প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ফজলুল বারী: দুর্নীতিবাজদের মন্ত্রিসভায় রাখেননা শেখ হাসিনা, চুপচাপ ড্রপ করেন

ফজলুল বারী: দেশে থাকতে আমার পত্রিকা জনকন্ঠ আমাকে যখন যে ইস্যু বেশি আলোচিত সেখানে কাজে লাগাতো। এরজন্যে আমি কখনও কখনও সুপ্রিমকোর্টেও রিপোর্ট করতে যেতাম। বেশিরভাগ পত্রিকার সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী রিপোর্টার থাকেন। আইনি বিষয়গুলো তারা ভালো বোঝেন। এরজন্যে আমরা অনেক সময় বিভিন্ন শুনানি বা রায়ের পর দুই পক্ষের আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলতাম। আইন অংগনের লোক না হওয়ায় অনেক কিছু আমাদের কাছে রিপোর্ট মনে হতো। আইনজীবী রিপোর্টারদের তা মনে হতোনা অথবা তারা অনেক কিছু এভয়েড করে যেতেন। ফেসবুক থেকে 
একবার আমার একটা রিপোর্ট নিয়ে সমস্যা হলো। বিচারপতি মোস্তফা কামাল তখন প্রধান বিচারপতি। এরশাদের জনতা টাওয়ার দুর্নীতি মামলার শুনানির সময় বিচারপতি মোস্তফা কামাল এক পর্যায়ে মন্তব্য করে বলেন, ‘আমরা এখানে বসে হর্স ট্রেডিং এর অনুমোদন দিতে পারিনা’। সাধারনত আইনজীবী রিপোর্টাররা শুনানি চলাকালে বিচারপতিদের এসব মন্তব্য রিপোর্টে লিখেননা। আমি সেটা লিখলে জনকন্ঠে তা ছয় কলাম লিড হয়। এটা নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেন বিচারপতি মোস্তফা কামাল। কিন্তু অস্বীকার করতে পারেননা। কারন কোর্ট ভর্তি আইনজীবী, সাংবাদিকদের সামনে তিনি কথাটিতো বলেছেন।
তখন সুপ্রিমকোর্টে আমাদের মতো রিপোর্টার যারা আইনজীবী নন তাদের প্রবেশ নিয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। তখন বিষয়টির মুসাবিদা করেন আজকের মন্ত্রী এডভোকেট স ম রেজাউল করিম। তিনি তখন সুপ্রিমকোর্ট সাংবাদিক সমিতির নেতৃত্বে ছিলেন। তিনি তখন ছিলেন প্রথমআলোর সুপ্রিমকোর্ট প্রতিনিধি। তাঁর সঙ্গে আমরা যারা সুপ্রিমকোর্টে কাজ করতে যেতাম তাদের আন্তরিক বন্ধুত্বের একটি সম্পর্ক ছিল। ওই ঘটনার পর থেকে তা আরও দৃঢ় হয়। আইনজীবী হিসাবে ব্যস্ততা বাড়ার পর তিনি ধীরে ধীরে আদালত সাংবাদিকতায় অনিয়মিত হয়ে যান। কিন্তু তাঁর সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব অটুট থাকে। এখনও তা অটুট।
১/১১’এর সময় শেখ হাসিনা যখন গ্রেফতার হন তখন ভিন্ন ভূমিকায় অবতীর্ন হন স ম রেজাউল করিম। আওয়ামী লীগের অনেক বাঘা উকিল তখন শেখ হাসিনার পক্ষে কোর্টে দাঁড়াননি। ব্যারিষ্টার শফিক আহমেদের নেতৃত্বে একটি আইনজীবী প্যানেল শেখ হাসিনার পক্ষে আইন যুদ্ধে নামেন। সেই প্যানেলের অন্যতম বলিষ্ঠ সদস্য ছিলেন স ম রেজাউল করিম। শেখ হাসিনা তাঁর এসব দূর্দিনের সহকর্মীদের মূল্যায়ন করেছেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর ব্যারিষ্টার শফিক হন আইনমন্ত্রী। দলে অনেক বাঘা আইনজীবী থাকতে স ম রেজাউল করিমকে আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক করা হয়। সেখান থেকে তিনি সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী।
আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক হবার আগে টেলিভিশনের টকশোতে প্রাঞ্জল ভাষায় নানান আইনি ব্যাখ্যা মানুষকে মুগ্ধ করে। তথ্য উপাত্ত নিয়ে তাৎক্ষনিক কথা বলার মতো আওয়ামী লীগের এমন জুয়েল নেতা টকশোতে খুব বেশি নেই। সৎ ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তিরাই এভাবে অকপটে কথা বলতে পারেন। মন্ত্রী হবার পরও তাঁর এই ভূমিকাটি এখনও অটুট। পূর্ত মন্ত্রণালয়ের পর তিনি এখন মৎস ও পশু সম্পদ মন্ত্রী। সব জায়গাতেই তিনি অনবদ্য। বিশেষ করে এই করোনা কালে বর্তমান মন্ত্রণালয়ে তাঁর গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা সবাই জানেন।
শেখ হাসিনার এই সরকারে মন্ত্রী হিসাবে যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নেই স ম রেজাউল করিম তাদের অন্যতম। সবার সব খবর শেখ হাসিনার কাছে আছে। থাকে। দুর্নীতিবাজদের মন্ত্রিসভায় রাখেননা শেখ হাসিনা। চুপচাপ ড্রপ করেন। তাঁর বেয়াইও ড্রপড হয়েছেন। শেখ সেলিমকে তিনি আর মন্ত্রিসভায় স্থান দেননি। একই কারনে আওয়ামী লীগের সিনিয়র জুনিয়র একাধিক নেতা মন্ত্রিসভায় ফিরতে পারেননি।
অনেক দিন আমি বিদেশে। ক্ষমতায় থাকা অনেকে মাঝে মধ্যে ফোন করে খোঁজ খবর নেন। আমার তাদেরকে ফোন করা হয়না। একটা প্রয়োজনে স ম রেজাউল করিম ভাইকে একদিন ফোন করেছিলাম(তিনিও আমাকে বারী ভাই ডাকেন। ছাত্রলীগের এই প্রজন্মের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতাটি চট্টগ্রামের নুরুল আজিম রনি। চট্টগ্রামের তৎকালীন আ জ ম নাছির তাদের গ্রুপিং দ্বন্দ্বে রনিকে গ্রেফতার করালে আমার বন্ধু চাঁদপুরের প্রিয়ভাজন রতন মজুমদারের অনুরোধে রনি’র পক্ষে আমি লিখতে শুরু করি। সেই প্রয়োজনে রেজা ভাইকে আমি ফোন করি রনির জামিন শুনানি প্রসঙ্গে। রেজা ভাই আমাকে বলেন, তিনি রনির জন্যে আদালতে দাঁড়াবেন। আমার সঙ্গে তিনিও একমত হয়ে বলেন, রনিই এই প্রজন্মের জনপ্রিয় ক্যারিশমেটিক ছাত্রলীগ নেতা। রনির পক্ষে থাকতে হবে।
রেজা ভাইর শুনানিতে রনির জামিন হয়। কৃতজ্ঞতায় বেচারা পারিবারিক সম্বল একটি সিএনজি বিক্রি করে রেজা ভাইকে তাঁর আইনজীবী হিসাবে পারিশ্রমিক দিতে ঢাকায় যায়। কিন্তু ইনিতো আওয়ামী লীগ অন্তপ্রান স ম রেজাউল করিম। তিনি কিভাবে রনি’র কাছ থেকে টাকা নেন। তাকে পিঠ চাপড়ে ভালোবাসা ও দোয়া জানিয়ে বিদায় করেন।
এরপর রনি’কে আরও একবার গ্রেফতার করানো হয়েছিল। তখনও তাকে জামিন করান স ম রেজাউল করিম। আমাকে একবার আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেছিলেন, এক অনুষ্ঠানে দেখেছেন স ম রেজাউল করিমকে দেখে কটমট তাকাচ্ছিলেন আ জ ম নাছির। বাট হু কেয়ার্স। শেখ হাসিনা তাকে সম্মান দিয়েছিলেন। দাপট দেখাতে গিয়ে তিনি সে সম্মান রাখতে পারেননা। যারা ক্ষমতার গরমে অহংকারে দাপট দেখায় তাদের শেখ হাসিনা আ জ ম নাছির, সাঈদ খোকন বানিয়ে দেন।
মন্ত্রী হবার আগে সিডনিতে আওয়ামী লীগের একটি অনুষ্ঠানে এসেছিলেন স ম রেজাউল করিম। এর আগে আবার আমাদের ফোনে কথা হয়। আমি সাধারন সিডনিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সভায় যাইনা। এসব ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত। রেজা ভাই’র জন্যে সেই অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সে রাতে তাকে নিয়ে গাড়িতে সিডনি ঘুরতে বেরিয়ে অনেক দিন পর নানান বিষয়ে আমাদের কথা হয়। আমার বাসায় তাঁর জন্যে ডাল ভাতের ব্যবস্থা করেছিলাম। কিন্তু দূর্ভাগ্যক্রমে সেদিন দেশে তাঁর বড় ভাই মারা যাওয়ায় সব কর্মসূচি বাতিল করে তিনি দেশে রওয়ানা হন। আমার বাসায় তাঁর আর আসা হয়নি।
তিনি মন্ত্রী হবার পর লাকেম্বায় লোকজন জিজ্ঞেস করেন আপনি দেশে কবে যাচ্ছেন, আপনার বন্ধু মন্ত্রী হয়েছেন। পূর্তমন্ত্রী। আমি অবাক হয়ে জবাব দেই, আমার বন্ধু মন্ত্রী হয়েছেন, এরজন্যে আমি কেনো দেশে যাবো। আসলে এভাবেই হয়তো অনেকে সম্পর্কের সুযোগকে কাজে লাগায়। অনেক দিন তাঁর সঙ্গে কথা হয়না। আমার ছেলের মৃত্যুর পর প্রিয়, ঘনিষ্ঠ অনেকের সঙ্গেই ফোনে কথা হয়না। আমি কথা বলিনা। কথা বলতে, কান্না থামাতে পারিনা। তবে আমি তাকে সব সময় ফেসবুকে অনুসরন করি।
গত কিছুদিন ধরে ফেসবুকে তাঁকে নিয়ে ফিসফাস অপ্রচারের কথা পড়ছিলাম। আমি যেহেতু ঘটনা জানিনা তাই জানতে গিয়ে হাসলাম। ওই এলাকার সাবেক এমপি আব্দুল আউয়াল, যাকে বাদ দিয়ে শেখ হাসিনা স ম রেজাউল করিমকে এমপি-মন্ত্রী করেছেন, তিনি এসবের নেপথ্যে! তিনি হয়তো ভেবেছেন এসব করলে আগামীতে শেখ হাসিনা স ম রেজাউল করিমকে বাদ দিয়ে তাকে এমপি নমিনেশন দেবেন!
আওয়ামী লীগের কিছু লোকজন প্রায় এমন ভুল করেন। তারা করেন যারা শেখ হাসিনাকে জানেননা বোঝেননা। শেখ হাসিনা হচ্ছেন সেই নেত্রী যিনি আওয়ামী লীগের ফুলটাইমার সভানেত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী। ঘুমের সময়টুকু ছাড়া সারাক্ষন তিনি দল এবং দেশের কাজ করেন। সবকিছুতে তাঁর নিজস্ব একটি স্টাইল আছে। সবার সব খবরই তাঁর কাছে আছে বা চলে আসে। যা বিএনপিও বুঝেছে, এখন হেফাজত বুঝছে।
যখন হেফাজতের নেতারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য বুড়িগঙ্গায় ফেলবে বলেছিল, তখন শেখ হাসিনা কিছু বলেননি। অথচ বঙ্গবন্ধুতো তাঁরই বাবা। আমাদের সবার চাইতে তাঁদের দুইবোনের দরদের বিষয়টি আলাদা। যখন হেফাজত ঢাকা, ব্রাহ্মনবাড়িয়া সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আগুন দিলো তান্ডব চালাচ্ছিল তখন অনেকে বলছিলেন, শেখ হাসিনা কিছু করছেননা কেনো! বলছেননা কেনো! এখন সবাই বুঝছেন শেখ হাসিনা কি করছেন!
কাজেই পিরোজপুর-১ আসনের ( নাজিরপুর- পিরোজপুর- স্বরূপকাঠি ) সাবেক এমপি আব্দুল আউয়াল কী বুঝছেন তিনি কী উদ্দেশে কাদের কী সাজিয়ে শেখ হাসিনা মনোনীত এমপি-মন্ত্রী স ম রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে যে সব প্রপাগান্ডা চালাচ্ছেন তা কি শেখ হাসিনা জানছেননা, বুঝছেননা? বুদ্ধিশুদ্ধি থাকলে তিনি নিশ্চয় সতর্ক হবেন। কারন ভিলেজ পলিটিক্স শেখ হাসিনার সংগে চলেনা। গ্রামে জন্ম নিয়ে সেখান থেকে নৌকায় করে ঢাকা এসেছে তিলেতিলে এই শেখ হাসিনার সৃষ্টি। সেখান থেকে তিনি এখন আন্তর্জাতিক নেত্রী। আওয়ামী লীগকে তিনি ক্ষমতায় এনেছেন ক্ষমতায় ধরে রেখেছেন। অন্য কেউ নন। কাজে গ্রাম্য ভাষার ‘জাউরামি’ করে শেখ হাসিনার পছন্দের মানুষের ক্ষতি করতে পারবেননা মি: আউয়াল। উল্টো নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ধংস হয়ে যাবেন।
ভালো থাকবেন রেজা ভাই। আপনিও গ্রামের সোদা মাটির বুক থেকে আসা চিরদিনের একজন সংগ্রামী। আল্লাহ সহায়। আপনি ন্যায়নিষ্ঠ মানুষ। কেউ আপনার ক্ষতি করতে পারবেনা। মানুষ আপনাকে চেনেজানে। আমরা বন্ধুরাও আপনার ছিলাম। আপনার থাকবো। জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত