প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

লুৎফর রহমান হিমেল: গণমাধ্যমজুড়ে শুধুই শহর, নিরীহ পল্লীর তৃণমূল সেখানে ব্রাত্য

লুৎফর রহমান হিমেল: তখন মফস্বলের কলেজে পড়ি। সেই সময়কার একদিনের কথা। হাইস্কুল পড়ুয়া এক ছেলে এসে দোকানিকে বললো, ‘একটা ইত্তেফাক দ্যান।’ দোকানদার তার কথা বুঝতে পেরে জানতে চাইলো, ‘কোন্ ইত্তেফাক নিবা?’ ছাত্রটি বললো, ‘জনকণ্ঠ।’ তখন যদিও ইত্তেফাক তার দাপট হারাতে শুরু করেছে। সেই জায়গায় জনকণ্ঠ ওঠে আসছে তরতর করে। কিন্তু তাতে কী, পাঠকের মনে তখনো ইত্তেফাক জ্বলজ্বল করছে। যে কারণে পাঠক ততোদিনে পত্রিকার সমার্থক শব্দই বানিয়ে ফেলেছে ইত্তেফাককে। এখন যেমন অনেকে মোটরসাইকেলের জনপ্রিয় ব্রান্ড হোন্ডাকে মোটরসাইকেল বলে থাকে। অথচ হোন্ডা একটি কোম্পানির নাম। আমার সাংবাদিকতা ক্যারিয়ারের শুরুতেও স্থানীয় দুয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ মুরব্বি জানতে চাইতেন, ‘বাবাজি। তুমি কোন্ ইত্তেফাকে কাজ করো? খবর ছাপাইতে কয় ট্যাকা কইরা নেও? এই কইরা তোমাগো সংসার চলে?’ দ্বিতীয় যে প্রশ্নটা, ‘সংবাদ ছাপতে কতো টাকা লাগে’ এটি একান্তই মুরব্বির অজ্ঞতাবশত। প্রকৃত প্রস্তাবে তাদের ধারণা, সংবাদ ছাপার খরচটা এভাবেই সংগৃহীত হয় বোধহয়। আমি তাদের বেশি কিছু না বুঝিয়ে তখন শুধু বলতাম, ঘটনা খবর হওয়ার মতো হলে এমনিতেই সেটি প্রকাশিত হয়। টাকা কড়ি লাগে না। তবে একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে এসে মুরব্বির সেই প্রশ্নটাই নতুন করে ভাবায় আমাদের। কারণ এখন যে বিজ্ঞাপনদাতাদের বাইরেও অনেকে সংবাদ টাকা দিয়েও ছাপাচ্ছে। টাকা দিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিক বা সম্পাদকরা হরহামেশাই জড়িত থাকেন। এমন এক দশায় পৌঁছে গেছে দেশের সাংবাদিকতা।

সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা। সাংবাদিকতাকে বলা হয়, রাষ্ট্রের ৪র্থ স্তম্ভ। যাকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রের উন্নয়ন কল্পনা করা যায় না। একটা সময় ছিলো, মফস্বলের একজন সাংবাদিককে দেখতেও দূরদূরান্ত থেকে লোকজন ছুটে আসতো। শহরের

সাংবাদিকেরাতো আরও বেশি আকর্ষণের জায়গায় ছিলেন। যার কারণে নাটক-সিনেমাতেও বড় সম্মানের অবস্থানে দেখা যেতো সাংবাদিক চরিত্রটিকে। সত্যি সত্যি সম্মানজনক একটি পেশা ছিলো সাংবাদিকতা। কিন্তু আজকের যুগে দেশের সাংবাদিকতা সেই স্থানে আর নেই। মহান পেশাটি আজ কলুষিত। সাংবাদিকতা মহৎ পেশা, এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু পেশাটিকে মহান রাখতে সাংবাদিকদেরও মহান যে হতে হয়, সেটি বোধহয় অনেক সাংবাদিক ভুলে গেছেন। যার কারণে বিড়ম্বনায় পড়ে গেছেন প্রকৃত সাংবাদিকরা। বহু তরুণ এ পেশাটিকে মহান পেশা মনে করে তুখোড় সাংবাদিকতার স্বপ্ন দেখে এখন নিরাশ হচ্ছেন। কেউ রাগে-দুঃখে পেশা ছাড়ছেন। পাঠকরা আর কী করবেন? অপসাংবাদিকতার চর্চা দেখে ফেসবুকে শেয়ার করা সংবাদের কমেন্ট সেকশনে গিয়ে সাংবাদিকদের গালিগালাজ করে নিজেদের ক্ষোভের ঝাল ঝাড়ছেন।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটি সত্যি যে, কিছু অপসাংবাদিকের জন্য সাংবাদিকতার মতো মহৎ পেশার আজ এমন দুর্দশা। টাকার বিনিময়ে সম্পাদকরা সাংবাদিকতার কার্ড ধরিয়ে দিচ্ছেন যাকে-তাকে। যেমন সম্পাদক, তেমন তাদের কর্মীদল এখন। যেন সবাইকে তারা সাংবাদিক বানানোর প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। তারা সর্বত্র বিরাজিত। প্রেসক্লাব থেকে সচিবালয়। গণভবন থেকে বঙ্গভবন। রাজধানী থেকে মফস্বল। এই সাংবাদিক দল অনৈতিক পথে বিপুল টাকা উপার্জন করছেন। সেই টাকায় সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা মর্যাদাপূর্ণ সংঘ-সমিতিতে স্থান করে নিচ্ছেন। প্রভাব তৈরি করছেন। নিজেদের পাহাড়সমান ‘পাপ’ থাকার পরও তাই ওই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না খোদ প্রশাসনও। অবশ্য যে প্রশাসন কর্তা ব্যবস্থা নেবেন তাদের অনেকের চরিত্রও তথৈবচ যে।

সাধারণ মানুষজন জানেন, প্রকৃত সাংবাদিকের আচার-আচরণ, কথাবার্তা শুনলে- দেখলেই বোঝা যায়। চেনা বামুনের পৈতা লাগে না। কিন্তু তারা পৈতা প্রদর্শনের জন্যই যেন প্রতিদিন নিয়ম করে মাঠে নামেন। তারাই একসময় কীভাবে কীভাবে যেন ম্যানেজ করে নেন আমাদের সমাজপতি, পুলিশ-প্রশাসন, রাজনীতিবিদসহ সমাজের উচ্চবিত্তদের। নতুন নতুন পত্রিকাও তারা প্রকাশ করেন। করতে পারেন না কিছু, কিন্তু একের পর এক প্রজেক্ট তারা শুরু করেন। তাদের নয়া মিডিয়ায় নতুন কিছুই থাকে না। ফলে পাঠকও মুখ ফিরিয়ে নেয় একপর্যায়ে। প্রজেক্ট ভেস্তে যায়। দোষ হয় দেশের প্রকৃত সাংবাদিকদের যে, তারা কিছুই জানে না, পারে না। অথচ একসময় মিডিয়া জগতে মেধাবী সম্পাদক ও সাংবাদিকদের বিচরণ ছিলো। রিপোর্টারদের নানা রিপোর্ট তখন আলোচনার ঝড় তুলতো। ছিলো অমিত মেধাবী সহ-সম্পাদক ও কপি এডিটর। তাদের সংবাদ সম্পাদনার মুন্সিয়ানা নিয়ে নানা মহলে আলোচনা হতো। এখনো যে এমন সাংবাদিক-সম্পাদক নেই, তা নয়। কিন্তু তারা ওই নীতিহীন টাকাওয়ালা সাংবাদিকদের কাছে একেবারেই কোণঠাসা। ফলে তারা ভালোবাসার পেশাটি ছেড়ে দিচ্ছেন একে একে।

সাংবাদিকরা যখন তাদের প্রাণের পেশা ছেড়ে দেন, তখন বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে। এটি একটি আশঙ্কার আভাস দেয়। সমাজ ও রাষ্ট্রের অগস্ত্য যাত্রার কথাও মনে করিয়ে দেয় আমাদের। মেধাবীদের সাংবাদিকতা ছাড়ার হিড়িকের মধ্যে এই শঙ্কা আরও বড় মাত্রা পায় যখন অপসাংবাদিকদের সংখ্যা দিনদিন বাড়তে থাকে। ফলে এর প্রভাব পড়ে টোটাল গণমাধ্যমেও। এসব কারণে দিনদিন গণবিচ্ছিন্ন হয়ে যায় দেশের গণমাধ্যম। হচ্ছেও তা-ই। গণমাধ্যম আর এখন গণের মাধ্যম থাকছে না। গণমাধ্যমে তাই মন্ত্রী, এমপি, নেতা, এলিটদের কথাই ঘুরেফিরে আসে। তাদের সাক্ষাৎকার, তাদের তোষণ, তাদের সাফল্যগাঁথা ও তাদের স্বপ্নের কথাই সেখানে থাকে। গণ বা বৃহত্তর জনগোষ্ঠী তথা সাধারণ মানুষ সেখানে অনুপস্থিত। গণমাধ্যমজুড়ে শুধুই শহর। নিরীহ পল্লীর তৃণমূল সেখানে ব্রাত্য। ফলে গণহীন এখন গণমাধ্যম। দুয়েকটা ব্যতিক্রম হয়তো আছে, তবে সেটিকে উদাহরণ বলা যায় না কোনোভাবেই। লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত