প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এম আমির হোসেন: সুখের পথ ও পদ্ধতি

এম আমির হোসেন: প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টিপাস সুখবাদের জনক। তাঁর মতে, ইন্দ্রিয় সুখই প্রকৃত সুখ। ইন্দ্রিয় সুখ অর্জন করতে গিয়ে তৎকালীন আইন অনুসারে তাঁকে অনেক বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছিল। এপিকিউরাস সুখের জন্য আনন্দ বাগানে যেতে বলেছেন। বস্তুবাদী দৃষ্টি থেকে তিনি কল্যাণ সুখের কথা বলেছেন।

আবার চিনা দার্শনিক মাউ জ্যু মনে করতেন, পরের জন্য ‘সার্বিক ভালোবাসা’ই সুখ লাভের শ্রেষ্ঠ উপায়। কিন্তু তাঁর সমসাময়িক ইয়াং চিউ বলতেন, নিজেকে ভালোবাসা ও রক্ষা করার মধ্যেই রয়েছে আসল সুখ; পর নয়, নিজের স্বার্থ দেখাই সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ। হেগেল, ফয়েরবাখ, মার্কস এঁরা সুখকে দেখেছেন বস্তুবাদী দৃষ্টিতে। তাঁরা বলতেন, সামষ্টিক কল্যাণ ছাড়া সামষ্টিক সুখ আসে না। বারট্রান্ড রাসেল বলেছেন, সুখী হতে লাগে চারটি জিনিস-সুন্দর স্বাস্থ্য, সুন্দর অর্থনৈতিক অবস্থা, সুন্দর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও কর্মে সাফল্য।

এগুলো সবই সত্য মানি। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, অনেকে ‘সুখ কী’ তা ভালোভাবে না জেনেই বেশ সুখে আছেন। এই সুখী হওয়ার সাথে চতুষ্পদীদের সুখের তুলনা চলে। সুখ মনের স্বতঃস্ফূর্ত এক অনুভূতি যা স্থান-কাল-পাত্র ভেদে ভিন্ন ভিন্ন। শুধু প্রখর ঔচিত্যবোধ আর নৈতিকতা-জ্ঞান দিয়েই সুখ আসে না। আদর্শ জীবন হিসাবে যে জীবনের প্রচার আমাদের চারপাশে রয়েছে তা কষ্টেসৃষ্টে অর্জন করতে পারলে হয়তো সফল হওয়া যাবে, কিন্তু সুখীও যে হওয়া যাবে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। আদর্শ জীবনের টুকটাক ব্যত্যয়ই অনেকের কাছে সুখ; আবার অনেকের পার্সোনালিটি এমন যে তারা কোনো ব্যত্যয়ই জানে না বা ব্যত্যয় যে আছে তা-ও জানে না। পার্সোনালিটির টাইপের ওপরও সুখ নির্ভর করে। সুখ আহরণের জন্য গণিতহীন সহজিয়া নির্ভেজাল একটি মন লাগে। তথাকথিত প্রাচুর্য কিংবা কৃত্রিম হুড়োহুড়ি মানুষকে ‘কথিত সফলতা’ হয়তো দিতে পারে, কিন্তু সুখীও করবে এ গ্যারান্টি নেই। অহংবোধের সুখ হাস্যকর ও বিকৃত।

চেতনাকে মুক্তি দিয়ে, মনকে প্রসারিত করে কিংবা একাকীত্বে ডুব দেওয়ার জন্য ব্যক্তিগত একটি দিঘি খনন করে যে সুখ লাভ হয় তা একান্ত নিজস্ব। জ্ঞান আহরণের সুখ দুর্দান্ত। জ্ঞানের অন্বেষণে যে সুখ খুঁজে পায় স্বাস্থ্য নষ্ট হওয়া ছাড়া জীবনের আর কোনো ভ্রান্তি-নষ্টামিতে সে অসুখী হয় না। প্রাণি-অপ্রাণি, বস্তু-অবস্তু সব কিছুই জ্ঞানের স্পর্শে সুখময় হয়ে ওঠে। পারস্পরিক সম্পর্ক, ত্যাগ ও ভালোবাসার সুখ অকৃত্রিম। ভালোবাসার সাহচর্যে সুখের ক্ষুদ্র উপাদানগুলোও ব্যাপকতা লাভ করে।

জগৎ সুখপূর্ণ-সুখের অজস্র উপাদান চারপাশে ছড়িয়ে আছে। সংকট কেবল নিজের জন্য প্রযোজ্য সঠিক উপাদানগুলো চিনে নেওয়াতে। প্রজ্ঞার গভীরতায় পৌঁছুলে দুঃখও সুখময় হয়ে ওঠে। চেতনার অতলে অগাধ সুখের অনাবিষ্কৃত যে খনি রয়েছে এর সন্ধান যে পায় না তার জীবন ব্যর্থ, তার সুখ অসম্পূর্ণ! লেখক : চিকিৎসক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত