প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

স্বকৃত নোমান: এখন শোনা যাচ্ছে মামুনুল হক তার বাবার শেষ স্ত্রীকেও বিয়ে করেছিল।

স্বকৃত নোমান: এখন শোনা যাচ্ছে মামুনুল হক তার বাবার শেষ স্ত্রীকেও বিয়ে করেছিল। জানাচ্ছেন কমরেড ডা. এমএ সামাদ। তিনি কমিউনিস্ট পার্টি অব বাংলাদেশ-এর (মার্কসিস্ট) জেনারেল সেক্রেটারি এবং দৈনিক ‘সিপিবিএম’ পত্রিকার সম্পাদক। তিনি ভূয়া তথ্য দেওয়ার কথা নয়, গুজব ছড়ানোর কথা নয়। প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ হাতে নিয়েই তিনি ফেসবুক লাইভে এসে এমন তথ্য জানালেন। সেই নারী মামুনুলের বাবা আজিজুল হকের সর্বশেষ স্ত্রী। এখন আমেরিকা প্রবাসী। বাবা তালাক দেওয়ার পর তাকে বিয়ে করেছিল পুত্র মামুনুল। আবার তালাকও দেয়। সেই নারী তার ফেসুবক প্রোফাইলে লিখেছেও যে, তার এক্স স্বামী মামুনুল হক। বাবা যাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিল, যার সঙ্গে রতিক্রিয়া করল, ছেলে কেমন করে তার সঙ্গে একই কর্ম করে আমাদের ঠিক মাথায় ধরে না। এমন নারীর কাছে গেলে তো শ্রদ্ধায় পুত্রের যৌনাকাঙ্খা স্থিমিত হয়ে যাওয়ার কথা।

যাই হোক, এটাও হয়ত মামুনুল হকের ব্যক্তিগত ব্যাপার, যেমন ব্যক্তিগত ব্যাপার তার ‘কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ’। মানুষের ব্যক্তিগত ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে নেই―এটা হেফাজতের সাম্প্রতিক উপলব্ধি। এই উপলব্ধি কল্যাণকর, যদিও তারা দেরিতে বুঝল। বিপদ নিজেদের ঘাড়ে সওয়ার হওয়ার পর বুঝল। হয়ত বোঝেনি, বাঁচার জন্য আপাতত এই কৌশল বেছে নিয়েছে। পরে আবার উল্টে যাবে। আবার মানুষের ব্যক্তিগত ব্যাপারে হস্তক্ষেপ শুরু করবে। আবার ওয়াজ মাহফিলে এর বিরুদ্ধে ফতোয়াবাজি শুরু করবে।

এই সুযোগে হেফাজত অনুসারীদের একটু বলে রাখি। হে ভাইয়েরা, ধর্মও ঠিক তেমনি একটি ব্যক্তিগত ব্যাপার। কে মুসলিম কে অমুসলিম, তা দেখার দায়িত্ব আপনার নয়। কে আস্তিক কে নাস্তিক, তা দেখার দায়িত্ব আপনার নয়। কে নামাজি কে বেনামাজি, তা দেখার দায়িত্ব আপনার নয়। কে রোজাদার, কে বেরোজদারি, তা দেখার দায়িত্ব আপনার নয়। কে তার স্রষ্টাকে গোপনে ডাকছে, কে প্রকাশ্যে ডাকছে, তা দেখার দায়িত্ব আপনার নয়। কে সমুদ্রসৈকতে প্রেমিকাকে নিয়ে হাওয়া খাচ্ছে, পার্কে বসে প্রেম করছে; কে বারে গিয়ে গোপনে মদ খাচ্ছে, তা দেখার দায়িত্ব আপনার নয় নয়। আপনারা যে ‘কেরামান কাতেবিনের’ কথা বলেন, তা দেখা দায়িত্ব সেই দুই গোয়েন্দার। আপনারা যে সর্বদ্রষ্টা সৃষ্টিকর্তার কথা বলেন, তা দেখার দায়িত্ব তাঁর। সেই দায়িত্ব আপনাকে দেওয়া হয়নি। গোয়েন্দা বিভাগে আপনি চাকরি করেন না, তবু কেন ভূয়া গোয়েন্দা সাজেন? আপনি সর্বসময় ক্ষমতার অধিকারী সৃষ্টিকর্তা নন, তবু কেন তাঁর ক্ষমতা নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার অপচেষ্টা চালান? আপনি স্রষ্টা নন, মানুষ। মানুষের ব্যক্তিগত বিষয়ে স্রষ্টাও হস্তক্ষেপ করেন না। আপনি কে হস্তক্ষেপ করার? আপনাকে কে দিল এই অধিকার?

ওদিকে হেফাজতের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য আনুষ্ঠানিক দুঃখ প্রকাশ করলেন জুনায়েদ বাবুনগরী। এই দুঃখপ্রকাশও করলেন একটু দেরিতে, যখন বুঝলেন সরকার হার্ডলাইনে, যখন বুঝলেন বাঁচার উপায় নাই, ঠিক তখন তার দুঃখপ্রকাশ। সরকার যদি নমনীয়তা প্রদর্শন করত তবে তিনি দুঃখপ্রকাশ করতেন না, সমর্থকদের জ্বালাও-পোড়াও করতে বারণ করতেন না। বরং আরো উসকানি দিতেন। হেফাজতের কয়েকজন নেতাও গত রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে দেখা করলেন। কেন করলেন? এজন্য যে, তারা বুঝে গেছে বাঘের লেজ দিয়ে কান চুলকানো সম্ভব নয়। গোখরোর লেজ দিয়ে কান চুলকানো বোকামি। তারা বুঝে গেছে, গোখরো সাপের মতো যে ফণা তারা তুলেছিল সেই ফণা এখন নামাতে হবে। নইলে কল্লা কাটা যাবে। কল্লাটা কেটে দেবে রাষ্ট। কল্লা বাঁচাতে এখন ফণা নামিয়েছে, বাধ্য ছেলের মতো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেছে।

কিন্তু সরকার কি আবারও নমনীয়তা প্রদর্শন করবে? জঙ্গি, রাষ্ট্রদ্রোহী, রাষ্ট্রীয় স্থাপনা ধ্বংসকারী, মানুষের বাড়িঘর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগকারী, ধর্মব্যবসায়ী এই হেফাজতকে আবারও ছাড় দেওয়া শুরু করবে? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন তিনি হাটহাজারি মাদ্রাসায় যাবেন। গিয়ে ছাত্রদের বোঝাবেন জ্বালাও-পোড়াও করা যে ভালো নয়। সত্যি কি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় হাটহাজারি মাদ্রাসায় যাবেন? গেলে আমরা কী বুঝে নেব? বুঝে নেব যে, সরকার আবারও নমনীয় হতে যাচ্ছে, আবারও আপস করতে যাচ্ছে। সর্বত্র এই বার্তা যাবে যে, হাটহাজারি এমন এক মাদ্রাসা, যেখানে খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও যেতে হয়। গিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে কথা রফা করতে হয়। এমন বার্তা বর্তমান পরিস্থিতির জন্য যে মোটেই শুভকর নয়, তা যে কেউ বুঝতে পারবে।

যদি যেতেই হয়, তবে কোনো উদার সুফির দরবারে যান। আমরা বারবার সুফিবাদের কথা বলি। কেন বলি? জ্বরের ওষুদ প্যারাসিটামল। জ্বরে ক্যান্সারের ওষুদ দিলে চলে না। কট্টর রক্ষণশীলতার, উগ্রতার প্রাথমিক দাওয়াই সুফিবাদ। ইতিপূর্বে এক লেখায় যেমন বাংলার কবিয়াল, গায়েন, বয়াতী তথা মরমী সাধকদের বাঙাল মানুষের বুদ্ধির মুক্তির আন্দোলনের প্রাথমিক বিদ্যালয় বলেছি, ঠিক তেমনি সুফিদেরকে বলছি উগ্রতার প্রাথমিক দাওয়াই। উদার বহুত্বাদী সুফি ও তাঁদের অনুসারীরা কাউকে হত্যার কথা বলে না, জ্বালাও-পোড়াও করে না, কারো ব্যক্তিগত ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে না। স্রষ্টার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেয় না। তারা মানুষের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। যদি আমার কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, তবে এই বাংলার সুফিবাদের ইতিহাসটায় একটু চোখ বুলিয়ে নেবেন।

সরকার হেফাজতের বিরুদ্ধে যে কঠোরতা প্রদর্শন করছে, তা অব্যাহত থাকুক। হেফাজত সমর্থকরা বুঝুক, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যায় না। টন টন রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই বাংলাদেশে তথাকথিত খেলাফত প্রতিষ্ঠার দুঃস্বপ্ন দেখা যায় না। জেহাদ করে ক্ষমতা দখল করা যায় না। তারা বুঝুক, হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী এই দেশের সাংস্কৃতিক চিহ্নসমূহের ওপর অশুভ হাত দেওয়া যায় না। দিলে সেই হাত পুড়ে যায়, ধ্বংস হয়ে যায়। যেমন ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানি হার্মাদরা। তারা রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিল। পারেনি। এখন এরাও চাইছ এই দেশের সাংস্কৃতিক সমস্ত চিহ্ন মুছে দিতে। পারবে না। কখনোই সফল হবে না।

তারা বুঝুক, এই দেশের মানুষ যে তাদের কথায় নাচে না। তারা ডাক দিলেই যে সরকার পতনের লক্ষ্যে কেউ রাস্তায় নেমে আসে না। গত পঞ্চাশ বছরে ডাক তো কম দিল না। কেউ তো নামেনি। কম হুঙ্কার তো দিল না। একজন তো ওয়াজ মাহফিলে বলেই ফেলল, ‘বায়াত্তর ঘণ্টা কেন, বায়াত্তর বছরেও মামুনুলকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। করতে পারলে তারা হাতে চুড়ি পরবে।’ কী ঔদ্ধত্য! কী দুঃসাহস! রাষ্ট্রকে কী চোখ রাঙানি! এখন মামুনুল তো গ্রেপ্তার হলো। কই, কেউ তো রাস্তায় নেমে সরকারকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল না। হেফাজত নেতাদের গ্রেপ্তার চলছে। কই, কেউ তো রাস্তায় নেমে ধ্বংসলীলা চালানোর সাহস করল না। বরং পালাচ্ছে সবাই, পালাচ্ছে। যে যেখানে পারছে গা ঢাকা দিচ্ছে।

তাহলে আমরা কী বুঝলাম? বুঝলাম যে, যে সাপকে বিরাট অজগর ভেবেছিল সরকার, তা আসলে ধোড়া। নির্বিষ। এক বাড়িতেই কুপোকাত। তারা আসলে ইঁদুর। মানুষ দেখলেই পালায়, গর্তে ঢুকে যায়। কিন্তু একটু কথা আছে। ইঁদুর বেড়ে গেলে তাদেরকে ধ্বংস করতে হয়। নইলে ঘরের আসবাবপত্র সব কেটেকুটে ছত্রখান করে দেয়। ইঁদুর থেকে কিন্তু প্লেগের মতো মহামারিও বয়ে আনে। সেই মহামারি জনপদের পর জনপদ মানবশূন্য করে দেয়। যেমন আফগানিস্তানে করে দিয়েছে, যেমন মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশকে কেটেকুটে সর্বশান্ত করে দিয়েছে, দিচ্ছে। সুতরাং সময়মতো ঘরে ইঁদুর মারার ওষুদ ছিটাতে হয়, কল বসিয়ে ইঁদুরগুলোকে ধরতে হয়। তাদেরকে বুঝিয়ে দিতে হয় তোমাদের স্থান ভূগর্ভে। মুষিকাসুরের মতো তোমরা দেবলোক দখল করার স্বপ্ন দেখো না, অমৃতকূপ দখল করার স্বপ্ন দেখো না। দেখলে তার পরিণতি হবে ভয়ংকর।

সময় এসেছে ধর্মসভাগুলো নিয়ন্ত্রণ করার। ওয়াজ মাহফিলের নামে যাতে কেউ রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য দিতে না পারে, কেউ যাতে মানুষকে উসকানি দিতে না পারে, কেউ যাতে ধর্মের নামে মানুষকে অধর্ম শেখাতে না পারে, কেউ যাতে বিদেশি টাকা পকেটে নিয়ে বাংলার মানুষকে বিভ্রান্ত করতে না পারে, কেউ যাতে ধর্মকে ব্যবসার পণ্য বানাতে না পারে―সেই দিকে নজর দিতে হবে সরকারকে। কওমি মাদ্রাসাগুলোর ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, পাকিস্তান যা করেছে তিন বছর আগে। ওসব মাদ্রাসাকে দুর্গ বানিয়ে রাখা চলবে না। দুর্গের ভেতরে কীসব চলে বাইরের কেউ জানতে পারবে না, তা হতে পারে না। ঢাকার চারদিকে কওমি মাদ্রাসার নামে বিদেশি অর্থায়নে যেসব ‘দুর্গ’ গড়ে তোলা হয়েছে, সেসব মাদ্রাসায় বাড়াতে হবে কঠোর নজরদির। প্রণয়ন করতে হবে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা।

এই বাংলাদেশ কোনো জঙ্গি, উগ্র, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অবাধ চারণভূমি হোক, তা আমরা চাই না।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত