রাত ৩টা। রোগীটি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। বয়স প্রায় ৮০। পাশে কেবল তাঁর স্ত্রী।
আমি জানতে চাইলাম — বাড়িতে খবর দেওয়া হয়েছে? রোগী তো সন্ধ্যা থেকেই খারাপ ছিলেন, কেউ এল না কেন?
এরপর যে বাস্তবতার মুখোমুখি হলাম, তার জন্য কোনো মানসিক প্রস্তুতি ছিল না।
রোগীর দুই ছেলে—বড়টি সৌদি আরবে, ছোটটি বাড়িতে। বড় ছেলের জোরাজুরিতে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। এই “অপরাধে” ছোট ছেলে একবারও দেখতে এল না। বরং তাকে খবর দিলে সে বলে—
“আমি তো হাসপাতালে নিতে বলিনি—সৌদি থেকে এসে বাবাকে দেখতে বলতে কও!”
জিজ্ঞেস করলাম, আত্মীয়-স্বজন?
স্ত্রী জানালেন—কেউ আসবে না। এখন এলে খরচ পড়তে পারে—সেই ভয়।
রাত ৩টায়, একটি উপজেলা হাসপাতালের ওয়ার্ডে—একজন ষাটোর্ধ্ব নারী, পাশে তাঁর সদ্যপ্রয়াত স্বামীর নিথর দেহ—চেনা কোনো মানুষ নেই। দৃশ্যটা কল্পনাও কঠিন।
তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন—কয়টা বাজে? আজান দিতে আর কতক্ষণ?
বললাম—দুই–আড়াই ঘণ্টা হবে।
তিনি আমার হাত ধরলেন—
“আমাকে হাসপাতাল থেকে বের করে দিয়েন না—সকাল হলেই ভ্যান নিয়ে চলে যাব।”
শোকার্ত নারীটি ঠিকমতো শোকও করতে পারছেন না। কখনো লাশের কাপড় ঠিক করছেন, কখনো দোয়া পড়ছেন, আবার ভাবছেন—একাই কীভাবে লাশ বাড়ি নিয়ে যাবেন!
আমি শুধু মাথায় হাত রেখে বললাম—
“থাকবেন। কোনো সমস্যা নেই।”
ওয়ার্ড থেকে বের হয়ে ৮০ বছরের সেই মানুষের দিকে তাকিয়ে মনে হল—জীবন কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে! মৃত্যুর পর দাফন-কাফনের নিশ্চয়তাও নেই।
আহারে জীবন—
এই জীবন নিয়েই আমরা কত বড়াই করি!
— ড. তপন, ফেইসবুক থেকে নেয়া