দ্য ডিসেন্টে নিউজ প্রতিবেদন: গত ২৪ জানুয়ারি বাগেরহাটে সন্তানকে হত্যা করে স্বর্ণালী নামের এক নারীর নিজের মর্মান্তিক আত্মহত্যার ঘটনায় দেশময় আলোড়ন তৈরি হয়। স্বর্ণালীর স্বামী ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দাম হোসেন সেসময় কারাগারে বন্দি ছিলেন। মূলত কারাগারে থাকায় স্ত্রী-সন্তানের জানাযায় সাদ্দামের থাকতে না পারার ঘটনা সব মহলের মানুষকে আন্দোলিত করেছে। অভিযোগ ওঠে, সাদ্দামের জেলে বন্দী থাকার ঘটনায় ক্রমাগত হতাশ হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন স্ত্রী স্বর্ণালী।
তবে দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধানে ভিন্ন চিত্রও পাওয়া গেছে। সাদ্দাম ও স্ত্রী স্বর্ণালীর মধ্যে এবং উভয়ের পরিবারের মধ্যে টানাপোড়েন ছিল বলে জানা যাচ্ছে অনুসন্ধানে। এমনকি আটক হওয়ার আগে স্বর্ণালীর উপর সাদ্দাম শারীরিক নির্যাতন ও স্বর্ণালীর কাছে যৌতুক দাবি করেছেন দাবি করে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন তার স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালী। মামলার এজহারে স্বর্ণালী উল্লেখ করেন, আটক হওয়ার আগে গত ৩ এপ্রিল সাদ্দাম স্বর্ণালীকে মারধর করে বাসা থেকে বের করে দিয়েছিলেন।
জুলাইয়ের ৮ তারিখে দায়ের করা মামলার এজহারে উল্লেখ রয়েছে, “যেহেতু বিবাহের কিছুদিন পর হইতেই যৌতুক লোভী আসামী ব্যবসার কথা বলে বাদীনির পিতার নিকট থেকে ২,০০,০০০/-(দুই লক্ষ) টাকা যৌতুক আনার জন্য চাপ প্রয়োগ করিতে থাকে এবং বিভিন্ন সময়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করিতে থাকে। বাদীনির পিতা কন্যার সুখের কথা চিন্তা করিয়া বিগত দিনের বিভিন্ন তারিখ ও সময়ে ১ নং আসামীকে ব্যাবসার জন্য মোট ১,০০,০০০/- (এক লক্ষ) টাকা প্রদান করেন। আসামী নেশায় আসক্ত হওয়ায় উক্ত টাকা খরচ করিয়া পুনরায় বাদীনির পিতার নিকট থেকে ২,০০,০০০/-(দুই লক্ষ) টাকা যৌতুক আনার জন্য চাপ প্রয়োগ করিলে বাদিনী পিতার নিকট থেকে আর কোন টাকা চাহিতে অস্বীকার করায় গত ০৩/০৪/২০২৫ ইং তারিখ আসামী বাদিনীকে এক কাপড়ে ভাড়া বাসা থেকে বের করে এবং যৌতুকের টাকা নিয়ে না আসলে বাদীনির সাথে সংসার করিবে না মর্মে জানায়।“
পরিবারের একাধিক সদস্য ও প্রতিবেশীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই ঘটনার পর সাদ্দাম ভিন্ন মামলায় গ্রেফতার হয়ে গেলে বিষয়টি পারিবারিকভাবে মেটানোর জন্য উভয়পক্ষ চেষ্টা করেন। তবে শেষমেশ এই চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় কয়েক মাস পর আগস্ট মাসে স্বর্ণালী মামলা দায়ের করেন।
মামলার এজহার ও বিয়ের কাবিননামা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী সাদ্দামের সাথে স্বর্ণালীর বিয়ে হয়েছিল ২০২৪ সালে ১০ ডিসেম্বর। ২০২৫ সালের এপ্রিলের ১২ তারিখ খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাদের একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়।
তবে দুই পরিবারের একাধিক সদস্য জানিয়েছেন পরিবারে অমতে কয়েক বছর আগেই সাদ্দাম ও স্বর্ণালী বিয়ে করেছিলেন। পরে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পরিবারের সম্মতিতে আবার বিয়ে ও রেজিস্ট্রেশন করা হয়।
এ ব্যাপারে স্বর্ণালীর ভাই শাহনেওয়াজ আমিন শুভ বলেন - "এরকম পারিবারিক স্ট্যাটাসে স্বাভাবিকভাবে এরকম বিয়ে হতো না।... প্রথমদিকে আমরা ওকে (সাদ্দাম) আমরা ঘৃণার চোখে দেখতাম। পরে স্বাভাবিকভাবে মেনেও নিয়েছি।"
সাদ্দামের ছোট ভাই শহীদুলের বক্তব্যেও বিয়ে নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে টানাপোড়নের বিষয়ে জানা যায়। তিনি বলেন, "প্রথমে তারা এককভাবে বিয়ে করেছিল আজ থেকে তিন-চার বছর আগে। পরে কেউ কারো বাড়ি আসতো না, যেতো না। কারণ দুই ফ্যামিলি থেকেই মানতো না। প্রায় ১ বছর কেউ কারো বাড়িতে যায়নি। পরে আমার বাবা মারা যাওয়ার পরে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়।"
দুই পরিবারের মধ্যে সামাজিক অবস্থানের তারতম্য বিয়ে মেনে না নেওয়ার অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়রা।
স্বর্ণালীর বাবা রুহুল আমিন হাওলাদার বাগেরহাট জেলা জাতীয় পার্টির সহ-সভাপতি এবং এলাকায় বিত্তশালী হিসাবে পরিচিত। অন্যদিকে সাদ্দামের পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা অতীতে খুব একটা ভালো ছিল না। এইচ এম ইমতিয়াজ নামে সাদ্দামের এক প্রতিবেশি ও আত্মীয় এ ব্যাপারে বলেন, “সাদ্দামের বাবা প্রথমে রিক্সা চালাতো, পরে ট্রেনে হকারি করতো। তারপর রূপসাতে একটা মুদির দোকান দিছিলো, পরে সেখান থেকে ষাট গম্বুজ স্টেশনে এসে দোকান দেন। তাদের ফ্যামিলি স্ট্যাটাসে মিলে না। সাদ্দামের ক্ষমতা ছিল, সেই ক্ষমতায় বিয়ে করছিলো স্বর্ণালীকে।"
এদিকে সাদ্দামের সাথে অন্য এক নারীর সম্পর্ক নিয়ে স্বর্ণালী মানসিক যাতনায় ভুগতেন বলে জানিয়েছেন তার আত্মীয়রা। এ ব্যাপারে স্বর্ণালীর মামি জয়া জুঁই বলেন, “স্বর্ণালী আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসলে হঠাৎ দেখি সে কান্না করছে। জিজ্ঞেস করার পর তখন স্বর্ণালী বলছিল ’আমি বাড়িতে না থাকলে একটা মহিলা আসে। আমি বাগেরহাট থেকে আসার পরে সে বাসায় আসে। আমি কল দিলে তখন সে (সাদ্দাম) কল রিসিভ করেনা। মহিলা বয়সে একটু বড়ো আর চরিত্র অনেক খারাপ।’”
এই কারণে স্বর্ণালী বেড়াতে আসলে বেশি দিন থাকতে চাইতো না বলে জানান তার মামি।
স্বর্ণালীর নানী লাভলী বেগমও দু’জনের মাঝে অন্য একজন নারী থাকার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আমি যখন খবর শুনে স্বর্ণালীর শশুর বাড়িতে যাই তখন তার শাশুড়ি বলেন অনেক দিন করে স্বর্ণালী এরকম তাল বাহানা করতেছে। মরার আইটেম গুছাচ্ছে ।”
তিনি আরও বলেন, “আমি শুনছি মৃত্যুর আগের দিন গোপালগঞ্জ থেকে এক মহিলা আসছিল। স্বর্ণালীর ভাই শুভ যখন সাদ্দামের ভাইদেরকে জিজ্ঞেস করল, ভাইয়া আপনাদের বাড়িতে কেউ আসছিল কিনা! তখন তারা উত্তেজিত হয়ে বল্লো কথার উত্তর দিতে পারবো না। যখন বাড়ির সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে চাইলো তখন তারা সেটা নষ্ট বলে দিল ।”
এদিকে ফেসবুকে অনেকেই স্বর্ণালীর আত্মহত্যার ঘটনায় উপার্জনক্ষম স্বামীর অনুপস্থিতিতে অর্থকষ্টে স্বর্ণালী আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন বলে বিশ্লেষণ হাজির করেছেন। তবে এই বিষয়টির সাথে প্রবলভাবে দ্বিমত পোষণ করেন স্বর্ণালীর ভাই শুভ এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রাক্তন ইউপি মেম্বার আবু হানিফ হাওলাদার।
