প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভ্যাকসিন নিয়ে প্রতারণার ফাঁদ, সতর্ক না হলে মহা বিপদের শঙ্কা

ডেস্ক রিপোর্ট : সারাবিশ্বের মোট জনসংখ্যা ৬০০ কোটির বেশি। সেখানে আগামী বছর শেষ পর্যন্ত এক-তৃতীয়াংশ মানুষের কাছে করোনা ভ্যাকসিন পৌঁছানো সম্ভব হবে না। ফলে বেশিরভাগ মানুষই থেকে যাবে ভ্যাকসিন গ্রহণের বাইরে। রাষ্ট্রগুলো যেমন তার নাগরিকদের জন্য ভ্যাকসিন নিশ্চিত করতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। ঠিক একইভাবে ভ্যাকসিন সবার জন্য উন্মুক্ত হলে এটি পেতে তীব্র প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে। আর এই সুযোগ নিয়েই এক শ্রেণীর মানুষ ভ্যাকসিন বিক্রির অগ্রিম অর্ডার নিচ্ছেন। তবে এভাবে অবাধে সারা বিশ্বের কোথাও ভ্যাকসিন বিক্রি শুরু হয়নি। সতর্ক না হলে মহাবিপদ ঘটার শঙ্কা রয়েছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরাঁ বলেছেন, করোনাভাইরাস মহামারির পরও এর ধাক্কা বা আফটারশকের বিরুদ্ধে কয়েক দশক ধরে লড়াই করতে হবে পৃথিবীবাসীকে। এ সময় তিনি এই ভাইরাস সংক্রমণের বিষয়ে দ্রুত যে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি সাধিত হচ্ছে তার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তবে সতর্কতা দেন যে, করোনাভাইরাসের টিকা আবিষ্কার হলেও এর ক্ষত পৃথিবী থেকে সহসাই শেষ হয়ে যাবে না। তিনি বলেন, আমরা যেন বোকা না হই। এই ভাইরাস সংক্রমণের কারণে যে ক্ষত হয়েছে তা চলতে থাকবে বছরের পর বছর, এমন কি কয়েক দশক।

করোনাভাইরাস মহামারি বিষয়ে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে এ যাবতকালের প্রথম অধিবেশনে গত বৃহস্পতিবার বক্তব্য রাখেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরাঁ। জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, এই ক্ষত শুধু একটি টিকা সারিয়ে তুলতে পারবে না। চরম দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা নিকটতম হচ্ছে। আট দশকের মধ্যে আমরা বিশ্বে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক মন্দার মুখে পড়তে যাচ্ছি। এরই মধ্যে করোনা ভাইরাসে সারাবিশ্বে মারা গেছেন প্রায় ১৫ লাখ মানুষ। অ্যান্তনিও গুতেরাঁ বলেন, কোভিড-১৯ আরো নানা রকম চ্যালেঞ্জকে বৃদ্ধি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে অসমতা এবং জলবায়ু পরিবর্তন। এই সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন বিশ্বের শতাধিক দেশের নেতারা বা সিনিয়র কর্মকর্তারা। সংক্ষিপ্ত এই অধিবেশনের বক্তব্য আগে থেকেই রেকর্ড করা। দু’দিন চলবে এই সম্মেলন। তবে কূটনীতিকরা বিশ্বাস করেন, মাত্র দু’দিনের এমন আলোচনা থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে আসা যাবে না।

চলতি বছরে ব্যবহারের জন্য করোনা ভ্যাকসিনের ৬০ কোটি ডোজ প্রস্তুত করছে চীন। শিগরিগরই এ বিষয়ে একটি ‘বড় ঘোষণা’ দেয়ার অপেক্ষায় রয়েছে তারা। দেশটিতে ভ্যাকসিন উৎপাদনের দায়িত্বে থাকা শীর্ষ বিজ্ঞানীর বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।

চীন এবং যুক্তরাজ্যে ইতোমধ্যে সাধারণ মানুষকে ভুল বুঝিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিতে মাঠে নেমেছে একটি চক্র। দেশ দুটিতে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে সরকারের পক্ষ থেকে কাজ করা হচ্ছে। বিশ্ববাসীকে এমন ফাঁদে পা না দিতে সতর্ক করেছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন (ইন্টারপোল)। বাংলাদেশেও এই প্রক্রিয়া নিয়ে সতর্ক থাকা উচিত বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশ্বের বিভিন্ন পুলিশ বাহিনীর সমন্বয়ক সংস্থা ইন্টারপোল সতর্কবার্তায় বলছে সংঘবদ্ধ একটি চক্র নকল টিকা বাজারে ও অনলাইন মাধ্যমে বিক্রির চেষ্টা করতে পারে। এই ভ্যাকসিন গ্রহণ মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

চীনের সংবাদ মাধ্যমগুলো বলছে দেশটির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইউচ্যাটে ১২৫ ডলার হেকেছে ভ্যাকসিনের দর। ক্রেতাদের আগ্রহী করতে ভ্যাকসিনের ছবি এবং এর সঙ্গে উৎপাদনকারীদের ওয়েবসাইটের ঠিকানা লিঙ্ক এবং তাদের বক্তব্য প্রচার করা হয়েছে। যাতে একজন মানুষ শুরুতে দেখেই বিষয়টি বিশ্বাস করতে পারেন। তবে চীনের সরকার এ বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রেখেছে বলেও সেদেশের একটি সংবাদ মাধ্যমের রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। একই অবস্থা যুক্তরাজ্যেও। দেশটি ইতোমধ্যে এই ভুয়া ভ্যাকসিনের বিক্রি রুখতে পদক্ষেপ নিয়েছে। দুটি দেশে এমন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সরকার ঘোষণা দিয়েছে এখনও বেসরকারী পর্যায়ে ভ্যাকসিন বিক্রির কোন অনুমোদন সরকারের তরফ থেকে দেয়া হয়নি। একই সঙ্গে সরকার কোন প্রক্রিয়াতে ভ্যাকসিন সরবরাহ করবে তাও তুলে ধরা হয়েছে।

