শিরোনাম
◈ একপাক্ষিক নির্বাচনের শঙ্কা জামায়াত- এনসিপির, কী বলছে ইসি? ◈ স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে গুলি করে হত্যা: সিসিটিভি ফুটেজে যা দেখা গেল (ভিডিও) ◈ এলপিজি নিয়ে সংকট: বৃহস্পতিবার থেকে বিক্রি বন্ধের হুঁশিয়ারি ব্যবসায়ী সমিতির ◈ জকসু নির্বাচনে শীর্ষ তিন পদেই ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের জয় ◈ বি‌পিএল, সিলেট টাইটান্স‌কে হারিয়ে আবার শী‌র্ষে চট্টগ্রাম রয়‌্যালস ◈ ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার যা করেছেন, চাইলে বাংলাদেশেও করুন, কিন্তু খেলোয়াড় কেন: জম্মু–কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ◈ এবার লিটন দাসের চুক্তিও বাতিল করল ভারতীয় প্রতিষ্ঠান! ◈ বড় বাজারে অর্ডার কম, নতুন বাজারেও ধাক্কা: পোশাক রফতানিতে চ্যালেঞ্জ ◈ এবারের নির্বাচন লাইনচ্যুত রেলকে লাইনে ফেরানোর চেষ্টা: নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ ◈ রাজধানীতে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে গুলি করে হত্যা

প্রকাশিত : ০৬ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৮:৪১ রাত
আপডেট : ০৮ জানুয়ারী, ২০২৬, ১২:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

রাজনীতিতে কদমবুসি: পা ধরা হয়ে উঠেছে আনুগত্যের মাপকাঠি

প্রথম আলো: রাজার পায়ের ধুলার বাজার বরাবরই চড়া। এ কারণে পদধূলি-লোভাতুর লোকের চোখ থাকে রাজার পায়ে।

জুতা আবিষ্কারের আগের আমলে খালি পায়ে বালি লাগায় হবু রাজা বিরক্ত হয়েছিলেন। পায়ে যাতে ধুলা না লাগে, সেই ব্যবস্থা করতে গবু মন্ত্রীকে কড়া হুকুম দিয়েছিলেন। গবু মন্ত্রী ‘হবুর পাদপদ্মে’ কদমবুসি করে কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলেছিলেন—‘যদি না ধুলা লাগিবে তব পায়ে/ পায়ের ধুলা পাইব কী উপায়ে!’

তখন ‘শুনিয়া রাজা ভাবিল দুলি দুলি/ কহিল শেষে, “কথাটা বটে সত্য—।”’

মানে, পায়ের ধুলা মন্ত্রী-সান্ত্রি-চ্যালাব্যালারা নিয়মিত না নিলে তা যে এক পর্যায়ে রাজবশ্যতা-বিচ্যুতির মতো বড় বিড়ম্বনার ব্যাপার ঘটিয়ে দিতে পারে, সেটি রাজা ঠাওর করতে পেরেছিলেন।

হবু রাজা-গবু মন্ত্রীর যুগ অস্ত গেছে। এখন নেতার যুগ। বড় নেতা, মেজ নেতা, সেজ নেতা, রোগা নেতা, মোটা নেতা, আধা নেতা, গোটা নেতা, পাতি নেতা, সিকি নেতার যুগ। হবু রাজার পায়ে আগে ধুলা লাগত। জুতার বদৌলতে নেতাদের পায়ে এখন তা লাগে না। কিন্তু জাতে উঠতে গেলে বড় নেতার পাদপদ্মের পদরেণু আধলা থেকে সিকি নেতার লাগবেই। এ কারণে রাজনীতিতে কদমবুসি কালচার আলসারের মতো বাসা বেঁধে আছে।

সারা জীবনে একবারও মা-বাবার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করেননি—এমন লোকও রাজনীতিতে এসে নেতা থেকে শুরু করে নেতার নাতজামাইকে পর্যন্ত নতজানু হয়ে কদমবুসি করেন। কদমবুসি তাঁর কাছে সামাজিক মূলধন। চাটুকারিতা তাঁর কাছে চরিত্রের বিচ্যুতি নয়, পদোন্নতির পথ। পা ধরা যে দারুণ দরকারি, তা বহুলচর্চিত কদমবুসি কালচার তাঁকে শিখিয়ে দিয়েছে।

দিন কয়েক আগে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে তাঁর দলের কেন্দ্রীয় কমিটির এক নেতা যে কায়দায় কদমবুসি করার কসরত করেছেন, তা বিস্তর বিনোদন দিয়েছে।

আরেক অনুষ্ঠানে পরপর দুজন নেতা একইভাবে তারেক রহমানকে কদমবুসি করার চেষ্টা করেন। কদমবুসির সঙ্গে বয়সের ব্যবধানের বিষয় বিশেষভাবে বিবেচ্য হলেও এই নেতাদের সবাইকেই তারেক রহমানের সমবয়সী বলে মনে হয়েছে।

ভাইরাল ভিডিও চিত্রে উভয় জায়গায় তারেক রহমানকে বিব্রত দেখা গেছে। পদরেণুপ্রার্থীদের হাত তাঁর পায়ে পৌঁছানোর আগেই তিনি পা সরিয়ে নিয়েছেন।

ঘটনা দুটোকে ‘বাদ দেন, তেমন কিছু না’ বলে কেউ উড়িয়ে দিতেই পারেন। কিন্তু ঘটনা হলো, ভরা মজলিশে এই কিসিমের কদমবুসি কালচার যে জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্রের জন্য কী ভয়ানক ব্যাপার হয়ে উঠতে পারে, তা আমরা অতীতে দেখেছি।

যেখানে রাজনীতি হয়ে ওঠে পা–কেন্দ্রিক। নীতি সেখানে নুয়ে পড়ে। নৈতিকতা নীরব হয়। নজরদারি নষ্ট হয়। নেতা যত উঁচুতে বসেন, প্রশ্ন তত নিচে নামে। যে রাজনীতিতে পা ধরাটা সবচেয়ে বড় গুণ হয়ে ওঠে, সেই রাজনীতিতে পায়ে হাঁটার শক্তি সবচেয়ে কম হয়
রাজনৈতিক কদমবুসি সংক্রামক রোগবিশেষ। এ রোগ শরীর থেকে শরীরে ছড়ায় না, ছড়ায় মন থেকে মনে। ব্যক্তিগত চর্চা দিয়ে এর শুরু। তবে খুব দ্রুত এটি সমষ্টিগত আচরণে পরিণত হয়। কারণ, মানুষ কেবল যুক্তিবাদী প্রাণী নয়, সে গভীরভাবে অনুকরণপ্রবণ।

রাজনীতিতে অনুকরণ শিক্ষার বদলে বশ্যতা শেখায়। একজন জুনিয়র নেতা যখন সিনিয়র নেতার পা ধরেন, তিনি তখন শুধু নিজে নত হন না, তিনি অন্যদের সামনে একটি নতুন মানদণ্ড তুলে ধরেন।

কোনো নেতাকে যখন ভরা মঞ্চে তাঁর নিচের সারির কোনো একজন নেতা পা ছুঁয়ে সালাম করেন, তখন সেই নিচের সারির আরও কোনো নেতা তাঁকে একই কায়দায় কদমবুসি করতে পারেন। তাঁর দেখাদেখি আরেকজন করতে পারেন।

তখন ওই সারির যে নেতার কদমবুসি কালচারে বিশ্বাস নেই, তাঁকে অস্বস্তিতে পড়তে হয়। চক্ষুলজ্জায় পড়ে বা বাধ্য হয়ে তাঁকেও কদমবুসি করতে হয়।

তবে একাধিকবার সিনিয়র নেতাদের পা ছুঁয়ে সালাম করার পর তাঁর ভেতরে থাকা অস্বস্তি কেটে যায়।

এরপর নিজ এলাকার জুনিয়র নেতাদের কাছ থেকে একই কায়দার কদমবুসি তিনি আশা করতে থাকেন। তাঁদের মধ্যে কেউ তা না করলে তখন তাঁকে যথার্থ অনুগত অনুসারী মনে করাটা তাঁর জন্য কঠিন হয়।

রাজনীতিতে তখন কদমবুসি আনুগত্যের মানদণ্ড হয়ে ওঠে। অথচ এই ধরনের কদমবুসিতে সম্মান নেই, আছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ।

আসলে পা এবং ধামা—এই দুটোই ধরা প্রথম প্রথম অস্বস্তিকর থাকে। তারপর সহনীয় হয়। তারপর স্বাভাবিক হয়। তারপর প্রত্যাশিত হয়।

ধাপে ধাপে আত্মসম্মান ও নৈতিকতার এই ক্ষয়ই রাজনৈতিক কদমবুসিকে সংক্রামক করে তোলে।

পা ধরাটা একবার স্বাভাবিক হয়ে গেলে অস্বীকার করাটাই হয়ে ওঠে অস্বাভাবিক। এভাবে পা ধরা আর আচরণ থাকে না, তা হয়ে ওঠে সংস্কৃতি।

রাজনীতিতে কুদমবুসির নামে পা ধরার সংস্কৃতি বিনয় দিয়ে শুরু হয়। বিনয় এখানে বীজ, বশ্যতা তার বৃক্ষ, আর ভীরুতা তার ফল।

এখানে ধীরে ধীরে এই ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়—যে প্রশ্ন করে, সে বেয়াদব; যে প্রতিবাদ করে, সে প্রগলভ; আর যে মাথা নুইয়ে পা ধরে, সে সংস্কৃতিমান ও ‘দলবান্ধব’। যে ধরতে চায় না, সে অচিরেই নিজেকে আবিষ্কার করে একা, অবাঞ্ছিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত। তার সামনে তখন দুই পথ—‘হয় পা ধরো, নয় পথ ধরো।’

যাঁর পা ধরা হয়, তাঁর অবস্থাও ধীরে ধীরে বদলায়। প্রথমে লজ্জা, পরে নির্লজ্জতা। প্রথমে সংকোচ, পরে সংগতির খোঁজ।

একসময় তিনি নিজেই ভাবতে শুরু করেন, ‘ওরা যদি আমার পা ধরে, ও ধরছে না কেন?’ এ প্রশ্নের মধ্যেই জন্ম নেয় ক্ষমতার কর্কশতা আর নেতৃত্বের লজ্জাহীনতা।

এটি হলো সেই মুহূর্ত, যেখানে রাজনীতি হয়ে ওঠে পা–কেন্দ্রিক। নীতি তখন নুয়ে পড়ে। নৈতিকতা নীরব হয়। নজরদারি নষ্ট হয়। নেতা যত উঁচুতে বসেন, প্রশ্ন তত নিচে নামে।

যে রাজনীতিতে পা ধরাটা সবচেয়ে বড় গুণ হয়ে ওঠে, সেই রাজনীতিতে পায়ে হাঁটার শক্তি সবচেয়ে কম হয়। শেষ পর্যন্ত যা দাঁড়ায়, তা হলো পা ধরা আর ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় থাকে না। তা হয়ে ওঠে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। ধামা ধরাটা আর সৌজন্য থাকে না, হয়ে ওঠে শর্ত।

রাজনীতিতে তখন নীতির বদলে নতি কাজ করে। আর যে রাজনীতিতে সবাই পা ধরে, সেখানে কেউ দাঁড়িয়ে থাকে না। দাঁড়ানোর মানুষ না থাকলে গণতন্ত্র দাঁড়ায় না।

সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়