এ ব্যাপারে আবু হানিফ বলেন "স্বর্ণালীর বাবা রুহুল আমিন হাওলাদার প্রায় বিশ বিঘা সম্পত্তির মালিক। এছাড়াও, সাদ্দামের এখনও ঠিকাদারির ব্যবসা য়েছে। যার দেখভাল করে আকবর। সাদ্দাম সামি এন্টারপ্রাইজ ও জেড এ কর্পোরেশন নামক দুইটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সের নামে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা করে।"
সাদ্দামের প্রতিবেশি ও আত্মীয় এইচ এম ইমতিয়াজও একথার সাথে একমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, "আকবর নামে একজন আছে যে সাদ্দামের অস্ত্র বহনকারী ও ক্যাডার। এখন সাদ্দামের ব্যবসায় ম্যানেজার হিসাবে কাজ করে। যশোর কারাগারে থেকে আকবরের মাধ্যমে সাদ্দাম যে কেবল নিজের ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা করেন তাই নয়; বরং তাঁর অপর দুই ভাইও আর্থ-সামাজিকভাবে বেশ প্রতিষ্ঠিত।”
স্বর্ণালীর ভাই শাহনেওয়াজ আমিন শুভ এ ব্যাপারে বলেন, "ওদের আর্থিক অবস্থা এখন বেগবান। সাদ্দামের বড় ভাই মেহেদী হাসান রুবেল বর্তমানে পুলিশের কনস্টেবল হিসাবে কর্মরত। ছোটভাই শহীদুল ইসলাম রাজধানীতে একটি ডেভালপার কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার।”
পরিবারটি কিছুদিন আগে সাদ্দামের শিশু সন্তান নাজিফের আকিকা উদযাপন করেছে বলেও জানান শুভ।
শুভ’র এই মন্তব্যের সাথে একমত প্রকাশ করেন স্বর্ণালীর শ্বশুর বাড়ির প্রতিবেশী মনোয়ারা বেগম। তিনি বলেন, "মাঝে মাঝে সাদ্দামের এক বড় ভাই এসে মাছ-তরকারি-ফলমূল সব কিনে দিয়ে যায়।"
এছাড়া সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়- সাদ্দামের গ্রামের বাড়িটি একটি একতলা বিশিষ্ট পাকা বিল্ডিং।
প্রসঙ্গত, সাদ্দাম ৫ই আগস্টের আগে শেখ হেলাল ও শেখ তন্ময়ের সাথে রাজনীতি করতেন। যা তার ছোটো ভাইও স্বীকার করেন। এ ব্যাপারে স্বর্ণালীর ভাই শুভ বলেন, "আওয়ামী লীগের সময় মানুষের ওপর নির্যাতন করতো সাদ্দাম।... ৫ আগস্ট তারিখে বেলা ১ টার দিকেও তিনি ষাট গম্বুজ রেলস্টেশনে অস্ত্র হাতে নিয়ে ঘুরছিলেন। উনার সঙ্গে ছিলেন কামরান আহমেদ, ফাহাদ খান ও আজিজুল। তিনজনের হাতে তিনটি বন্দুক ছিল এবং সাদ্দাম একটি বন্দুক নিয়ে কোথায় জানি চলে যায়। সে সময় আমরা স্টেশনে বসা ছিলাম।"
এদিকে সাদ্দামের সাথে স্বর্ণালীর দাম্পত্য কলহ থাকারও ইঙ্গিত পাওয়া যায় সাদ্দামকে স্বর্ণালীর পাঠানো একটি মেসেজ থেকে। মেসেজটি সাদ্দাম ফরোয়ার্ড করেছিলেন স্বর্ণালীর ভাই শুভকে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের প্রথমার্ধ্বে সাদ্দাম যখন ভারতে অবস্থান করছিলেন তখন স্বর্ণালী সাদ্দামকে মেসেজটি পাঠান। ওই মেসেজে স্বর্ণালী সাদ্দামকে বলেন, "আগে মানুষ বলেছে বুঝতে পারিনি। এখন বুঝতে পারছি তোর কি প্রয়োজন ছিল। তোর ফ্যামিলির মতো বহুরূপী দুনিয়ায় আমি একটিও দেখি নি।... আজ পর্যন্ত তোদের বাড়ি গেছি চার বছর। তুই কি কখনো আমার জিজ্ঞেস করেছিস - তোমার কোন অসুবিধা হচ্ছে না কি?"
মেসেজটি সাদ্দাম স্বর্ণালীর ভাই শুভকে ফরোয়ার্ড করে ভয়েস মেসেজে বলেন, "আমার ফ্যামিলি কি অন্যায় করেছে ওর সাথে?...আমার ফ্যামিলির ভেতর কেন অশান্তি সৃষ্টি করছে এর অপরাধে আমি তাকে তাড়াবো।"
তবে স্বর্ণালীর মা এবং ভাই শাহনেওয়াজ আমিন শুভের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আটকের পর মাঝে মাঝেই পুত্র নাজিফকে সাথে নিয়ে বাগেরহাট ও যশোর কারাগারে থাকাবস্থায় সাদ্দামের সাথে দেখা করতে যেতেন স্বর্ণালী। স্বর্ণালীর মা বলেন, “গত সপ্তাহেও সাদ্দামের সঙ্গে দেখা করতে কারাগারে গিয়েছিল স্বর্ণালী।"
স্বর্ণালী যেদিন আত্মহত্যা করেন তার আগের দিন বৃহস্পতিবার স্বর্ণালীর শ্বশুর বাড়িতে যান তার ভাই শুভ। তিনি বলেন, “বৃহস্পতিবার আমি তার বাসায় গিয়েছিলাম। আমার বোনের কথাবার্তা স্বাভাবিক ছিল।"
শুক্রবার পরিবারের সবার সাথে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানেও যাওয়ার কথা ছিল স্বর্ণালীর। এ ব্যাপারে সাদ্দামের বড় বোন লাকি বলেন, “স্বর্ণালী বলে আমার ভালো লাগছে না; আমি যাবো না। পরে আমাকে ২০০ টাকা দেয়। আমি তা নিয়ে চলে গেছি, তখন জুমার নামাজ শুরু হচ্ছিল। এসে দেখি দরজা লক করা। ডাকডাকি করে সাড়াশব্দ কিছুই পাই না। আমার ছেলে নাফিজ নামাজে গেছে। তাকে ডাকলাম। সে ছাদের ওয়াল বেয়ে উঠে ভেতরের দরজা খুলে। ভেতরে দেখলাম গলায় দড়ি দিয়ে ফ্যানের সাথে ঝুলতেছে। ভাইপোকে কোথাও খুঁজে পাই না। পরে বালতির মধ্যে খুঁজে পাইলাম।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাওয়া ছবিটিতে শিশু নাজিফকে মেঝেতেই পড়ে থাকতে দেখা যায়।
স্বর্ণালীর মৃত্যু সম্পর্কে জানতে চাইলে বাগেরহাট মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ মাহামুদ-উল-হাসান পুলিশ পরিদর্শক বলেন, “এটা তদন্তনাধীন বিষয়। এব্যাপারে মন্তব্য করার সুযোগ নাই। মেডিকেল পেপারস পাওয়ার পর মন্তব্য করা যাবে।”
