প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডা. মামুন আল মাহতাব: লিভারের চর্বিকে কখন আমরা ফ্যাটি লিভার বলবো, ফ্যাটি লিভার মানেই কি বিনা মেঘে বজ্রপাত?

অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল) : ১০ জুন, আর্ন্তজাতিক বঙ্গবন্ধু ন্যাশ দিবস ২০২১। বিশ্ব যখন কোভিড অতিমারিতে ব্যতিব্যস্ত, তখন অজান্তেই আড়ালে চলে গেছে অন্য প্যান্ডেমিকটি, যা পৃথিবীব্যপি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে গত বেশ কয়েক দশক ধরে। ধারণা করা হয়, পৃথিবীর ১৫ শতাংশের মতো মানুষ এই ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত, যার থামা-থামির কোনো লক্ষণ অপাতত আমাদের সামনে দৃশ্যমান নয়। জটিল সব অংক, বিজ্ঞানের ভাষায় যার নাম, ম্যাথেমিটিক্যাল মডেলিং, বলছে ২০৩০ নাগাদ কমার বদলে ফ্যাটি লিভার বিশ^ব্যাপী বৃদ্ধি পাবে ৬০ শতাংশের মতো। বাংলাদেশও এর কোনো ব্যতিক্রম ঘটছে না। একটা সময় ছিলো যখন হেপাটাইটিস বি-ভাইরাস ছিলো এদেশে লিভার সিরোসিস আর লিভার ক্যান্সারের মতো লিভারের জটিল যতো রোগের এক নম্বর কারণ, এখনো তাই। পরিবর্তনের ছোঁয়াটা লেগেছে দ্বিতীয় স্থানটিতে। হেপাটাইটিস সি-ভাইরাসকে হটিয়ে এখন এই জায়গাটি ফ্যাটি লিভারের দখলে।

প্রশ্ন দাঁড়ায় লিভারের চর্বিকে আমরা কখন ফ্যাটি লিভার বলবো আর ফ্যাটি লিভার মানেই কি বিনা মেঘে বজ্রপাত কিনা? লিভারে এমনিতেও অল্প-স্বল্প কিছু চর্বি জমা থাকে। আর শরীরের প্রয়োজনে সেই সব চর্বি থেকে শরীরকে শক্তির যোগান দেয় লিভার। কিন্তু বাংলায় যেমনটি বলে, ‘বেশি ভালো, ভালো না’, ঠিক তেমনি বাড়তি চর্বিও লিভারের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর লিভারে বাড়তি চর্বি যেমন জমতে পারে অতিরিক্ত শর্করা বা চর্বি জাতীয় খাবার খেলে, তেমনি চর্বি জমতে পারে যারা মেদবহুল তাদেরও লিভারে। পাশাপাশি ডায়াবেটিস, ডিজলিপিডিমিয়া, হইপোথাইরয়ডিজম, পলিসিস্টিক ওভারি আর হেপাটাইটিস সি আক্রান্ত রোগীদের লিভারেও চর্বি জমে। আর এই যে যাদের লিভারে জমলো বাড়তি চর্বি, অর্থাৎ যারা ফ্যাটি লিভারের রোগী, তাদের সবার না হলেও কারও কারও লিভারে ওই বাড়তি চর্বির জন্য দীর্ঘ মেয়াদে প্রদাহ বা ক্রনিক হেপাটাইটিস দেখা দিতে পারে, যার গালভরা নাম ‘নন-এ্যালকোহলিক স্টিয়াটোহেপাটাইটিস’, সংক্ষেপে ‘ন্যাশ’। এই ন্যাশের রোগীদেরই কারো কারো লিভার একটা সময় পুরোপুরি অকেজো হয়ে যায়, যাকে আমরা লিভার সিরোসিস বলি। আর যাদের লিভার সিরোসিস হয়, তাদের কারো কারো হতে পারে লিভারে ক্যান্সারও।

ফ্যাটি লিভারের সবচাইতে কার্যকর বা ধ্বনন্তরী চিকিৎসাটির নাম ‘লাইফ স্টাইল মডিফিকেশন’ বা ‘যাপিত জীবনযাত্রার পরিবর্তন’। অতিরিক্ত শর্করা আর চর্বি জাতীয় খাবারগুলো না খেয়ে আর পাশাপাশি সপ্তাহে অন্তত পাঁচটি দিন আধ ঘণ্টা করে হেঁটে আমরা আমাদের লিভারটাকে ফ্যাটমুক্ত রাখতে পারি। পাশাপাশি যেসব রোগের কারণে লিভারে জমে অতিরিক্ত চর্বি সেসব রোগেরও চিকিৎসা করতে হবে। সঙ্গে ব্যবহার করা যায় ওবিটাকলিক এসিড, পায়োগ্লিটাজোন, ভিটামিন ই, ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিডের মতন ওষুধগুলো, যেগুলো রোগ আর রোগীর অবস্থা ভেদে ভালোই কাজ করে। আর চিকিৎসার আগে যেহেতু রোগ নির্নয়টা জরুরি, তার জন্য একটা ভালো এবডোমিনাল আল্ট্রাসাউন্ড আর ফাইব্রোস্ক্যান খুবই কার্যকর।
তবে মনে রাখতে আর দশটি রোগের মতোই ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রেও চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। আর এর জন্য চাই জনসচেতনতা। বলাই বাহুল্য আমরা বারবার মার খেয়ে যাই এই জনসচেতনতার জায়গাটায় এসে এবং এই কথাটি শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয় বরং সাড়া বিশে^র বেলাতেই প্রযোজ্য। এই প্রেক্ষাপটে ২০১৮ সালের ৫ জুন গ্লোবাল লিভার ইন্সিটিটিউটের উদ্যোগে সাড়া বিশ্বের ১৫০ জন লিভার বিশেষজ্ঞের স্বাক্ষরিত একটি প্রেস রিলিজ ওয়াশিংটন, প্যারিস ও লন্ডন থেকে একযোগে প্রচারের মাধ্যমে ‘আন্তর্জাতিক ন্যাশ দিবসের’ যাত্রা শুরু। বাংলাদেশ থেকে ডা. শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর আর আমার সুযোগ হয়েছিলো এই ১৫০ জনের দুজন হয়ে এই প্রেস রিলিজটিতে স্বাক্ষর করার।

সেই থেকে প্রতি বছর বিশে^র অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এসোসিয়েশন ফর দ্য স্টাডি অব লিভার ডিজিজেজ বাংলাদেশ, বিএসএমএমইউ হেপাটোলজি এ্যালমনাই এসোসিয়েশন আর ফোরাম ফর দ্যা স্টাডি অব দ্য লিভার বাংলাদেশের মতো লিভার বিশেষজ্ঞদের মূলধারার পেশাভিত্তিক এবং সামাজিক সংগঠনগুলো নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ন্যাশ দিবস পালন করে আসছে। উদ্দেশ্য আর কিছু না, মানুষকে লিভারের এই নিরব ঘাতকটি সম্বন্ধে আরেকটুখানি সচেতন করে তোলা। গত বছরের মতো এ বছরও এই দিবসটি মুজিব বর্ষে পরেছে। আমাদের অনুরোধে সাড়া দিয়ে গ্লোবাল লিভার ইন্সটিটিউট এদেশে এই দিবসটি বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক ন্যাশ দিবস হিসেবে উদযাপনে সাদরে সম্মতি দিয়েছে। সম্মতি পাওয়া গেছে জাতির পিতার জন্ম শতবার্ষিকী বাস্তবায়নে গঠিত জাতিয় কমিটিরও। এদেশে লিভার বিশেষজ্ঞরা ‘বঙ্গবন্ধুর আন্তর্জাতিক ন্যাশ দিবস’ উদযাপনের মাধ্যমে দিবসটির মূল প্রতিপাদ্যটি একদিকে যেমন আরো ভালোভাবে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে ছড়িয়ে দিতে চায়, তেমনি জাতির পিতার শতবার্ষিকীতে তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদনও আমাদের অন্যতম উদ্দেশ্য। কারণ তিনি সেদিন ছিলেন বলেই আজ আমরা আছি!

লেখক : চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং চেয়ারম্যান, ফোরাম ফর দ্য স্টাডি অব দ্য লিভার বাংলাদেশ

 

 

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত