প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আরিফ জেবতিক: খিচুড়ি রান্না শেখা, কে হায়, আমলা-কামলাদের ব্যথা দিতে ভালোবাসে!

আরিফ জেবতিক: বাংলাদেশে যেকোনো প্রজেক্টের বাজেট দুটো জিনিস অবশ্যই রাখার চেষ্টা করা হয়। প্রথমটি হচ্ছে গাড়ি, দ্বিতীয়টি হচ্ছে বিদেশ ভ্রমণ। ধরা যাক সরকার সব কর্মকর্তাদের জন্য বল পয়েন্ট কিনবে, ১ লাখ বল পয়েন্ট। বল পয়েন্টের পাইকারি দাম প্রতি পিস ২ টাকা। তাহলে প্রাক্কালিত ব্যয় ধরা হবে প্রতি পিস ১০ টাকা, দাম হবে ২ লাখের জায়গায় ১০ লাখ টাকা। তারপরই প্রজেক্ট অফিসারদের জন্য গাড়ি কেনা হবে ১ কোটি টাকার আর কলমের ক্যাপ কীভাবে খুলতে হয়, সেটা শেখার জন্য বিদেশ সফরের বাজেট আরও ১ কোটি টাকা। সুতরাং প্রজেক্ট কস্ট দাঁড়াবে এখানেই ২ কোটি ১০ লাখ টাকা। আরও কী কী যে ঢুকাবে, জুম মিটিংয়ের আপেল জুস, সেই জুস ডেলিভারি খরচ, জুস খাওয়ার জন্য গ্লাস খরচ, জুস বাসায় রাখার জন্য ফ্রিজ এগুলোর কোনো আগামাথা নেই।

সুতরাং বালিশের দাম ৬ হাজার, বটির দাম ১০ হাজার আর পুকুর কাটা কিংবা খিচুড়ি রান্না শেখার জন্য বিদেশ যাওয়া চলতেই থাকবে, চলতেই থাকবে। এটি থামানোর চেষ্টা কেউ করে না। কে হায় আমলা-কামলাদের ব্যথা দিতে ভালোবাসে। কিন্তু থামানোর চেষ্টা করলে, প্রথমেই যেকোনো প্রজেক্টে দলে দলে বিদেশ সফর করা যাবে না, এরকম একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। প্রয়োজনে কনসালটেন্ট দেশে আনা যেতে পারে। প্রাইভেট কোম্পানিগুলো তাই করে। ধরুন দেশে এই যে ফ্রিজ বানায়, টায়ার বানায়, কাচ বানায়, এমনকি যে দামি দামি আইসক্রিম বানায় কিন্তু দলে দলে লোক বিদেশ পাঠায় না। তারা বিদেশ থেকে কনসালটেন্ট হায়ার করে। সেই কনসালটেন্ট বাংলাদেশে থাকে। খায়, ঘুমায় এবং এখানকার পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী কাজ করে। প্রজেক্ট মোটামুটি দাঁড়িয়ে গেলে, পকেটে টাকা গুজে ফেরত যায়। দরকার হলে বিদেশ থেকে খিচুড়ি ইন্সট্রাকটর নিয়ে আসেন। যে খিচুড়ি বানাবে সে এসে এখানকার লোকাল ডাল দেখবে, চাল দেখবে, তেল দেখবে, গ্যাসের চুলার চাপ মাপবে, আমাদের বাচ্চাদের গড় উচ্চতা আর ওজন মেপে সে অনুযায়ী ফর্মুলা দেবে। কীভাবে কম লোকবল নিয়ে খিচুড়ি রান্না করা যায় সেটার প্রসেস ফ্লো তৈরি করবে। তারপর সেই সিস্টেম অনুযায়ী জেলা উপজেলার কর্মকর্তাদের নিয়ে ট্রেইনিং দিলেই ল্যাটা চুকে যায়।

আমি দুই তাইওয়ানি ইঞ্জিনিয়ারকে দেখেছি সিলেটের রাস্তাঘাটে দাঁড়িয়ে রাস্তা পরীক্ষা করে। এরা এসেছে একটা টায়ার কোম্পানির কনসালটেন্ট হয়ে। কিন্তু বাংলাদেশের রাস্তার সাথে তাদের রাস্তার কোনো মিল নেই। আমাদের রাস্তার পিচ বালির অনুপাত ভিন্ন, রোদে পিচ গলে যায়, বড় বড় গর্ত-তারা সেগুলো মেপে মেপে টায়ারের ফর্মুলা বানাচ্ছে এই দেশের মতো করে।

শর্ট বিদেশ ভ্রমণে আসলে জ্ঞান অর্জন করা যায় না, জ্ঞান এতো শস্তা নয় যে, আলী এক্সপ্রেসে অর্ডার দিয়ে ক্রেডিট কার্ডে কিনে নিলেন। তাই যারা আমলা, তাদের পক্ষে এই জ্ঞান সংক্ষিপ্ত সফরে গিয়ে অর্জন করা সম্ভব না। এরা বেশ কিছু শপিং করে আর স্পাতে গিয়ে মেসেজ নিয়ে ফেরত চলে আসবে, চেষ্টা করলেও জ্ঞান ও প্রসেস আয়ত্ত্ব করতে পারবে না। অনেকের মনে আছে, ঢাকায় একটা ট্রেন চালু করা হয়েছিলো দুই দিকে ইঞ্জিন দিয়ে। (নাম ভুলে গেছি ট্রেনটার।) তো এটা আসার পরে দেখা গেলো। এই ট্রেন আমাদের প্লাটফরম থেকে প্রায় ৩ ফুট উঁচু। বয়স্করা বা শারীরিক অসুবিধা আছে এমন কেউ সহজে উঠতে পারে না। তাছাড়া জানালাগুলো খুবই ছোট, ভেতরে গরমে বসা যায় না। অথচ গুচ্ছের অফিসার গিয়ে এই ট্রেন ইন্সপেকশন করে এসেছে বিদেশে, প্লাটফরমের উচ্চতা কিংবা ঠান্ডা দেশের ট্রেনের জানালার মাপ যে গরমের দেশে চলবে না, সে বিষয়ে তাদের কোনো ধারণাই ছিলো না। কারণ এরা তো প্রসেস ও প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের লোক না। এরা জেনারেল লাইনের লোক। সততার সাথে করলেও তারা টেকনিক্যাল এই বিষয় গুলো ধরতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে বরং কনসালটেন্ট এনে এই দেশের বিবেচনায় ট্রেনের ডিজাইন করানো যেতো। যাই হোক এসব বলে তেমন লাভ নেই। এগুলো কেমনে থামানো যায় তা সবাই জানে। কিন্তু কেউ থামাতে চায় না। বলতামও না। কিন্তু এই যে সারাদিন মাস্ক পরে, গ্লাভস পরে কাজ করে ঘর্মান্ত হয়ে ঘরে ফিরলাম। সেই আয়ের একটা বড় অংশ এদের পালার জন্য ট্যাক্স দেই। এই ট্রাজেডি সহ্য না হলে মাঝে মাঝে বলে ফেলি, এই আর কী। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত