প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন: করোনা টিকা: বানরের ওপর ট্রায়াল গবেষণায় নতুন এক মাইলফলক

ড. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন
অতি সংক্রমণশীল ডেল্টাসহ করোনাভাইরাসের সব ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে শতভাগ কার্যকর ‘বঙ্গভ্যাক্স’। এখন পর্যন্ত বিশ্বে করোনাভাইরাসের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টসহ ১১টি ভ্যারিয়েন্ট বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় সক্রিয় ছিলো। আমরা এই ১১টি ভ্যারিয়েন্টের সিকোয়েন্স অ্যানালাইসিস করে আমাদের ভ্যাকসিনের সিকোয়েন্স মিলিয়ে দেখেছি প্রতিটি ভ্যারিয়েন্টের ক্ষেত্রেই বঙ্গভ্যাক্স কার্যকর। যার প্রমাণ মিলেছে বানরের পরীক্ষায়। প্রাথমিক ফলাফলে আমাদের ভ্যাকসিনটি বানরে নিরাপদ এবং কার্যকর অ্যান্টিবডি তৈরি করতে সক্ষম বলে প্রতীয়মান হয়েছে। এরপর আমরা ভ্যাকসিনেটেড বানরে করোনা ভাইরাসের ডেল্টাসহ অন্যান্য ভ্যারিয়েন্ট প্রয়োগ করে চ্যালেঞ্জ স্টাডি করেছি। আমরা দেখতে পেয়েছি, আমাদের ভ্যাকসিনে বানরের দেহে যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে, সেই অ্যান্টিবডি সাত দিনের মধ্যেই করোনা ভাইরাসকে নিউট্রালাইজ করতে পেরেছে। এতে প্রমাণিত হয় আমাদের ভ্যাকসিন অতি সংক্রমণশীল ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টসহ সার্স-কোভ-২ এর যে অন্যান্য ভ্যারিয়েন্ট রয়েছে সেগুলোকেও নিউট্রালাইজ করতে সক্ষম। অতএব, চ‚ড়ান্ত ফলাফলে আমাদের ভ্যাকসিন বানরে সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং শতভাগ কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। বানর আর মানুষের মধ্যে জিনগত বেশ মিল থাকায় আমরা খুবই আত্মবিশ্বাসী যে বঙ্গভ্যাক্স মানবদেহেও অনুরূপভাবে কাজ করবে। তাই উন্নত বিশ্ব করোনা মোকাবেলায় যে নতুন ভ্যাকসিনের কথা বলছেন, আমরা গেব বায়োটেক মনে করি, সেই নতুন ভ্যাকসিনটি হতে পারে বঙ্গভ্যাক্স! কারণ যখন এক বছর আগে প্রথম ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়েছিলো তখন করোনার এতো রূপ আবিষ্কৃত হয়নি। ফলে বর্তমানে প্রচলিত বেশিরভাগ ভ্যাকসিন ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে খুব একটা কার্যকরী ভ‚মিকা পালন করতে পারছে না। এমন অবস্থায় আমরা মন থেকে বিশ্বাস করি, বঙ্গভ্যাক্স টিকা বিশকে এই করোনা সঙ্কট থেকে উদ্ধার করবে।

আমরা সরকারের সহযোগিতা পেয়েছি। যেমন সরকার গঠিত একটি টেকনিক্যাল টিম আমাদের গবেষণাগার পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেছে, পরবর্তী সময়ে ওষুধ প্রশাসন মানবদেহে ট্রায়ালের জন্য বঙ্গভ্যাক্স উৎপাদনের অনুমতি দিয়েছে এবং সরকার এখনো বানরে টিকার ট্রায়ালে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে যাচ্ছে। এতো সহযোগিতা করার পরও শুধু বিএমআরসির অসহযোগিতা কারণে দেশীয় ভ্যাকসিন বঙ্গভ্যাক্স ইস্যুতে সরকারসহ আমরা আজ দেশ-বিদেশে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছি, তাই এই জায়গাটায় সরকারের একটু নজর দেওয়া উচিত। আমরা এ মাসের মধ্যেই বানরে পরীক্ষার রিপোর্ট বিএমআরসিতে জমা দিতে পারবো বলে আশা করছি। যদি বিএমআরসি নৈতিক অনুমতি দিয়ে দেয়, তাহলে আমরা ঔষধ প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে নভেম্বরের শুরুতেই মানবদেহে পরীক্ষা শুরু করতে পারবো বলে আশা করছি।

উল্লেখ্য যে,  ফার্মাসিউটিক্যাল গ্রæপ অব কোম্পানিজ লিমিটেডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বায়োটেক লিমিটেড ২০১৫ সালে দুরারোগ্য রোগ যেমন ক্যান্সার, অটিজম, রক্তস্বল্পতা, আরথ্রাইটিস ও আরও অনেক বিরল রোগ নিরাময়ের জন্য বায়োলজিক্স, নোভেল ড্রাগ এবং বায়োসিমিলার উৎপাদনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন অত্যাধুনিক গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করেছি, যার নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন। ইতোমধ্যে আমাদের গবেষণাগারটি বিদেশি বিজ্ঞানীরা পরিদর্শন করে আন্তর্জাতিক গবেষণাগার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। লিভার গবেষণায় আমাদের একটি আবিষ্কার হিউম্যান জেনোমিক্স জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রে পেটেন্ট করেছি এবং আরও বেশ কিছু যুগান্তকারী আবিষ্কার পেটেন্টের বিবেচনাধীন রয়েছে। এছাড়াও ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (CKD),  ক্যান্সার, আরথ্রাইটিস, অটো ইমিউনো ডিজিজ মোকাবেলায় গেøাব বায়োটেকের নিজস্ব প্রযুক্তিতে প্রস্তুতকৃত মোট ৬টি বায়োসিমিলার ড্রাগ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। গেøাব বায়োটেকের অত্যাধুনিক গবেষণাগার যেকোনো মহামারিতে দেশের স্বার্থে কাজ করতে সদা প্রস্তুত আছে।

আমাদের গবেষণাগারে কর্মরত বিজ্ঞানীদের অন্যান্য ওষুধের পাশাপাশি ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকায়, বিশ্বব্যাপী চলমান করোনা ভাইরাসের প্রকোপে সারা বিশ্বের মানুষ যখন বিপর্যস্ত তখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রয়োজনে আমাদের অন্যান্য গবেষণার পাশাপাশি ‘কোভিড-১৯’ ‘শনাক্তকরণ কিট, টিকা এবং ওষুধ’ আবিষ্কার সংক্রান্ত গবেষণা শুরু করি। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২ জুলাই ২০২০ তারিখে কোভিড-১৯ এর টিকা উদ্ভাবনের ঘোষণা দিই।  বায়োটেক কর্তৃক আবিষ্কৃত mRNA vaccine কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে, যা আমাদের দেশের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। আমরা আমাদের উদ্ভাবিত টিকাটির ‘BANGAVAX’ নামকরণ করেছি। ‘BANGAVAX’ নামের ‘BANGA’ একই সঙ্গে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু (BANGABANDHU) শেখ মুজিবুর রহমান ও বাংলাদেশ (BANGLADESH) এর নামকে প্রতিনিধিত্ব করে।

আমরা আমাদের গবেষণাগারে করোনা ভাইরাসের সম্পূর্ণ জিনোম সিকুয়েন্স করেছি এবং এনসিবিআই ভাইরাস ডেটাবেসে প্রাপ্ত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কোভিড-১৯ এর সকল সিকুয়েন্স বায়োইনফরমেটিক্স টুলসের মাধ্যমে বিশদ পর্যালোচনা করে আমাদের টিকার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি এবং উক্ত টিকা সারা বিশ্বে অধিক কার্যকরী হবে বলে যৌক্তিকভাবে আশা করছি। আমরা আমাদের টিকার টার্গেটের সম্পূর্ণ কোডিং সিকুয়েন্স এনসিবিআই ডেটাবেসে জমা দিয়েছি, যা ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে (accession number: MT676411)। আমরা আমাদের অত্যাধুনিক এনিম্যাল সেন্টারে টিকার পূর্ণাঙ্গ প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন করেছি, যার ফলাফল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বায়ো-আর্কাইভ (bioRxiv) এ প্রকাশিত হয়েছে (https://doi.org/10.1101/2020.09.29.319061)। আমাদের নিবন্ধটি ইতোমধ্যে ৮৫০০ জন বিজ্ঞানী পর্যালোচনা করে খুবই কার্যকরী ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আমাদের এ নিবন্ধটি ইতোমধ্যে বিশ্বের সর্ববৃহৎ পাবলিশার্স এলসেভিইয়ারের ভ্যাকসিন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে (DOI: https://doi.org/10.1016/j.vaccine.2021.05.035) আমরা প্রথমে টিকাটির ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য একটি স্বনামধন্য কন্ট্র্যাক্ট রিসার্চ অর্গানাইজেশনের সঙ্গে কাজ করি এবং তারা আমাদের অত্যাধুনিক গবেষণাকেন্দ্র ও ভ্যাকসিন কার্যক্রম দেখে অত্যন্ত প্রশংসা করেন। কিন্তু তাদের ফেজ-১ ও ফেজ-২ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায়, পরবর্তী সময়ে আমরা ক্লিনিক্যাল রিসার্চ অর্গানাইজেশন লিমিটেডের মাধ্যমে টিকাটির ফেজ-১ ও ফেজ-২ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ইথিক্যাল ক্লিয়ারেন্সের জন্য বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদে ১৭/০১/২০২১ তারিখে প্রটোকলসহ আবেদন করি। বিএমআরসির ইথিক্যাল কমিটি প্রটোকল পর্যালোচনা করে প্রায় শতাধিক বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দিয়ে ০৯/০২/২০২১ তারিখে একটি চিঠি দেন এবং আমরা সকল প্রশ্নের যথাযথ উত্তরসহ সংশোধিত প্রটোকল ও প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ত ১৭/০২/২০২১ তারিখ বিএমআরসিতে জমা দিই। এরপর দীর্ঘ ৫ মাস পর গত ২২/০৬/২০২১ ইং তারিখে বিএমআরসি হতে আমাদের কাছে চিঠি আসে যে, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পূর্বে বানর অথবা শিম্পাঞ্জিতে টিকাটির ট্রায়াল সম্পন্ন করতে হবে। তাই আমরা সঙ্গে সঙ্গে বানরে টিকাটির ট্রায়ালের প্রস্তুতি শুরু করি, এরই মধ্যে ৩০/০৬/২০২১ ইং তারিখে বিএমআরসি থেকে আরও অর্ধশতাধিক বিষয়ে পর্যবেক্ষণসহ একটি চিঠি পাই! এবার দেখার বিষয় সামনে আরও কী শর্ত অপেক্ষা করছে?

আমরা প্রথমে বানরে টিকার ট্রায়ালের জন্য বিদেশে চেষ্টা করেছি, ভারত বলছে জিটুজি পদ্ধতিতে আবেদন করার জন্য, তাই সংশ্লিষ্ট বিভাগে চিঠি দিয়েছি এ ব্যাপারে উদ্যেগ নেওয়ার জন্য কিন্তু কোনো আশানুরূপ রেজাল্ট পাইনি আর উন্নত বিশ্বের দেশগুলো বলছে mRNA টিকার বানরে ওপর পরীক্ষার দরকার নেই কিন্তু বিএমআরসি বলছে করা লাগবে। তাই বাধ্য হয়ে আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুসরণ করে বন বিভাগের অনুমোদন নিয়ে বানর সংগ্রহ করেছি এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ১-৮-২০২১ তারিখ থেকে বানরের ওপর ট্রায়াল শুরু করে ২১-১০-২০২১ তারিখে শেষ করি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম বানরের ওপর ট্রায়াল হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে দেশের বিজ্ঞান গবেষণায় এক নতুন মাইলফলক।
লেখক : জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক, কোয়ালিটি অ্যান্ড রেগুলেটরি, বায়োটেক।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত