প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কাজী তানিম: কুমিল্লায় পূজামণ্ডপে মূর্তির সঙ্গে কোরআন রাখার ঘটনাটি আমার বাসার পাশেই

কাজী তানিম : কুমিল্লায় পূজামণ্ডপে মূর্তির সঙ্গে কোরআন রাখার ঘটনাটি আমার এলাকার। আমার বাসার পাশেই মণ্ডপ। জানালা থেকেই মণ্ডপটি দেখা যায়। এই মণ্ডপেই পবিত্র কোরআন অবমাননা করার অভিযোগ এসেছে। মূর্তির পায়ের কাছে কোরআন শরীফ রেখে পূজা করা হয়েছিলো এমনটাই বলা হচ্ছে। আচ্ছা এমনও তো হতে পারে যে কোরআন শরীফটা কাল রাতেই কেউ সেখানে রেখে গেছে। যখন কেউ ওই মণ্ডপে ছিলো না তখন। দেখেন, সেটা একটা আবাসিক এলাকা। আর এই মণ্ডপটা অস্থায়ী। শুধু দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১০ দিনের জন্য বানানো হয়। পূজা শেষ হওয়ার পরই আবার মণ্ডপ ভেঙে ফেলা হয়। এখানে রাতে মানুষ থাকে না। আর নানুয়া দিঘির পাড়ে রাতে এমনিতেও মানুষ সহজে বাইরে বের হয় না। এমনকি কোনো প্রশাসনের লোকও কাল রাতে মণ্ডপ পাহারা দেওয়ার জন্য সেখানে ছিলেন না। কারণ এই মণ্ডপে কখনো কোনো সমস্যা হয়নি। তবে কাল রাতে (মঙ্গলবার) কয়েকবার পুলিশের গাড়ি এসে পুরো এলাকা ঘুরে গেছে। এক জায়গায় কয়েকজন ছেলেকে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় দেখলেই জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। হয়তো প্রশাসনের আগে থেকে কিছু ধারণা ছিলো। কারণ এর আগে এতো বছরে কখনোই এই এলাকার পূজায় পুলিশ আসেনি।

ধারণা থাকলে রাতে কেন পুলিশ মণ্ডপ পাহারা দেয়নি সেটাও একটা প্রশ্ন। কাল রাতে পূজামণ্ডপ খালি ছিলো সম্পূর্ণ। রাত প্রায় ৩-৪টার দিকেই মণ্ডপ খালি করে সব বাতি নিভিয়ে দেওয়া হয়। সকালে পূজা শুরু হওয়ার আগেই কোরআন শরীফটা এলাকাবাসীর নজরে পড়ে। শোনা যায় তখনো পুরোহিত আসেননি। পুরোহিত আসার পর পুরোহিত নিজে অনুরোধ করেছেন যাতে এই কোরআন শরীফটা সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু এলাকাবাসী সেটা না করে প্রশাসনকে খবর দিয়ে পূজাই বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। পরবর্তী সময়ে কুমিল্লার ওসি সাহেব এসে কোরআন শরীফটি সেখান থেকে সরান। এরপর পূজা কমিটি এবং প্রশাসনের বৈঠক বসে। যেখানে প্রশাসন থেকে বলাও হয় যেন পূজা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু হিন্দুরা সেটায় বাধা দেয় এবং পূজা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্ট করে। এরপরই প্রথমে বাইরে থেকে লোকজন এসে উত্তেজনা বাড়ায়। উত্তেজনার একপর্যায়ে সেখানে পুরো মণ্ডপ ভাঙা হয়, প্রতিমা ভেঙে দিঘিতে ফেলে দেওয়া হয়, এরপর যেই হিন্দুকেই সামনে পাওয়া যায় তার ওপরই চড়াও হয় উত্তেজিত জনতা। সেখানে কিছু মানুষ আহতও হয়। এরপর পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য ব্যবস্থা নিয়েছে।
এই মণ্ডপটিতে হিন্দুদের থেকে মুসলিমরা বেশি যায়। বছরের পর বছর ধরে আমাদের এলাকায় হিন্দু-মুসলিম একসঙ্গে মিলেমিশে থাকে। পূজায় হিন্দু-মুসলিম একসঙ্গে আনন্দ করে। কখনো কোনো সমস্যা হয়নি। এলাকায় বিপুল পরিমাণে হিন্দু লোকজন বসবাস করে। যাদের বেশিরভাগই স্থানীয়। সবাই একসঙ্গে বসবাস করে। আর সেটাই কিছু মানুষের সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে উসকে দিয়ে ফায়দা লুটাই ছিলো উদ্দেশ্য। ইচ্ছা করে এই কাজটা করা হয়েছে দুই সম্প্রদায়কে আলাদা করার জন্য।

