আজিজুল হক, বেনাপোল (যশোর): আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে যশোরের বিভিন্ন সীমান্ত পথ দিয়ে ভারত থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক ঢোকার অভিযোগ উঠেছে। প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে এসব অস্ত্র ব্যবহার বাড়ায় ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গত দুই মাসে যশোর সীমান্তে বড় চারটি অস্ত্রের চালান আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
সরকার পরিবর্তনের পর গত এক বছরে শুধু যশোর সীমান্ত এলাকায় ৬২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যার অধিকাংশই সংঘটিত হয়েছে বিদেশি পিস্তল ব্যবহার করে। স্থানীয় ভোটারদের আশঙ্কা—ভোটের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার না হলে মানুষ নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে চাইবে না। তবে সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
সীমান্ত ঘুরে জানা যায়, যশোরের শার্শা, চৌগাছা ও ঝিকরগাছা উপজেলায় প্রায় ২৪০ কিলোমিটার ভারতীয় সীমান্ত রয়েছে। নদী, ঘন বনাঞ্চল, সমতল ভূমি এবং অনেক জায়গায় তারকাঁটা না থাকায় চোরাকারবারিদের তৎপরতা বেশি। যশোর সীমান্তের অন্তত ১১টি রুট দিয়ে অস্ত্রসহ নানা চোরাচালানি পণ্য ঢোকে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য। চৌগাছা, ঝিকরগাছা, শার্শা, শাহজাদপুর, হিজলা, পুটখালী, আন্দুলিয়া, মান্দারতলা ও বেনাপোল সীমান্তের গোগা, কায়বা ও শিকারপুর এলাকা এসব রুটের মধ্যে রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের পর ভারত থেকে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি অবৈধ অস্ত্র আসে যশোর সীমান্ত দিয়ে। সাধারণত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও অন্ধ্র প্রদেশে তৈরি অস্ত্র বেশি আসে। এর মধ্যে বিহারের মুঙ্গেরে তৈরি ‘কাট্টা রাইফেল’, বেলঘরিয়ার ‘বেলঘরিয়া পিস্তল’, খিদিরপুরের ‘ছক্কা পিস্তল’ ও মুর্শিদাবাদের ‘ময়ূর পিস্তল’ উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক সময়ে নাইন এমএম ও সিক্স পয়েন্ট ফাইভ এমএম পিস্তল এবং .৩৮ ও .৩২ বোর রিভলবারের ব্যবহারও বেড়েছে—আকারে ছোট হওয়ায় এগুলো সহজে পাচার ও লুকানো যায়।
গত ৩০ জানুয়ারি যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার ধলগ্রাম ইউনিয়নের দড়িআগ্রা গ্রামে অভিযান চালিয়ে ১০টি গ্রেনেড, ৩টি বিদেশি পিস্তল, ১৯ রাউন্ড গুলি, একটি চাপাতি, একটি ছুরি ও একটি খুর উদ্ধার করা হয়।
এ ছাড়া গত বছরের ৩০ নভেম্বর যশোর সদর উপজেলার নওয়াপাড়া ইউনিয়নের মধুগ্রাম থেকে ৫টি বিদেশি পিস্তল, ১০টি ম্যাগাজিন, ৫০ রাউন্ড গুলি ও ৪ কেজি ৫০০ গ্রাম গাঁজাসহ একজনকে আটক করা হয়।
৭ ফেব্রুয়ারি পরিত্যক্ত অবস্থায় ৪টি ভারতীয় এয়ারগান, ১টি বিদেশি গ্যাস পিস্তল ও বিভিন্ন অস্ত্রাংশ উদ্ধার হয়। একই রাতে দুইটি যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পিস্তল, দুইটি ম্যাগাজিন, একটি তাজা গুলি, এয়ারগানের গুলি, দুটি চাপাতি, একটি সাইড টেলিস্কোপ ও পাঁচটি সিসিটিভি ক্যামেরাসহ চারজনকে আটক করে পুলিশ।
বেনাপোলের বাসিন্দা রহমান বলেন, “চোরাইপথে আসা অস্ত্রের তুলনায় উদ্ধার অনেক কম। যে পরিমাণ অস্ত্র থেকে যায়, সেটাই যশোরকে অশান্ত করে তোলে। রাজনৈতিক আশ্রয়ে অস্ত্রধারীরা প্রকাশ্যে মহড়া দেয়—এতে ভোটের আগে আমরা আতঙ্কিত।”
মানবাধিকার কর্মী ও রাইটস যশোরের নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর নির্বাচন নিশ্চিত করতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার জরুরি। কিন্তু যে হারে অস্ত্র ঢুকছে, সে হারে উদ্ধার হচ্ছে না।
যশোর ৪৯ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেঃ কর্নেল সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ে দেশের ৪,৪২৭ কিলোমিটার সীমান্তে ৩৭ হাজারের বেশি বিজিবি সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। কোনো অস্ত্রের চালান ঢুকলেও তা দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের আগেই আটক করা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন এবং অপরাধ দমনে জনসাধারণকে বিজিবির পাশে থাকার আহ্বান জানান।