প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডা. লেলিন চৌধুরী: ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট, ভীতিকর সংক্রমণ ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা

ডা. লেলিন চৌধুরী: করোনাভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ধরন বদলায় বা রূপান্তরিত হয়। এসব রূপান্তরের অধিকাংশই তেমন কোনো গুরুত্ব বহন করে না। কিন্তু যেসব রূপান্তরের কারণে সংক্রমণের গতি, প্রকৃতি ও বিস্তৃতিতে প্রণিধানযোগ্য পরিবর্তন আসে সেগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন নামে চিহ্নিত করা হয়। করোনাভাইরাসের প্রণিধানযোগ্য রূপান্তরকে ভ্যারিয়েন্ট বলা হয়। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে করোনাভাইরাসের একটি রূপান্তর ঘটে। এর মধ্য দিয়ে ভাইরাসটির সংক্রমণক্ষমতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটির নামকরণ করে ‘ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট’। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় চার হাজার তিনশ কিলোমিটার। অনিবার্যভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট বাংলাদেশে প্রবেশ করে। প্রথমে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট দ্বারা আক্রান্ত হয়। পরে সেটা কেন্দ্রীয় অঞ্চলের দিকে ধেয়ে আসতে থাকে। ইতোমধ্যে রাজধানী ঢাকার চারপাশের জেলাগুলোকে লকডাউনের অধীনে আনা হয়েছে। এর আগে সীমান্তবর্তী অনেক জেলা, উপজেলা এবং এলাকায় সরকার লকডাউন আরোপ করেছে। কিন্তু তারপরেও ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের করোনাকে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। বাংলাদেশে লকডাউন শব্দটি গুরুত্ব হারিয়েছে। করোনাভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়। লকডাউনের মাধ্যমে জনচলাচল নিয়ন্ত্রণ করে মানুষ থেকে মানুষের শারীরিক দূরত্ব তৈরি করা হয়। ফলে সংক্রমণের ধারাবাহিকতায় ছেদ ঘটে। এসময় লকডাউনকৃত অঞ্চলে ব্যাপকভাবে করোনার টেস্ট করা হয়। এর দ্বারা ভাইরাসবাহী মানুষদের শনাক্ত করে চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কোনো পরিবারে একজন শনাক্ত হলে সেই পরিবারটিকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়। লকডাউনকৃত অঞ্চল থেকে সংক্রমণমুক্ত এলাকায় সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ রাখা হয়। এতে নতুন নতুন এলাকায় ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া রোধ করা যায়। এখন পর্যন্ত এরকম লকডাউন বাংলাদেশে আরোপ করা যায়নি।

করোনাকালীন সতর্কতা জারি করে পুরো সীমান্তকে সিলগালা করা দরকার ছিলো। আমরা সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছি। সীমান্তবর্তী বিভিন্ন স্থানে লকডাউন দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়নে যথেষ্ট শিথিলতা ছিলো। প্রথমে ভারত থেকে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের ভাইরাসের প্রবেশ রোধে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দেখা গিয়েছে, মানুষ অবৈধ পথে যাতায়াত করেছে। তাদের মাধ্যমে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের ভাইরাস বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। করোনাকালীন সতর্কতা জারি করে পুরো সীমান্তকে সিলগালা করা দরকার ছিলো। আমরা সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছি। সীমান্তবর্তী বিভিন্ন স্থানে লকডাউন দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়নে যথেষ্ট শিথিলতা ছিলো। ফলে সংক্রমিত অঞ্চল থেকে ভাইরাস বহন করে মানুষ সংক্রমণমুক্ত অঞ্চলে চলে গিয়েছে। যেমন লকডাউনকৃত চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে লকডাউন চলা অবস্থায় ত্রিশজন মানুষ সিলেট অঞ্চলে চলে যায়। শরীরে উপসর্গ থাকায় তাদের করোনা টেস্ট করা হয়। ত্রিশজনের মধ্যে বারো-তেরোজনের শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। নানাধরনের পরিবহন ব্যবহার করে লোকজন তাদের চলাচল অব্যাহত রাখে। অন্যদিকে লকডাউনকৃত অঞ্চলে করোনা টেস্ট বাড়ানোর প্রাতিষ্ঠানিক কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। ফলে ভাইরাস আক্রান্ত বিপুলসংখ্যক মানুষ টেস্টের বাইরে থেকে যাচ্ছে। এইভাবেই সীমান্ত অঞ্চল থেকে করোনা রাজধানীর দিকে ধাবিত হয়েছে। লকডাউন বা বিধিনিষেধের বেশিরভাগ কাগুজে প্রজ্ঞাপনে পরিণত হয়েছে। যদিও কিছু জায়গায় সত্যিকার অর্থে বেশ কাজ হচ্ছে। ইতোমধ্যে অতি আক্রান্ত স্থানের হাসপাতালে সাধারণ শয্যা ও আইসিইউ শয্যা পূর্ণ হয়ে গিয়েছে। এরমধ্যে গোদের উপর বিষফোঁড়া হলো, নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনের আয়োজন করেছে। নির্বাচন মানেই মিটিং, মিছিল, সমাবেশ, জনসমাগম ইত্যাদি। ফলে করোনা বিস্তৃতির অতি অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

