শিরোনাম
◈ ইরানের সঙ্গে বড় যুদ্ধের শঙ্কা, গণকবরের প্রস্তুতি মার্কিন বাহিনীর ◈ সৌদি আরবে যৌথভাবে সার কারখানা গড়বে বাংলাদেশ ◈ প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগ দেবে সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী ◈ বিশ্বজুড়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে, শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বাকি! ◈ তাহসিফের মৃত্যুর তদন্তে নতুন মোড়, ‘জুনিয়র বন্ধু’ দীপকে নৌ-পুলিশের কাছে হস্তান্তর ◈ হাতিয়ায় হত্যা মামলার আসামিকে ধরতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি, ছিনিয়ে নিলেন স্বজনেরা ◈ ৮ ঘণ্টার বৈঠকেও সিদ্ধান্ত হয়নি, এমপি আব্দুল আজিজের বিষয়ে কেন্দ্রে যাচ্ছে নাটোর বিএনপির সুপারিশ ◈ বাংলাদেশ থেকে ১ লাখ কর্মী নেবে জাপান, সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো খবরের সত্যতা নেই: টোকিও ◈ বিগ-বি নিয়ে জাপানের সঙ্গে আলোচনায় তৃতীয় কোনো দেশ ছিল না: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ◈ বিষাক্ত ইনজেকশনের মৃত্যুদণ্ড থেকে বেঁচে ফেরা, ভয়াবহ অভিজ্ঞতা জানালেন সেই নারী

প্রকাশিত : ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:৫৩ সকাল
আপডেট : ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:১৭ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ঢাকার সবচেয়ে প্রাচীনতম ফলের আড়ত কোথায়, কিভাবে যাবেন?

ঢাকা যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, বুড়িগঙ্গার এ তীরটা তখন সরগরম। নৌকার বইঠার শব্দ, ট্রলারের ইঞ্জিনের ভটভট আর কুলি-মজুরদের হাঁকডাক—সব মিলে কর্মচঞ্চল এক দুনিয়া।

এই ব্যস্ততার মধ্যেই বাতাসে ভেসে বেড়ায় আপেল, আম, কাঁঠাল কিংবা কমলার মিষ্টি সুবাস। ঢাকার সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন ফলের আড়ত ‘বাদামতলী ফলের আড়ত’-এর ভোরের চিত্রটা এমনই।

সদরঘাট ও বাবুবাজারের মাঝামাঝি এই বাজারের অবস্থান। শোনা যায়, একসময় এই ঘাটে বিশাল একটা বাদামগাছ ছিল, সেখান থেকেই এর নাম ‘বাদামতলী’। প্রায় ২৫০টি বড় আড়ত নিয়ে গড়ে ওঠা এই বাজারে প্রতিদিনই ভিড় করেন ঢাকা ও ঢাকার বাইরে থেকে আসা খুচরা বিক্রেতারা।

ট্রাক থেকেই নিলাম

Advertisement

বাদামতলীর বাজারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্য হলো ট্রাক থেকে সরাসরি ফল বিক্রির ‘অকশন’ বা নিলাম। বিভিন্ন জেলা থেকে রাতে ছেড়ে আসা ফলের ট্রাকগুলো ঘাটে পৌঁছামাত্রই ঘিরে ধরেন ব্যাপারী ও পাইকারেরা।

ভোর না হতেই বাজারের আড়তদারেরা ফল কিনে নেওয়ার পর বাকি থাকা ফলগুলো ট্রাকের ওপর থেকেই নিলামে বিক্রির জন্য হাঁকতে থাকেন বিভিন্ন দাম। একসঙ্গে ৩০টির বেশি ট্রাকে চলে নিলাম।

ট্রাকের সামনে অগুনতি ক্রেতা। ট্রাক থেকে কেউ মেলে ধরছেন আপেলের কার্টন, কেউ মাল্টা, কেউবা কমলা বা আঙুরের বক্স। বিক্রেতা তাঁর দাম হাঁকেন। সেই দামের সঙ্গে মিল রেখে ক্রেতাদের মধ্যে সর্বোচ্চ দামে যিনি নিতে চান তিনি হাত তুলে জানান।

বিক্রেতার কাছে ক্রেতার দাম পছন্দ হলে গাড়ি থেকেই ক্রেতার হাতে ছুড়ে মারেন সদ্য কেনা কার্টনের আপেল, কমলা, মাল্টা কিংবা আঙুর। তৎক্ষণাৎ টাকা শোধ করে ফল সংগ্রহ করেন ক্রেতারা।

ফল বিক্রি শেষ না হওয়া পর্যন্ত এমনটা চলতে থাকে। এই দরদামের ব্যস্ততা চলে ভোর থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত। ভ্যানে খুচরা ফল বিক্রি করেন আবদুর রহমান। সেই ফল কিনতেই জুরাইন থেকে এসেছেন। তিনি জানান, এরই মধ্যে ৩ হাজার ৯০০ টাকায় আপেল ও ২ হাজার টাকায় কিনলেন মাল্টা। জুতসই দামে আরও কিছু কিনে নিজের গন্তব্যের দিকে ফিরতে চান।

ঋতুভেদে দেশি ফলের উৎসব

বাদামতলীতে মৌসুমভেদে বদলায় দেশি ফলের রূপ। জ্যৈষ্ঠ থেকে ভাদ্র মাসে এখানে বসে আম, লিচু, লটকন, কাঁঠাল ও আনারসের উৎসব। ক্যালেন্ডারের পাতায় আমের মৌসুম বিদায় নিয়েছে অনেক আগেই। তবে আছে বারোমাসি কাটিমন আর আশ্বিনা আম।

প্রায় ২৫ বছর ধরে বাদামতলীতে ব্যবসা করছেন মুন্সিগঞ্জের রাসেল লাকুড়িয়া। তিনি জানান, আমের গুণগত মান এবং ব্যাগিং করা ও না-করার ওপর ভিত্তি করে দরদাম ওঠানামা করে। আমে ব্যাগিং করার সুবিধা হলো রোগ পোকার আক্রমণ কম হয় এবং আম থাকে একদম সতেজ। কোনো ঝড়ঝাপটার আঁচড় লাগে না। কালো ছোপ ছোপ দাগ পড়ে না।

ব্যাগিং করা ফ্রেশ আমকে বিক্রেতারা বলেন ‘টিস্যু করা আম’। আর যেসব আম ব্যাগিং করা হয় না, গায়ে কালো ছোপ ছোপ দাগ থাকে, সেসবকে বিক্রেতারা বলেন ‘নিয়ম আম’। স্বভাবতই টিস্যু আমের চেয়ে নিয়ম আমের দাম তুলনামূলক কম থাকে।

যেমন ব্যাগিং করা ও ভালো মানের গাছপাকা কাটিমন আমের দাম প্রতি কেজি ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা। অপর দিকে ব্যাগিং ছাড়া নিয়ম মানের কাটিমনের দাম প্রায় ১৮০ টাকা। বিপরীতে আশ্বিনা আমের দাম ১৮০ টাকা থেকে ২২০ টাকা প্রতি কেজি।

যেহেতু পাইকারি বাজার, তাই খুচরা বিক্রির সুযোগ নেই। এখানে আম বিক্রি হয় ক্রেট হিসেবে। ক্রেটসহ মোট ওজন ২৮ কেজি হলে ক্রেট ও ভেতরে থাকা কাগজের ওজন বাবদ ২ কেজি বাদ দিয়ে ২৬ কেজি আমের দাম ধরা হয়।

১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজিতে মিলছে দেশে উৎপাদিত ড্রাগন ফল। সবুজ রঙের বারি মাল্টা–১ বা পয়সা মাল্টা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১০০ টাকা দরে।

বারো মাসের বিদেশি ফল

দেশি ফলের বাইরে বাজারের অধিকাংশই থাকে আমদানি করা বিদেশি ফলের দখলে। দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল, নিউজিল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, পোল্যান্ড ও চীন থেকে আসা আপেল, মাল্টা, কমলা ও আঙুরের চাহিদা বারো মাসই থাকে।

আপেলের মধ্যে রয়েছে হালকা গোলাপি রঙের ফুজি আপেল, লালচে খয়েরি রঙের দক্ষিণ আফ্রিকান আপেল ও গালা আপেল।

১৮-১৯ কেজি ওজনের এক কার্টন আপেলের দাম পড়ে ৪ হাজার ৮০০ থেকে ৬ হাজার ৩০০ টাকা।

১৮-১৯ কেজি ওজনের এক কার্টন বড় আকারের কমলা ২ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকা। ১০ কেজি ওজনের কার্টন বক্সের ছোট জাতের চায়না কমলা ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা। আমদানি করা হলুদ মাল্টা প্রতি ১৫ কেজি ওজনের কার্টনের দাম ২ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ১০০ টাকা।

প্রতি ৭ কেজি ওজনের লাল আঙুর ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৭৫০ টাকা আর সাদাটে সবুজ আঙুর ২ হাজার টাকা। ছোট আকারের আনারের দাম প্রতি কেজি ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা আর বাতাবিলেবুর সমান ঢাউস আকৃতির আনারের দাম পড়ে প্রতি কেজি ৪৫০ টাকা।

হলুদ রঙের তাজা কাঁচা খেজুরের দাম প্রতি ১০ কেজি ২ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার টাকা।

বাবুবাজার ব্রিজের ঠিক কাছেই বায়তুল আমান জামে মসজিদের বিপরীতে পাবেন থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করা ফলের সংগ্রহ।

দাড়িওয়ালা লিচু রাম্বুটান প্রতি কেজি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, ডুরিয়ান ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, অ্যাভোকাডো ১ হাজার ৪০০ টাকা, সোনালি রঙের কিউই ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা, সবুজ রঙের কিউই ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা। প্লাম ১ হাজার টাকা, ব্লু বেরি ৩ হাজার ২০০ টাকা ও চেরি ফল মিলবে চার হাজার টাকা কেজি।

পাকা খেজুরের রাজ্য

শাহজাদা মিয়া লেন ধরে এগোলে চোখে পড়ে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক খেজুরের সংগ্রহশালা। প্যাকেটবন্দী পাকা খেজুর। সৌদি আরব, ইরান ও আরব আমিরাত থেকে এসেছে এসব খেজুর।

বাজারে মানভেদে আজওয়া খেজুরের দাম প্রতি ৫ কেজি ওজনের কার্টন ৩ হাজার ৬০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা, মেডজুল খেজুর ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকা এবং মাবরুম খেজুর প্রতি কার্টন ৫ হাজার টাকা।

এ সময় ক্রেতা কম থাকলেও রমজান মাসকে ঘিরে খেজুরের চাহিদা বাড়ে ব্যাপক।

কীভাবে যাবেন, কখন যাবেন

ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে গুলিস্তান হয়ে সদরঘাট বা বাবুবাজার ব্রিজে ওঠার আগেই নামা সবচেয়ে সুবিধাজনক। সেখান থেকে কয়েক মিনিটের হাঁটাপথে বাদামতলীর ঘাট। ঢাকার নবাববাড়িখ্যাত আহসান মঞ্জিল থেকে শুরু করে বাবুবাজার ব্রিজ পর্যন্ত এই ফলের আড়ত।

ভোর ৫টা থেকে বেলা ১১টার মধ্যে ট্রাকের নিলাম, হাঁকডাক ও বাজারের আসল ব্যস্ততা ধরা পড়ে। আর ফলের আড়তে ফল পাবেন সন্ধ্যা পর্যন্ত। পুরান ঢাকায় অন্যান্য বাজারের সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবার হলেও বাদামতলী ফলের বাজারের ছুটির দিন শনিবার। মূলত শুক্রবার বর্ডার (সীমান্ত) বন্ধ থাকে বলে শনিবার কোনো পণ্যবাহী ট্রাক এখানে আসে না। ফলে শনিবারটা এখানে সপ্তাহের অন্য দিনের তুলনায় সুনসান।

অকশনে ফল কেনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন। এখানে আগে থেকে ফলের মান যাচাই করার সুযোগ থাকে না। তাই অকশনে দাম কিছুটা কম হলেও কার্টনভর্তি ফলের মধ্যে থেঁতলে যাওয়া বা পচা ফল থাকতে পারে।

কাঁচামাল হিসেবে ফলের দাম পরিবর্তনশীল। ফলে সময়–সময় ফলের দাম ওঠানামা করে।

ফল কেনার আগে যাচাই করুন। বিভিন্ন আড়তে থাকা ফলের দোকানে প্রতিটি ফল দেখে ও যাচাই-বাছাই করে কেনার সুযোগ পাবেন।

শনিবার ছাড়া সপ্তাহের অন্য দিনগুলোয় সকালের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করুন।

সূত্র : প্রথম আলো

  • সর্বশেষ