চীনের গুটি কয়েক ওয়েবসাইটে গত মাসের শুরু থেকেই ভ্যাকসিন বিক্রির এমন প্রি-অর্ডার দেখা যায়। সেসব ওয়েবসাইটে যারা ভ্যাকসিন বিক্রির বিজ্ঞাপন ঝুলিয়েছিল তারা প্রতি ভ্যাকসিনের দাম ১০০ ডলার নির্ধারণ করে এই বিজ্ঞাপন দিয়েছিল। বিশেষত চীন এখন নিজেদের দেশের নাগরিকদের গণহারে ভ্যাকসিন দিচ্ছে। তবে চীনের বাজারের সঙ্গে এই ভ্যাকসিনের দরের অনেক পার্থক্য রয়েছে। যা মূলত ভ্যাকসিন বিক্রেতার অগ্রিম অর্ডার নিয়ে প্রশ্ন তুলতে সাহায্য করেছে। তবে কড়াকড়ির পর এখন ওই ওয়েবসাইটগুলো আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু ভ্যাকসিন বিক্রির আগ্রহ জানিয়ে ওয়েবসাইটগুলো ইন্টারনেট দুনিয়াতে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য একটা বিজ্ঞাপনও দিয়েছিল।

মহামারীর শুরুতে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী বিক্রি করে এক শ্রেণীর মানুষ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। এখন মহামারীর এই পর্যায়ে এসে ভ্যাকসিন নিয়ে অন্য একটি পক্ষের মধ্যে বাণিজ্যিক চিন্তা শুরু হয়েছে। শুরুতেও পিপিই, মাস্ক এবং হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিক্রি করে একশ্রেণীর ওয়েবসাইট। মান নিয়ে দিনের পর দিন প্রশ্ন ওঠার পর এগুলো বন্ধ হয়েছে। নিজস্ব সুরক্ষা সামগ্রী ভুয়া বা নকল হলে মানুষের খুব বেশি ক্ষতি হওয়ার কথা নয়। তবে ভ্যাকসিনটি যদি নকল হয় সেক্ষেত্রে মানুষ সুরক্ষাতো পাবেই না বরং মৃত্যুর মুখোমুখি হতে পারে।

ইনডিপেনডেন্ট. কো.ইউকে-র এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে মহামারীর শুরুর দিকে অসাধু লোকেরা নকল পিপিই বিক্রি করার চেষ্টা করেছিল, সেই একই ধাঁচে এবারও ভ্যাকসিন নিয়ে অসাধু ব্যবসা করতে পারে তারা। ব্রিটেনের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি জানিয়েছে, ভ্যাকসিন নিয়ে জালিয়াতির বড় ঝুঁকি রয়েছে। তারা মনে করছে ভ্যাকসিন প্রস্তুত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নকল ভ্যাকসিন দেয়ার দলগুলো সক্রিয় হয়ে উঠবে।

সারা বিশ্বে কোথাও এখন পর্যন্ত বেসরকারি কোন প্রতিষ্ঠানের হাতে ভ্যাকসিন প্রয়োগের বিষয়টি ছাড়া হয়নি। ব্রিটেন ফাইজার এবং বায়োএনটেক এর কাছ থেকে প্রথম আট লাখ ডোজ ভ্যাকসিন নিয়েছে। আগামী সপ্তাহ থেকে ওই ভ্যাকসিন ব্রিটেনের সব চেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষের শরীরে প্রয়োগ শুরু হবে। ইতোমধ্যে ভ্যাকসিনের প্রথম চালান ব্রিটেনে পৌঁছেছে। এটিই ভ্যাকসিনের প্রথম কোন চালান যা গণহারে মানুষের দেহে প্রয়োগ করা হবে। এর বাইরে এখনও কোন দেশ তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা শেষের পর ভ্যাকসিন প্রয়োগ শুরু করেনি।

শুধু দেশের বাইরে নয়। আগামী বছরের শুরুতে দেশেও ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে। এই সময়ে সাধারণ মানুষও ভ্যাকসিন পাওয়ার জোর প্রচেষ্টা চালাবে। তখনই সুযোগ নিতে পারে ওত পেতে থাকা মুনাফা লোভী এই শ্রেণী। ফলে এ বিষয়ে আগাম সতর্ক থাকা উচিত বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশিষ্ট চিকিৎসক সরকারের করোনা প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ কারিগরি কমিটির সদস্য ডা. এম ইকবাল আর্সলান বলেন, একটি নিরাপদ ভ্যাকসিন পাওয়া সময়ের ব্যাপার। এখন শুধু ভ্যাকসিন দিলেই হবে না এই মানুষগুলোকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখতে হবে। কোথাও কারো কোন সমস্যা হচ্ছে কি না দেখতে হবে। সরকার ছাড়া এই কাজটি কোন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান করবে না। ফলে এখনই বেসরকারি উদ্যোগে ভ্যাকসিন সরবরাহের কোন পরিকল্পনা নেই। জনকণ্ঠ, ইনকিলাব

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত