প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

খুজিস্তা নূর-ই নাহারিন: ‘যৌনতা’ নিয়ে প্রপার এডুকেশন বা খোলামেলা আলোচনার সুযোগ না থাকায় যে সংকট তৈরি হয়

খুজিস্তা নূর-ই নাহারিন : আমাদের সমাজে ‘যৌনতা’ ভীষণ নিষিদ্ধ একটি শব্দ, যেই শব্দ উচ্চারণেই যেন পাপ আর পঙ্কিলতা। অথচ জীবনের মূল সূতিকাগার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের মূল রহস্য নিহিত আছে নিষিদ্ধ এই শব্দটিতে। প্রপার এডুকেশন বা খোলামেলা আলোচনার সুযোগ নেই বলেই ছোট্ট ছোট্ট ছেলে-মেয়েরা ইভটিজিং, রেপ বা ধর্ষণের শিকার হয়ে অনেক সময় নীরবতা অবলম্বন করে সেই অন্যায়কে আরও উসকে দিচ্ছে। আর অন্যায়কারীরা একের পর এক অন্যায় করে পার পেয়ে যাচ্ছে সহজেই। স্কুল, কলেজ, বিশ^বিদ্যালয়ে কিছু ছেলে থাকে ফেমিনিন অর্থাৎ খানিকটা মেয়ে সদৃশ। ভাব-ভঙ্গিতে কোথায় যেন খানিকটা মেয়েলি ছাপ। সমস্যার শুরু বয়ঃসন্ধিতে। হয়তো হরমোনাল কোনো সমস্যা কিংবা এমনিতেই এরকম কিন্তু বন্ধুরা তা মানবে কেন। তাদের কৌতূহলের অন্ত নেই। নানা কথায় ট্রল করে ক্ষান্ত হয় না কাপড় খুলে দেখতে হবে।
নিরুপায় কোমল চেহারার ছেলেটি কোএডুকেশনে মেয়েদের সঙ্গে মিলে মিশে থাকার চেষ্টা করে, আশ্রয় খোঁজে। মেয়েরা খানিকটা অস্বস্তিতে ভুগলেও ছেলেটির প্রব্লেম ঠিকই বুঝতে পারে, তার প্রতি সহমর্মী হয় কারণ উভয়ের ক্ষেত্রে সমস্যা একই। কিন্তু বাঁধ সাধে পুরুষ টিচার। একজন ছেলে সারাক্ষণ এতোগুলো মেয়েদের দলে থাকে কেন? ছেলেটি নিশ্চয়ই লম্পট, চরিত্রহীন। বাবা-মাকে ডেকে অপমান করে বিচার দেয়। বাবা-মা বিভ্রান্তিতে ভোগেন। তারা নিজের ছেলেকে শাসন করে মেয়েদের সঙ্গে মিশতে নিষেধ করেন, কিন্তু ছেলের অসহায়ত্ব কান্না তাদের দৃষ্টি গোচর হয় না।
মা-বাবা সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্যান্য ছেলে সহপাঠীদের বাসায় ডাকেন। তাদের আলাদা রুমে আড্ডা মারার ব্যবস্থা করে দেন আর কোমল ছেলেটির সর্বাঙ্গে তাদের নোংরা হাত আকুপাকু করে কী যেন খুঁজে। সবাইকে বিদায় জানানোর পর ছেলেটি লম্বা সাওয়ার নেয়, পুরো শরীর সাবানের ফেনায় বার বার ঘষতে থাকে। পানির সঙ্গে ছেলেটির চোখের জল মিলে মিশে একাকার কিন্তু জানা কিংবা বুঝার কেউ নেই। না পরিবার বুঝে, না সমাজ বুঝে, না স্কুল বুঝে।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা এই পরিবেশে ক্লান্ত হয়ে পড়াশোনায় অনীহা প্রকাশ করে। স্কুল কিংবা সামাজিক কোনো অনুষ্ঠানে যেতে অনাগ্রহ দেখায়। সবসময় একা থাকতে চায়। কেউ কেউ আবার জয়ী হয়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন নিষিদ্ধ এই বিষয়গুলো কেন উত্থাপন করছি। একবার ভেবে দেখুন তো এই সন্তানটি যদি আপনার আপন কেউ হতো? দুটি ভিন্ন সময়ে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে দেখেছি। নাম করা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে আমার ছেলে এবং মেয়ের ক্লাসে ঠিক এই বর্ণনার দুটি ছেলেকে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর মোলেস্ট হতে দেখেছি, তাদের পিতামাতা এবং সন্তানের আকুতি ভরা মুখ দেখেছি। সেই সময়ে বুঝার, প্রতিবাদ করার সাহস এবং ক্ষমতা কোনোটাই আমার ছিলো না।
এই বয়সে এসেও যদি না বলতে পারি, আজীবন এই কাহিনী ঘটতেই থাকবে। নিরীহ কারো ওপর সংঘটিত অন্যায় দেখেও চুপ থাকাকে পাপ বলে মনে করি। অন্তত একটি ছেলে যদি রেহাই পায় নিরাপদ সুস্থ পরিবেশে বেড়ে ওঠতে পারে সেই আশায় সবাইকে সচেতন করা। যে কোনো জন্ম লজ্জার নয়, বিধাতার ইচ্ছার ফসল। তাকে বুঝুন, তার সীমাবদ্ধতাকে বুঝার দায়িত্ব পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং কর্মক্ষেত্রের সকলের। লজ্জা, ট্রল,ব্যাঙ্গ বিদ্রুপ নয়, তাদের প্রতি সদয় আচরণ করি। তারাও মানুষ। মানুষের মর্যাদা আর সম্মান পাওয়া তাদের অধিকার।

ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত