শিরোনাম
◈ লুৎফুজ্জামান বাবর দম্পতির স্বর্ণ ১৪০ ভরি, নগদ ও ব্যাংকে আছে ২০ কোটি টাকা ◈ আটক বিএনপি নেতার মৃত্যু: সেনাসদস্যদের প্রত্যাহার, উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি ◈ টেকনাফে গুলিবর্ষণের ঘটনায় ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব ◈ প্লট দুর্নীতি: হাসিনা, টিউলিপ ও আজমিনার মামলার রায় ২ ফেব্রুয়ারি ◈ সমঝোতা জটিলতায় ১১ দলীয় জোটে উন্মুক্ত আসনের সম্ভাবনা ◈ পুরোনো রাজনীতি বনাম নতুন ব্যবস্থা: বাংলাদেশের সামনে কঠিন নির্বাচন ◈ মক্কার গ্র্যান্ড মসজিদে বাংলাদেশি কর্মীর নিঃস্বার্থ মানবিকতা ভাইরাল, সৌদি কর্তৃপক্ষের সম্মাননা ◈ শিক্ষার লক্ষ্য চাকরির প্রস্তুতি নয়, সৃজনশীল মানুষ গড়া: দক্ষিণ এশীয় সম্মেলনে ড. ইউনূস ◈ ৬৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগে আবেদন শুরু, করবেন যেভাবে ◈ বেনাপোল বন্দরে পাসপোর্টধারী যাতায়াত ১,৫২১ জন, আমদানি–রফতানি ৩০০ ট্রাক

প্রকাশিত : ১৩ জানুয়ারী, ২০২৬, ০১:০১ দুপুর
আপডেট : ১৩ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৫:০০ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

পুরোনো রাজনীতি বনাম নতুন ব্যবস্থা: বাংলাদেশের সামনে কঠিন নির্বাচন

এ মাসের শুরুতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতাকে হত্যা করা হয়েছে ঢাকায়। এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই বর্ষা বিপ্লবের সময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ যুবনেতা শরিফ ওসমান হাদিকেও রাজধানী ঢাকায় হত্যা করা হয়। এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচন সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনগুলোর একটি। সারাদেশে ৩০০টি সংসদীয় আসনের জন্য প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ মানুষ ভোট দেয়ার যোগ্য হবেন। এক দশকেরও বেশি সময় পর এটি হবে বাংলাদেশের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন। একই সঙ্গে এই নির্বাচনের সঙ্গে হবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নিয়ে একটি গণভোট। 

এই সনদটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের একটি রূপরেখা। এর মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মেয়াদের সীমা নির্ধারণ, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক ভোটব্যবস্থা, নির্বাহী ক্ষমতার ওপর শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ এবং সংসদীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া ঠেকাতে বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সনদটি পাস হলে এটি বহু দশক ধরে চলা প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা ও রাজনৈতিক পরিবারতন্ত্র ভেঙে দিতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে মূলত দুটি বড় দলের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তা হলো আওয়ামী লীগ। এর নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্টের কন্যা শেখ হাসিনা। অন্যটি হলো বিএনপি। এর নেতৃত্বে ছিলেন খালেদা জিয়া। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং দেশের ষষ্ঠ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্ত্রী। খালেদা জিয়া ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। বর্তমানে তার ছেলে তারেক রহমান বিএনপির চেয়ারম্যান।

২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে যুব নেতৃত্বাধীন বর্ষা বিপ্লব দেশব্যাপী আন্দোলনে রূপ নেয়। এ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবি ওঠে। বিক্ষোভকারীরা আওয়ামী লীগের ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী নীতি, বৈষম্য এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে অস্বীকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। ওই বছরের আগস্টের শুরুতে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে পালিয়ে চলে যান নয়াদিল্লিতে। এরপর আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়। গত সপ্তাহে বাংলাদেশ পুলিশ শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যার জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করে।

বিপ্লবের পর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের কাজ শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের গত মাসে প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির জয়লাভের সম্ভাবনা বেশি এবং তাদের কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী।

জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী দল এবং অতীতে বিএনপির মিত্র ছিল। ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ সমর্থিত আদালতের রায়ে ধর্মভিত্তিক দল হিসেবে নির্বাচন করার অযোগ্য ঘোষিত হওয়ায় দলটি নিষিদ্ধ হয়। তবে দুই সপ্তাহ আগে জামায়াতে ইসলামী ঘোষণা দেয় যে, তারা জাতীয় নাগরিক পার্টির সঙ্গে জোট গঠন করবে। জাতীয় নাগরিক পার্টি একটি মধ্যপন্থী, বহুত্ববাদী ও ছাত্রনেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল। এই জোটে আরও সাতটি দল যুক্ত হয়েছে।

বিপ্লব ও শেখ হাসিনার দিল্লিতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে অবনতির দিকে গেছে। শেখ হাসিনার সমর্থক হিসেবে বিবেচিত অনেকের ওপর পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে। হাদিকে হত্যার পর এই ধরনের হামলা আরও বেড়েছে। আশঙ্কা বাড়ছে যে, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের ভেতরের উগ্র ও ডানপন্থী শক্তিগুলো এই উত্তেজনাকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারে।

নির্বাচনের পরেও ভারতবিরোধী মনোভাব অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে ভারতের প্রভাব ছিল অত্যন্ত বেশি। এখন ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি পাকিস্তান বাংলাদেশের কাছে জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান বিক্রির সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে বেইজিংয়ের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে। এই সম্পর্কগুলো কীভাবে বিকশিত হয়, তা ভারতের আঞ্চলিক ভূমিকার ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে। চীন ও পাকিস্তান সমর্থিত একটি বাংলাদেশ নয়াদিল্লির জন্য বড় ধরনের কৌশলগত সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশ নিজেকে এ অঞ্চলে একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। ঢাকা আসিয়ানে যোগদানের চেষ্টা করছে এবং পাকিস্তানকে সঙ্গে নিয়ে সার্ক পুনর্জীবিত করার কথাও ভাবছে- যা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও চাপের মুখে ফেলবে। স্বল্পমেয়াদে আসিয়ানের সদস্যপদ পাওয়া কঠিন হলেও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার ব্যাপারে বাংলাদেশ সক্রিয় উদ্যোগ নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে রোহিঙ্গা সংকট সমাধান না হওয়া পর্যন্ত মিয়ানমার বাংলাদেশের আসিয়ান সদস্যপদে বাধা দিতে পারে। নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে ঢাকা এই সংকট মোকাবিলায় নতুন কৌশল নিতে পারে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার রোহিঙ্গা সংকটকে জাতীয় ও পররাষ্ট্রনীতির একটি প্রধান ইস্যু হিসেবে দেখার ইঙ্গিত দিয়েছে। বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী একটি স্বাধীন রোহিঙ্গা রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে অবস্থান নিতে পারে- যা তারা নাকি চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে আলোচনা করেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো চরমপন্থী ও ডানপন্থী মতাদর্শের উত্থান, বিশেষ করে নারী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার প্রশ্নে। দেশে ধর্মীয় অনুশীলন ও ধর্মীয় পরিচয়ের প্রবণতা বেড়েছে এবং আরও রক্ষণশীল ইসলামি ব্যাখ্যা জনপ্রিয় হচ্ছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরও খারাপ হলে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও ধর্মীয় স্থাপনায় ভাঙচুর বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এবং জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে গণভোট বাংলাদেশের জন্য এক সন্ধিক্ষণ। এই প্রক্রিয়া যদি প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চিত করতে পারে, নাকি পুরোনো ক্ষমতার কাঠামোকেই টিকিয়ে রাখে- তা নির্ধারণ করবে দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ। এই নির্বাচনের ফলাফল দেখাবে, গণআন্দোলন সত্যিই টেকসই গণতান্ত্রিক পরিবর্তনে রূপ নিতে পারে কি না। অনুবাদ: মানবজমিন।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়