সারাদেশে প্রতিদিন শনাক্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এমতাবস্থায় স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে দেশ একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিদ্যমান বাস্তবতা সর্বতোভাবে সেটাই নির্দেশ করছে। করোনার কারণে আমরা কি একটি মানবিক বিপর্যয়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছি? করোনা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের তিনটি দেয়াল। প্রথম দেয়াল হচ্ছে, মাস্ক পরা ও স্বাস্থ্যবিধি মানা, চূড়ান্ত দেয়াল হলো করোনার টিকা এবং মধ্যবর্তী দেয়াল হচ্ছে টেস্ট, সংস্পর্শ-শনাক্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণ। ব্যবস্থা গ্রহণ বলতে কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন ও চিকিৎসাকে বোঝানো হয়। টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে আমরা দূরদর্শিতার স্বাক্ষর রাখতে সমর্থ হইনি। এখন এটা নিশ্চিত যে, আমরা খুব দ্রুত করোনার টিকা পাচ্ছি না। তাই টিকার বিষয়টিকে আপাতত আলোচনার বাইরে রাখতে হচ্ছে। জনসংখ্যার তুলনায় আমাদের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা অপ্রতুল। তাই আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা দিয়ে পরিস্থিতির মোকাবিলা সম্ভব নয়। পৃথিবীর কোনো দেশই এটা করতে সমর্থ হয়নি।

টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে আমরা দূরদর্শিতার স্বাক্ষর রাখতে সমর্থ হইনি। এখন এটা নিশ্চিত যে, আমরা খুব দ্রুত করোনার টিকা পাচ্ছি না। তাই টিকার বিষয়টিকে আপাতত আলোচনার বাইরে রাখতে হচ্ছে। আমাদের সামর্থ্য আছে টেস্টের সংখ্যা বাড়ানোর। কিন্তু কোনো ব্যাখ্যাতীত কারণে দেশে করোনার টেস্ট সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে না। এখনো দেশের বেশিরভাগ অঞ্চলে টেস্টের জন্য মূল্য নেওয়া হয়। নমুনা সংগ্রহের বুথের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক অনেক কম। মফস্বল এলাকায় টেস্ট করা অত্যন্ত সময় সাধ্য ও ব্যয়সাধ্য ব্যাপার। অনেককে চৌদ্দ-পনের কিলোমিটার দূরে গিয়ে নমুনা দিতে হয়। বুথ বাড়ানোর কোনো প্রয়াস নেই। মাস্ক পরা ও স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়টিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি। প্রজ্ঞাপন, আলোচনা ও জনসাধারণকে দোষারোপের বাইরে এক্ষেত্রে তেমন কোনো কাজ করা হয়নি। করোনা প্রতিরোধে সফলতা অর্জনের প্রধান কৌশল হলো জনসম্পৃক্ততা বা জনসাধারণকে যুক্ত করা। এই কাজটি বাংলাদেশে করা হয়নি। প্রশাসনিকভাবে করোনা নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের কাজ চলছে। ফলে প্রজ্ঞাপন নির্ভরতা বাড়ছে। একইসাথে জনগণ থেকে প্রশাসনের দূরত্ব ক্রমশ বেড়ে চলছে। আমাদের প্রত্যাশা ছিল সরকার প্রতিটি পাড়া মহল্লা এলাকায় একটি গণতদারকি কমিটি গড়ে তুলবে। জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগে এলাকার মান্যবর একজনকে কেন্দ্র করে এই কমিটি হবে। সেখানে ওই এলাকার সামাজিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দকে যুক্ত করা হবে। তরুণদের নিয়ে স্বেচ্ছাসেবী টিম করা হবে। তারা নির্বাচনের সময়ের মতো প্রতিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাস্ক পরার কথা বলবে। একই সঙ্গে জানিয়ে দিবে মাস্ক ব্যতীত কাউকে বাড়ির বাইরে আসতে দেওয়া হবে না। নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ধোয়া যায় এরকম কাপড়ের মাস্ক বিনামূল্য দেওয়া হবে।

সরকার নিজে মাস্ক কিনতে পারে। অথবা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে মাস্ক দিন, মানুষের জীবন বাঁচান এমন আহ্বান জানানো যেতে পারে। এতে দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক,বীমাসহ সমাজের সচ্ছল মানুষ নিশ্চয় সাড়া দিবে। কোটি কোটি মাস্ক জোগাড় হবে। স্বেচ্ছাসেবীদের দ্বারা এসব মাস্ক বিতরণ করা হবে। এতে লোকজন মাস্ক পরার দায়িত্ব অনুভব করবে। তখন পুলিশও ব্যবস্থা নিতে পারবে। পরিস্থিতি যেদিকে গড়াচ্ছে এরকম উদ্যোগ এখন নিতেই হবে। করোনার এরকম বিপদজনক অবস্থায় দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম হতাশাজনক। বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগ ব্যতীত দলগুলো করোনা প্রতিরোধে ঝাঁপিয়ে পড়েনি। কোনো দলের নিয়মিত কোনো কর্মসূচি নেই। খুব ভালো হতো যদি এসময় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ‘বঙ্গবন্ধু ভলান্টিয়ার্স’, বিএনপি ‘জিয়া ভলান্টিয়ার্স’, জাতীয় পার্টি ‘পল্লীবন্ধু ভলান্টিয়ার্স’, কমিউনিস্ট পার্টি ‘রেড ভলান্টিয়ার্স’, জাসদ ‘গণ ভলান্টিয়ার্স’ এবং অন্যান্য দল তাদের স্বেচ্ছাসেবী টিম গঠন করে মানুষের পাশে দাঁড়াতো। এর দ্বারা তারা মানুষকে মাস্ক পরতে, টেস্ট করতে সাহায্য করতে পারতো। অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুর পরিবারগুলোকে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে তাদের সহযোগিতা করতে পারতো। ধেয়ে আসা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের স্রোতকে আটকাতে ব্যর্থ হলে দেশে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বহু বহু গুণ বেড়ে যেতে পারে। সেই দুঃসহ বেদনাদায়ক অবস্থা প্রতিরোধে সবাইকে হাত লাগাতে হবে। লেখক : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

সর্বাধিক পঠিত