প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পুলক ঘটক: রেইনট্রি হোটেলের মামলায় রায় পূর্ণাঙ্গ পড়ার আগে সামগ্রিক সিদ্ধান্তে যেতে চাই না

পুলক ঘটক: রেইনট্রি হোটেলের মামলায় বিচারক বলেছেন, ‘ধর্ষণের ঘটনার ৭২ ঘণ্টা পর পুলিশ যেন মামলা না নেয়। কারণ ৭২ ঘণ্টা পর মেডিকেল টেস্ট করা হলে ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায় না। তাতে মামলা প্রমাণ করা দুরূহ হয়ে পড়ে।’ এখানে বিচারকের শেষ কথাটির সঙ্গে আমি একমত। ৭২ ঘণ্টা পর মেডিকেল টেস্ট করা হলে মামলা প্রমাণ করা আসলেই দুরূহ হয়ে পড়ে। কিন্তু এই দুরূহ কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করাই তদন্ত কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা, আইনজীবী এবং বিচার কাজে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের দায়িত্ব। সুতরাং ‘ধর্ষণের ঘটনার ৭২ ঘণ্টা পর পুলিশ যেন মামলা না নেয়’, বিচারকের এই বক্তব্যটি অগ্রহণযোগ্য।

বিচারক বলেছেন, ‘সেদিন ধর্ষণের কোনো ঘটনা ঘটেনি। হোটেলে তারা অভিযুক্তদের সঙ্গে স্বেচ্ছায় শয্যাসঙ্গী হন। সেখানে তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক হলেও জোরপূর্বক ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।’ তার মানে ৭২ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ায় ডিএনএ পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত না পাওয়া সত্ত্বেও ভিকটিম এবং অভিযুক্তদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক হওয়ার বিষয়টি আদালতের সামনে প্রমাণিত হয়েছে। অর্থাৎ ডিএনএ টেস্ট ছাড়াই এ ধরনের অপরাধ আদালতে প্রমাণ করা সম্ভব। সুতরাং বিচারকের নিজের বক্তব্য অনুযায়ী তাঁর ‘৭২ ঘণ্টা পর পুলিশ যেন মামলা না নেয়’ মর্মে যে নির্দেশনা, তা অগ্রহণযোগ্য।
‘আগে থেকেই ভিকটিমরা ফিজিক্যাল রিলেশনে অভ্যস্ত ছিলো। তারা তাদের বয়ফ্রেন্ডদের সঙ্গে ফিজিক্যাল রিলেশনে যান’,- জজের এই বক্তব্যটি মারাত্মক, আপত্তিকর ও অগ্রহণযোগ্য। দেখা যাচ্ছে, বিচারক এই বাক্যে ‘ভিকটিম’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন, তাদের ‘ভিকটিম’ হিসেবে স্বীকার করেছেন এবং অপরাধের দায় ভিকটিম নারীদের ওপরই চাপিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি তাদের ‘অভ্যস্ততা’র কারণে বিচার পাওয়ার অধিকার অস্বীকার করেছেন। তার এই বক্তব্য গ্রহণ করা হলে বিবাহিত নারীরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্বামীদের দ্বারা দিনের পর দিন ধর্ষিত হলে বিচার পাওয়ার অধিকার রাখেন না। আধুনিক সভ্যতা এবং বিদ্যমান আইন অনুযায়ী স্ত্রীর অনিচ্ছা সত্ত্বেও জোরপূর্বক যৌনসম্পর্ক করা ধর্ষণ। একজন যৌনকর্মীকেও তার অনিচ্ছায় আপনি জোর করতে পারবেন না। এটা রেপ। জজের বক্তব্য অনুযায়ী পেশাদার যৌনকর্মীদের ওপর ধর্ষণের মতো জুলুম করা জায়েজ। কারণ যৌনকর্মীরা ‘ফিজিকাল রিলেশনে অভ্যস্ত’।

আলোচিত রেইনট্রি মামলায় ভিকটিম স্বেচ্ছায় অভিযুক্তদের সঙ্গে যৌনমিলনে গেছেন, নাকি বলপূর্বক ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, তা সাক্ষী-প্রমাণের দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান নাও হতে পারে। কিন্তু লক্ষণীয়, এই মামলায় আসামি ছিলেন পাঁচজন। কোনো নারী সম্মতিতে তার বিশ্বস্ত পার্টনারের সঙ্গে মিলিত হতে পারেন, পাঁচজনের সঙ্গে নয়। পাঁচজন প্রত্যক্ষভাবে ইনভলভ্ হলে এটি গ্যাং রেপ- যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। আদালত যখন বলেছেন, ঘটনার দুই ভিকটিম স্বেচ্ছায় সেখানে ফিজিকাল রিলেশনে গেছেন, তাহলে একটি গ্যাংকে কীভাবে দায়মুক্তি দেওয়া যায়? ঘটনায় কার ভূমিকা কী রকম ছিলো তা বিস্তারিত না জেনে এ বিষয়ে নিশ্চিত অভিমত দিচ্ছি না। তবে বিচারক যেমন বলেছেন, ‘তদন্ত কর্মকর্তা প্রভাবিত হয়ে এ মামলায় অভিযোগপত্র দিয়েছেন। ৩৮ দিন পর এসে তারা বললো ‘রেপড হয়েছি’, বিষয়টি তদন্ত কর্মকর্তার বিবেচনা করা উচিত ছিলো’, অনুরূপ ভাষায় ‘বিচারক প্রভাবিত হয়ে এ মামলায় রায় দিয়েছেন’ মর্মে জনমনে সন্দেহ সৃষ্টির কারণ ঘটেছে। বিচারক নিজেই তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে সন্দেহ সৃষ্টির কারণ তৈরি করে দিয়েছেন। এ রকম জজ থাকলে বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হয়। তাই এ ঘটনায় সর্বোচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে গেছে। বিচার বিভাগের প্রতি আস্থা রাখতে চাই। মানুষের ভরসার শেষ ঠিকানা অটুট থাকুক।

সংশোধনী: এই লেখায় গড়ংযরঁৎ জধযসধহ (মসিউর রহমান) যে মন্তব্য করেছেন এবং জজের বক্তব্যের যে রেফারেন্স দিয়েছেন তা আমার কাছে প্রত্যয়যোগ্য বলে মনে হচ্ছে। সুতরাং বিচারকের রায় ভুল এবং তার পর্যবেক্ষণ অপরাধমূলক- এ রকম ধারণা আমি প্রত্যাহার করছি। তবে, ‘৭২ ঘণ্টা পর পুলিশ যেন মামলা না নেয়’ মর্মে আদালতের যে নির্দেশনা তা সঠিক হয়নি বলে আমি এখনো মনে করি। রায়টি পূর্ণাঙ্গ পড়ার আগে সামগ্রিক সিদ্ধান্তে যেতে চাই না। রায়ে কোনো ভুল থাকলে উচ্চ আদালত বিষয়টি দেখবেন বলে আমার বিশ্বাস। বিভিন্ন মিডিয়ায় জজের বক্তব্য যেভাবে আংশিকরূপে এসেছে তা পড়ে সমাজের মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখা মিডিয়ার দায়িত্ব। ফেসবুক থেকে

সর্বাধিক পঠিত