সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) ওয়াশিংটন ডিসিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক-সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি সই করতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন জানিয়েছেন, সোমবারের চুক্তিতে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক আরও কমানোর চেষ্টা চলছে। ‘তবে কতটা কমবে— তা এই মুহূর্তে আমি বলতে চাচ্ছি না বা পারছি না।”
তিনি জানিয়েছেন, সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে শুল্কহার নির্ধারণের বিষয়টি চূড়ান্ত হবে। রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন শেখ বশিরউদ্দীন। তিনি এ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বেও রয়েছেন।
শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, “৯ তারিখে যে চুক্তিটি হতে যাচ্ছে, সেখানে আমরা চেষ্টা করছি শুল্ক আরও কতটা কমানো যায়। তিনি বলেন, ‘‘শুধু সামগ্রিক শুল্ক কমানো নয়, বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতে শুল্ক শূন্যে নামিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।”
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির শর্ত ফাঁস হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, “৩৭ পারসেন্টের যে ট্যারিফ আমাদের উপরে ইম্পোজ হয়েছিল, যেটাকে আমরা নেগোশিয়েট করে ২০ পারসেন্টে নামিয়েছিলাম, যদি আমাদের এই চুক্তিটা প্রকাশিত না হতো আমি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি যে, আমরা ২০ পারসেন্টের থেকেও কম পেতাম।
“দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা ওখানে বিব্রত হয়েছি; পৃথিবীতে একমাত্র দেশ—যেখান থেকে এই চুক্তির শর্তগুলি সারা দুনিয়াতে প্রকাশিত হয়েছে। তারপরেও আমরা আমাদের তাৎপর্যপূর্ণভাবে আমাদের প্রতিযোগী দেশসমূহ থেকে ২০ পারসেন্টে ট্যারিফ নামিয়ে এনেছি।”
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং সংলাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ৬২৬টি পণ্যে শুল্ক ছাড়ের ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ। এর মধ্যে ১১০টি পণ্যের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু তাতে ট্রাম্পের মন গলেনি।
শুল্কের চাপ কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে রয়েছে—মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা কোম্পানি বোয়িংয়ের কাছে উড়োজাহাজ কেনা এবং গম, সয়াবিন তেল ও তুলা আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ। শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, “আমাদের যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা নেই, ১৯টা প্লেন আমাদের আছে; ইনফ্যাক্ট আমাদের প্লেন আছে ১৪টা, বাকি প্লেনগুলো ফ্লাইঅ্যাবল না। এই ১৪টা প্লেন দিয়ে আমাদের যে নেটওয়ার্ক এবং আমাদের বিমানের যে মাস্টারপ্ল্যান; সেখানে আমরা বলছি ২০৩৫ সাল নাগাদ আমাদের ৪৭টা প্লেনের দরকার।
“আমার ধারণা আরও অনেক বেশি দরকার, বাট উনারা নিদেনপক্ষে ৪৭টা প্লেনের কথা বলেছেন। আমরা যে চুক্তি বোয়িংয়ের সাথে করতে যাচ্ছি, এটা ২০৩৫ সাল নাগাদ মাত্র ১৪টা প্লেন নিয়ে কথা বলছি।”
বেসামরিক বিমান পরিবহন উপদেষ্টা বলেন, “এই প্লেন ক্রয় প্রস্তাব বোয়িং এবং এয়ারবাসকে একসাথে বিশ্লেষণ করে টেকনো ইকোনমিক ফিজিবিলিটি করে একটা প্রস্তাবনা পাঠানো হয়।
“এই প্রস্তাবনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে এটার প্রাইস নেগোসিয়েশন করার জন্য ডক্টর ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ (পরিকল্পনা উপদেষ্টা) স্যারকে হেড করে একটা নেগোসিয়েশন টিম করা হয় যেই টিম এই বোয়িংয়ের সাথে নেগোসিয়েট করছেন। এই নেগোসিয়েশন এখনো চলমান আছে।”
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১০টি এয়ারবাস কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছিল। কিন্তু অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন আর ডনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির চাপে শেষ পর্যন্ত বোয়িংয়ের কাছ থেকে উড়োজাহাজ কিনতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
গত ৩০ ডিসেম্বর বোয়িং থেকে ১৪টি এয়ারক্রাফট কেনার সিদ্ধান্ত দেয় বিমানের পরিচালনা পর্ষদ। এর মধ্যে রয়েছে ৮টি সুপরিসর বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার ও ২টি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং ৪টি ন্যারো বডির বোয়িং ৭৩৭-৮ মডেলের উড়োজাহাজ।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতির প্রসঙ্গ টেনে শেখ বশির বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমাদের প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার মানে ৭০-৮০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। এই ৮০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ‘তুমি আমার কাছ থেকে যে পরিমাণ রপ্তানি করো, তার থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকার পণ্য আমার কাছ থেকে কম কিনো। সো এই যে কম তুমি কিনছো, এটা তুমি আমার ওপরে সঠিক করছো না’।
“আপনারা যদি দেখেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমাদের রপ্তানি আয় এক লাখ কোটি টাকার উপরে। আমরা যে বিমান ক্রয়ের প্রস্তাবনা করছি, সেটার মূল্যমান হয়তোবা ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা হবে। সেটা আমাদের মূল্য পরিশোধ করতে হবে ১০ বছরে। ১০ বছরে ইনফ্যাক্ট আরও বেশি সময়ে; কারণ এটার পেমেন্ট শিডিউল অনেক লং টার্ম হয়তোবা ২০ বছরে মূল্য পরিশোধ করতে হবে।”
তবে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, চুক্তির মূল বিষয়গুলো অন্তত রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক অংশীজনদের জানানো উচিত ছিল। তিনি বলেন, “যারা ভবিষ্যতে এই চুক্তি বাস্তবায়ন করবে, তারা যদি কিছুই না জানে— তাহলে জবাবদিহি থাকবে কোথায়?” সিপিডির আরেক সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, “এটি শুধু একটি শুল্ক চুক্তি নয়; এর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। অথচ স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে।”
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাগ্রিমেন্ট (টিকফা) প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ভবিষ্যতে এই চুক্তি নিয়ে পুনরায় আলোচনা করা সম্ভব। তবে সেটি কার্যকর হবে কিনা, তা নির্ভর করবে চুক্তির ভাষা ও শর্তের ওপর। যদি কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদি বাধ্যবাধকতা যুক্ত থাকে, তাহলে নতুন সরকারের জন্য তা সহজ হবে না।
ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকদের শঙ্কা— গোপন শর্ত, নির্বাচনের আগে তাড়াহুড়ো এবং অংশীজনদের বাদ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।