রাজধানীর পল্লবীতে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দুই শ্যুটারকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন মো. রাশেদ ওরফে লোপন (৩৫) এবং মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে কাল্লু (৪০)।
র্যাব জানিয়েছে, গ্রেপ্তার দুই ব্যক্তি সরাসরি কিলিং মিশনে অংশ নিয়েছিল। তাদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি বিদেশি রিভলবার ও তিন রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।
শুক্রবার (২৭ মার্চ) রাজধানীর মিরপুরে র্যাব-৪ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কোম্পানি কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহাবুদ্দিন কবির এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর তারা অবৈধ পথে পার্শ্ববর্তী দেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তবে সীমান্তে কড়াকড়ির কারণে তারা পালাতে ব্যর্থ হয়। পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে তারা ঢাকায় ফিরে এসে বৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার জন্য পাসপোর্ট ও ভিসা তৈরির চেষ্টা শুরু করে।
পরবর্তীতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে মিরপুরের রূপনগর ইস্টার্ন হাউজিং এলাকা থেকে রাশেদ ওরফে লোপনকে এবং উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের দিয়াবাড়ি এলাকা থেকে জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে কাল্লুকে গ্রেপ্তার করা হয়।
র্যাব জানায়, গ্রেপ্তার লোপনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তার বাসা থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত অন্যান্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
গ্রেপ্তার হওয়া আসামিরা এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণ করার কথা স্বীকার করেছে উল্লেখ করে র্যাবের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, লোপনের কাছ থেকে পাওয়া রিভলবারের চেম্বারে ছয়টি গুলি থাকার কথা। কিন্তু পাওয়া গেছে তিনটি গুলি। পরবর্তীতে তাকে জিজ্ঞাসা করলে সে জানায়, ঘটনার সময় সে দুটি দুই রাউন্ড ফায়ার করেছিল গোলাম কিবরিয়াকে হত্যা করতে এবং এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি করেছিল আশপাশের জনগণকে সরিয়ে দিতে।
গোলাম কিবরিয়া হত্যায় কিলিং মিশনে কতজন অংশ নিয়েছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিলিং মিশনে সরাসরি শ্যুট করার জন্য ছিল তিনজন শুটার। একজন শুটার জনি, সে আগেই ধরা পড়েছে। আজকে আমরা আরও দুই শ্যুটারকে ধরেছি।
শাহাবুদ্দিন কবির আরও বলেন, তাদের অস্ত্র দেওয়া এবং নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য রেসকিউ টিমে ছিল ‘ভাগিনা মাসুম’। অস্ত্রগুলো সরবরাহ করা এবং সার্বিক নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্বে ছিল ‘পাতা সোহেল’। আর নিহত কিবরিয়া গোলাম কিবরিয়াকে নজরদারি করার কাজে নিযুক্ত ছিল সুজন। সার্বিকভাবে দেখা যায়, এই কিলিং মিশনে ছয় থেকে সাতজন জড়িত ছিল।
হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য সম্পর্কে র্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে আসামিদের স্বীকারোক্তি, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং আসামিদের কাছ থেকে আমরা যে ডিভাইসগুলো পেয়েছি, সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আমরা দেখতে পাই যে আসামিদের মিরপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী মশিউর রহমান মশির সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। গোলাম কিবরিয়া পল্লবী থানা যুবদলের সদস্য সচিব হিসেবে বেশ জনপ্রিয় একজন নেতা ছিলেন এবং তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতও খুবই উজ্জ্বল ছিল। তিনি হয়তো পরবর্তীতে পল্লবী থানা বিএনপির বড় কোন পদে যেতে পারতেন। মশি যে ঝুট ব্যবসা, হাউজিং ব্যবসা, ডেভলপার ব্যবসা, ফুটপাথের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতেন, এগুলোতে কিবরিয়া বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল বলে আমরা প্রাথমিক জানতে পেরেছি। এর কারণেই কিবরিয়াকে তারা সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ১৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় মুখোশধারী তিন সন্ত্রাসী মিরপুর ১২ নম্বরের বি ব্লকে ‘বিক্রমপুর হার্ডওয়্যার অ্যান্ড স্যানিটারি’ নামের একটি দোকানে ঢুকে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করে পল্লবী থানা যুবদলের সদস্যসচিব গোলাম কিবরিয়াকে। ঘটনার পর দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যাওয়ার সময় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় ওঠেন এবং দ্রুত না চালানোয় চালককে কোমরে গুলি করে আহত করে।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কিবরিয়ার স্ত্রী সাবিহা আক্তার দীনা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় আসামি হিসেবে পাঁচজনের নাম উল্লেখ করা হয়। এছাড়া অজ্ঞাত পরিচয় আরও সাত-আটজন এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের সময়ই জনি নামে এক শ্যুটারকে আটক করে পুলিশে দেয় জনগণ। পরদিন মামলার এজাহারনামীয় আসামি মো. মনির হোসেন ওরফে সোহেল ওরফে পাতা সোহেল এবং মো. সুজন ওরফে বুকপোড়া সুজনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।