বড় কোনো ষড়যন্ত্রের পূর্বাভাস মনে হচ্ছে। আর কোরআন শরীফটা রাখাও হয়েছিলো এমনভাবে যেন সবার চোখে পড়ে। একদম সামনের দিকে হনুমান মূর্তির কোলের ওপর। আর পূজার জন্য তৈরি করা মূর্তির ওপর কোরআন রাখা হয়নি। পূজার মূর্তি মণ্ডপের ভেতরে ছিলো। সেটায় কারও প্রবেশ করার সুযোগ ছিলো না। মণ্ডপের বাইরের দিকে রাস্তার পাশে দর্শনের জন্য রাখা আলাদা মূর্তি রাখা হয়েছিলো। যেটার কাছে যে কেউ যেতে পারবে। এমনও তো হতে পারে লোকচক্ষুর অন্তরালে কেউ সেখানে মূর্তিটি রাখে। হিন্দুরা তো এতো বলদ নয় যে এভাবে কোরআন রাখবে। তারা স্বেচ্ছায় কেন নিজেদের পূজা নষ্ট করতে চাইবে? এটা একটা মুসলিম প্রধান দেশ। এ দেশে পবিত্র কোরআন অবমাননা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না সেটা তাদেরও জানার কথা। এটা যে কেউ ইচ্ছা করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর উদ্দেশ্যে করেছে সেটা সহজেই বোঝা যায়। কিন্তু ক্ষেপা পাবলিককে সেটা বুঝবে কে। তারা একটার পর একটা গুজব ছড়িয়েই যাচ্ছে। কোরআন শরীফ নাকি দুর্গার পায়ের নিচে রাখছে, কোরআন রেখে পূজা হয়েছে, পুরোহিতকে বলার পরও পূজা বন্ধ হয়নি। এগুলো বলে বলে মানুষকে আরও বেশি উসকে দিচ্ছে। অথচ কালকে রাতের পর এখানে আর পূজা হয়নি।

সকালের পরিস্থিতি যেমন ছিলো প্রশাসন যদি শক্ত না হতো তাহলে রামু ট্র্যাজেডির মতো ভয়াবহ কিছু হতে পারতো। প্রশাসনের আন্তরিক চেষ্টার জন্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সম্ভব হয়। পুরো বিষয়টা ভালোভাবে তদন্ত করে দেখা উচিত। এর পেছনে যেই থাকুক তার বিচার দাবি করছি। যদি কোনো হিন্দু এই কাজ করে থাকে তাহলে তার বিচার হোক। কিন্তু একজনের দোষের জন্য পুরো সম্প্রদায়কে দোষী করা কোনোভাবেই ঠিক নয়। ইসলাম আমাদের এই শিক্ষা দেয় না। এই বাংলাদেশ সবার। এখানে সবাই শান্তিতে থাকবে সেটাই সবার চাওয়া। যেই এই কাজের সঙ্গে জড়িত তার আসল উদ্দেশ্য ছিলো এলাকার এতো বছর ধরে চলে আসা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করা। তার উদ্দেশ্য যেন কোনোভাবেই সফল না হয়। এলাকার সকল মুসলিম ভাইদের কাছে অনুরোধ তারা যেন হিন্দু পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। আর প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করছি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িদের দ্রুত খুঁজে বের করে বিচারের ব্যাবস্থা করা হোক। বাংলার বুকে ইসলামের অপমান যেমন কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না, ঠিক তেমনিভাবে কোনো নির্দোষ মানুষ যেন শাস্তি না পায় সেটাও লক্ষ্য রাখতে হবে আমাদের সবার। কধুর ঞধহরস- র ফেসবুক ওয়ালে লেখাটি পড়ুন।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত