডিবিকে ফোনকল: আমি ভালো হয়ে যাবো, অস্ত্রসহ আমাকে নিয়ে যান ◈ ভ্রমণ আরও সহজ করতে এআই মোডে গুগলের নতুন ফিচার ◈ হামের উপসর্গে আরও ৩ মৃত্যু, মোট ৯৬৩ ◈ সরকারের ছয় মাসে ১০ অভিযোগ চরমোনাই পীরের ◈ সব কাজ দ্রুত করা সম্ভব না হলেও সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাবে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশিত : ১০ এপ্রিল, ২০২৬, ০৩:১৬ রাত
আপডেট : ২১ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:০০ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

তনু হত্যা মামলায় নতুন মোড়, ১০ বছরের প্রশ্নের জবাব কি আসছে?

সোহাগী জাহান তনু। একটি নাম, একটি দীর্ঘশ্বাস। তনু হত্যার ১০ বছর পর গত ৬ এপ্রিল সোমবার কুমিল্লার একটি আদালত অবসরপ্রাপ্ত তিন সেনা সদস্যের ডিএনএ প্রোফাইল ক্রস-ম্যাচিং করার নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশনাকে দীর্ঘদিন ধরে স্থবির তনু হত্যা মামলায় নতুন এক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।  

তনুর হত্যার পর দীর্ঘ ১০ বছর ধরে ন্যায়বিচারের দাবিতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন মা আনোয়ারা বেগম। মেয়ের একমাত্র স্মৃতি হিসেবে তার এখন সম্বল শুধু দেয়ালে ঝোলানো কয়েকটি ছবি। এই স্মৃতি বুকে আঁকড়ে তিনি এখনো অপেক্ষায় আছেন, কবে তনুর হত্যাকারীরা তাদের অপরাধের প্রাপ্য সাজা পাবে।

দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে আবেগ সংবরণ করতে না পেরে বারবার কথার খেই হারিয়ে ফেলছিলেন আনোয়ারা বেগম। কান্নাভেজা গলায় তিনি বলেন, ‘অনেক কষ্টে আমি আমার মেয়েকে মানুষ করেছি। তার বাবার সামান্য আয়, তাকে বড় করতে আমরা অনেক কষ্ট করেছি। আমি শুধু আমার মেয়েকে হত্যার সঠিক বিচার চাই। যারা এই অপরাধে জড়িত তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।’

আনোয়ারা বেগম বর্তমানে পরিবার নিয়ে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় থাকেন।

গত ৬ এপ্রিল ঢাকার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক তরিকুল ইসলামের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কুমিল্লা সদর আমলি আদালত-১ এর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোমিনুল হক অবসরপ্রাপ্ত তিন সেনা সদস্যদের ডিএনএ প্রোফাইল ক্রস-ম্যাচিং করার নির্দেশ দেন।

এই তিন সেনা সদস্য হলেন সার্জেন্ট জাহিদ, ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান এবং সৈনিক শাহিনুল আলম (যদিও তনুর বাবার দাবী তার নাম জাহিদ)।

দীর্ঘদিন ধরে তনুর বাবা-মা অভিযুক্ত এই সেনা সদস্যদের বিরুদ্ধে বিচারের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।

কুমিল্লা জেলা জজ আদালতের পরিদর্শক মামুনুর রশিদ জানান, মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে ৬ এপ্রিল আদালতে হাজির হয়ে মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানাতে নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত।

১০ বছর আগে ২০১৬ সালের ১৮ মার্চ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষার্থী সাংস্কৃতিক কর্মী সোহাগী জাহান তনু কলেজ থিয়েটারের সদস্যদের সঙ্গে শ্রীমঙ্গলে বনভোজনে ঘুরতে গিয়েছিলেন। শ্রীমঙ্গলে চা বাগানে তোলা ছবিগুলোই ছিল তনুর জীবনের শেষ ছবি। ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় তাদের আবাসিক এলাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে যাওয়ার চাপও তনুকে শ্রীমঙ্গলে যাওয়া থেকে থামাতে পারেনি।

শ্রীমঙ্গলে তোলা ছবি ফেসবুকে শেয়ার করেন তনু। কিন্তু কে জানতো, তার দুদিন পরেই সেই ছবিটিই তনু হত্যার প্রতিবাদে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে।

যা ঘটেছিল: ২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করতে গিয়ে আর বাসায় ফেরেননি তনু। পরিবারের সদস্যরা জানান, তিনি সার্জেন্ট জাহিদের বাসায় টিউশনি করাতে গিয়েছিলেন।

অন্যদিনের মতো সময়মতো বাড়ি না ফেরার তনুর বাবা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের কর্মচারী ইয়ার হোসেন তাকে খুঁজতে বের হয়েছিলেন। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে সেনানিবাসের পাওয়ারহাউস এলাকার একটি ঝোপের নিচে তনুর নিথর দেহ পাওয়া যায়।

এরপর তাকে সেনানিবাসের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা জানান, তার আগেই মৃত্যু হয়েছে।

দুইবার ময়নাতদন্ত, মৃত্যুর কারণ অজানা: তনু হত্যার একদিন পর ২১ মার্চ তনুর প্রথম ময়নাতদন্ত করেন সিএমএইচের চিকিৎসক ডা. শারমিন সুলতানা। কিন্তু সে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তি ওঠে।

পরে ৩০ মার্চ তনুর মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে দ্বিতীয় দফায় ময়নাতদন্ত করা হয়। ডা. কমোদা প্রসাদ সাহার নেতৃত্বে ডা. ওমর ফারুক ও ডা. করুণা রানি কর্মকার দ্বিতীয় দফায় তনুর ময়নাতদন্ত করেছিলেন।

তনুর বাবা জানান, তনুকে যখন মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল তখন তার লম্বা চুল কাঁচি দিয়ে কাটা ছিল। নাক ও মুখে রক্তের দাগ, মাথার পেছনেও আঘাত ছিল।

তনু নিহত হওয়ার একদিন পর ২১ মার্চ কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা আসামি করে হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগে একটি মামলা করেন তনুর বাবা ইয়ার হোসেন।

প্রথমে মামলার তদন্তকাজ শুরু করেন নাজিরাবাজার পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক সাইফুল ইসলাম। প্রথমে থানা পুলিশ, পরে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) হয়ে মামলাটি সিআইডিতে স্থানান্তরিত হয়।

প্রাথমিক ডিএনএ পরীক্ষায় সিআইডি নিশ্চিত করে, তনুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। তার কাপড়ে পৃথক তিন ব্যক্তির নমুনা পাওয়া যায়। তবে অজ্ঞাত কারণে এখনো পর্যন্ত তা কারও সঙ্গে মেলানো যায়নি। মামলার কোনো কূলকিনারা না করতে পেরে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর তনু হত্যা মামলার নথিপত্র পিবিআইকে হস্তান্তর করে সিআইডি।

গত ১০ বছরে মোট ৭ জন তদন্ত কর্মকর্তা এ মামলাটির দায়িত্ব পালন করেছেন।

বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পিবিআই সদর দপ্তরের পুলিশ পরিদর্শক মো. মজিবুর রহমান। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে তিনি এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তরিকুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমরা ৬ এপ্রিল আদালতে সর্বশেষ অগ্রগতি তুলে ধরেছি। আমাদের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আশা করি তদন্তের মাধ্যমে সবকিছু বেরিয়ে আসবে।'

আন্দোলন দমনচেষ্টা: ১০ বছর আগে তনু হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছিল। শিক্ষার্থী থেকে সর্বস্তরের মানুষ রাস্তায় নেমে তনু হত্যার বিচারের দাবি জানিয়েছিলেন।

তনু হত্যার বিচারের দাবিতে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষার্থী, থিয়েটারকর্মী ও সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

একাধিক প্রতিবাদকারী জানান, নিজেদের গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য পরিচয়দানকারী ব্যক্তিরা আন্দোলনকারীদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখিয়েছেন।

সাংস্কৃতিক কর্মী খায়রুল আনাম রায়হান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আন্দোলন দমন করতে এসব সংস্থা নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য নানাভাবে চেষ্টা চালিয়েছিল। যদিও তা শেষমেশ ব্যর্থ হয়।’

এখনো রয়েছে আশা: কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর কাইমুল হক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘দেরিতে হলেও তিনজন সন্দেহভাজনের নাম প্রকাশ্যে এসেছে। আইনের চোখে সবাই সমান। আমরা সবসময়ই তনুর পরিবারের পাশে থাকব।’

তনুর বাবা ইয়ার হোসেন বলেন, ‘গত দশ বছর ধরে আমি আমার মেয়ের হত্যার বিচার চাইছি। কিন্তু তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকায় বিচার পাইনি।’

আনোয়ারা বেগমের অদম্য সংগ্রাম: গত ৬ এপ্রিল শারীরিক অসুস্থতার কারণে আদালতে হাজির হতে পারেননি তনুর মা আনোয়ারা বেগম। এ মুহূর্তে তার একটাই দাবি, তার মেয়ের হত্যার বিচার। 
গত দশ বছরে অসংখ্য বাধা, বিপত্তি, হুমকি ও প্রলোভন, কোনো কিছুই আনোয়ারা বেগমকে টলাতে পারেনি।

আনোয়ারা বেগম বলেন, 'সার্জেন্ট জাহিদ ও তার স্ত্রীকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে প্রকৃত অপরাধীদের বের করা সম্ভব। তৎকালীন জিওসির (সেনানিবাসের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা) স্ত্রী এবং একজন কমান্ডিং অফিসারের স্ত্রী সরাসরি এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন এবং অধীনস্থদের উসকানি দিয়েছিলেন।’ উৎস: ডেইলি স্টার।

 

  • সর্বশেষ