প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বন্ধু বাবুকে “বাবু খাইছো?” বলায় ফেঁসে গেলেন কুদ্দুছ!!

ডেস্ক রিপোর্ট  : দিনটা শুরু হয়েছিল অন্য যেকোনও দিনের মতনই। সকাল আটটা নাগাদ ঘুম থেকে উঠে মোবাইলে নোটিফিকেশন দেখে কুদ্দুছ তার বন্ধু বাবুর পোস্ট করা সুস্বাদু খাবারের ছবিতে কমেন্ট করেন, “বাবু খাইছো?” বেলা দশটার দিকে পাড়ার মকবুলের টঙ্গের দোকানে গল্পগুজবের ফাঁকে কথায় কথায় তা জানতে পারেন উপস্থিত এলাকাবাসীদের একাংশ। এরপর অনেকটা দাবানলের মতন তা ছড়িয়ে পড়ে ট্যানারীপাড়া এলাকার ঘরে ঘরে। বেলা এগারোটার দিকে বারান্দা কাপড় মেলার সময় বাসার উল্টোদিকে কিছু তরুণকে জড়ো হতে দেখে বিষয়টি বাড়িওয়ালা মালেক সাহেব (কুদ্দুছের পিতা)-এর দৃষ্টিগোচর করেন দোতলার পূর্ব অংশের ভাড়াটিয়া মোসাম্মৎ জমিলা খাতুন।

পরিস্থিতি বোঝার জন্য বাসার দারওয়ান-কাম-কেয়ারটেকার কাদেরকে নিয়ে তরুণদের সাথে কথা বলতে যান মালেক সাহেব। তরুণরা তাকে জানায় যে তার ছেলেকে কুদ্দুছকে এলাকার মান-সম্মান মাটিতে মিশিয়ে দেয়ার জন্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে এবং অবিলম্বে কমেন্ট মুছে দিয়ে, চিরতরে ফেসবুক ত্যাগ করতে হবে।

তাদের কথা শুনে মালেক সাহেব কুদ্দুছকে মোবাইলে কল দেন। পিতার কল এবং বাইরের হট্টগোল শুনে তিনতলার চিলেকোঠায় অবস্থানরত কুদ্দুছ নিজ শয়নকক্ষ থেকে ছাদে আসেন। তাকে দেখে তরুণরা আরও উত্তেজিত হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে কুদ্দুছ, মালেক সাহেব এবং কাদেরের সাথে তরুণদের তুমুল কথাকাটি হয়, যার একটি ভিডিও পোস্ট করেন উল্টোদিকের বাসার বারান্দায় দাঁতব্রাশরত হাতকাটা গেঞ্জি ও লুঙ্গিপরিহিত রহিম সাহেবের বেকার ছেলে জাহিদ। ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে গেলে এলাকার অন্যান্যরাও ধীরে ধীরে মালেক সাহেবের বাসার সামনে জড়ো হতে থাকে।

অবস্থা বেগতিক দেখে কুদ্দুছ পোষাক পাল্টে কিছু শুকনো খাবার এবং কোকের পুরোনো বোতলে দুই লিটার ফুটানো পানি নিয়ে পাশের বাসার সামিয়ার সহায়তায় উক্ত বাসার দেয়াল টপকে অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে পালিয়ে যান। এদিকে ঘটনার খবর জানতে পেরে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা মালেক সাহেবের বাসার সামনে জড়ো হন এবং বিষয়টি মধ্যস্ততার করার চেষ্টা করেন। আলোচনার জন্যে তারা মালেক সাহেবের বাসার সামনে থেকে মকবুলের টঙ্গের দোকানে গিয়ে বসেন।

আলোচনা ঘন্টা দুয়েক চলার পর অজানা গন্তব্য থেকে সামিয়ার মোবাইলে ইনস্টলকৃত জুম অ্যাপ মারফত তাতে যোগদান করেন কুদ্দুছ। বাবুর পোস্টে তার অনাকাঙ্ক্ষিত এবং অবমাননাকর মন্তব্যের জন্যে ক্ষমা চান। তিনি উপস্থিত সকলকে তাকে সামাজিক যোগাযোগ থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্যে অনুরোধ করেন। চার্জ শেষ হয়ে যাওয়া মোবাইল স্ক্রিনে ঝাপসা এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য মিলিয়ে যাওয়ার পরপরই দুপুরের খাবারের জন্য আলোচনা মূলতুবি ঘোষণা করা হয়।

মালেক সাহেবের নিজস্ব উদ্যোগে তার বাসার নিচে দস্তরখান পেতে কাচ্চি বিরিয়ানী, জালি কাবাব, বোরহানী, ফিরনী এবং কোক সহযোগে দুপুরে আহার সারেন। এরপর ঘরোয়া পরিবেশে আলোচনা আবারও চলতে থাকে। চটপটি, আলুর চপ, চিকেন কাটলেট, সিংগারা এবং দুধ চা দিয়ে বিকেলের নাস্তা সারার কিছুক্ষণ পর বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী তাদের কঠোর অবস্থান থেকে দূরে সরে আসেন। সকলের অনুরোধে মূল পোস্টটি রিমুভ করার সিদ্ধান্ত নেন বাবু।

এক আবেগময় বক্তব্যে বাবু সবাইকে জানান যতদিন তিনি বেঁচে আছে ততদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি কোনও খাবারের ছবি পোস্ট করবেননা। তার এই কথা শুনে উপস্থিত সকলের চোখে পানি চলে আসে। তারা সবাই একে একে তাকে জড়িয়ে ধরেন। এর এক পর্যায়ে ভুলোমনা সত্তরোর্ধ জলিল সাহেব বাবুকে আপ্যায়ন করার সময়, “বাবু খাইছো?” বলার পর আবার কিছুটা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলেও সকলের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকে।

আলোচনা শেষে পাড়ার মুরব্বীদের নির্দেশনায় মালেক সাহেব এবং বিক্ষোভকারীদের নেতা রনি ওরফে জনি সহ একটি দল পাড়া থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে শহরের প্রান্তে অবস্থিত একটি পাটক্ষেত থেকে কুদ্দুছকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। মকবুলের দোকানে তাকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন পাড়ার মুরব্বীদের প্রতিনিধি সামিয়ার বাবা আফসার সাহেব।

সন্ধ্যা নাগাদ রনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কুদ্দুছের সাথে তার কোলাকুলির একটি ছবি পোস্ট করেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে ভবিষ্যতে তারা আলোচনার মাধ্যমেই সকল সমস্যার সমাধান করতে পারবেন। পোস্টে কুদ্দুছকে ‘লাভ’ রিয়েক্ট দিতেও দেখা যায়।

বাস্তবে সমস্যা সমাধানের দিকে এগিয়ে গেলেও এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে বয়ে চলেছে আলোচনার ঝড়। গত ২৪ ঘন্টায় ফেইসবুক এবং ট্যুইটারে এর সাথে সম্পর্কিত #সেইভকুদ্দুছ #মেইকবাংলাগ্রেটএগেন #বিকেএম (বাবুখাইছোম্যাটারস) হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করেছেন প্রায় লক্ষাধিক মানুষ।

এক নাতিদীর্ঘ ফেসবুক পোস্টে সাবেক ট্যানারীপাড়া নিবাসী এবং জনপ্রিয় ফেসবুকার জুলমত আলি এই ঘটনার জন্য অনগ্রসর, পশ্চাতপদ, অনুদার ট্যানারীপাড়া সংস্কৃতিকে একচেটিয়াভাবে দায়ী করেন। একমাত্র পাশ্চাত্যের শিক্ষা ছাড়া এ দুষ্টচক্র থেকে ট্যানারীপাড়ার কোনও নিস্তার নেই বলে তিনি মত দেন। এর বিপরীতে আরেক সাবেক ট্যানারীপাড়া নিবাসী অনিন্দ্য স্বপ্নীল জানান যে এক সময় ট্যানারীপাড়াকে বানরীপাড়া আখ্যা দিয়ে বিমানবীকরণের করার চেষ্টা করেছে আশেপাশের প্রভাবশালীরা। সুতরাং এই ঘটনার পেছনেও এরকম কোনও কিছু থাকতে পারে। তিনি ট্যানারীপাড়ার জনগণকে চোখকান খোলা রাখার অনুরোধ জানান।

এদিকে শেষ খবর পাওয়ার পর্যন্ত ট্যানারীপাড়ার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ শান্ত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সূত্র এই প্রতিবেদককে জানান একজন পুরুষের পোস্টে “বাবু খাইছো” মন্তব্য এবং পলায়নরত অবস্থায় পাটক্ষেতে তার অবস্থানের কারণে কুদ্দুছকে নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে তার প্রেক্ষিতে মালেক সাহেবে আজ রাতেই সামিয়ার সাথে তার বিয়ের কথা পাকা করতে আফসার সাহেবের বাসায় যাচ্ছেন। এই গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই রহিম সাহেবের ছেলে জাহিদকে উদ্ভ্রান্তের মতন ঘুরতে ঘুরতে মকবুলের দোকানে গিয়ে একটার পর একটা সিগারেট টানতে দেখা গেছে।

স্থানীয় প্রতিবেদক,
দৈনিক শেষের আঁধার

পোষ্ট কার্টেসিঃ Nayel Rahman

সর্বাধিক পঠিত