প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিনিয়োগে বাধার যেন শেষ নেই

ডেস্ক রিপোর্ট : বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য সারা দেশে ১০০টি ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠার কাজ করছে বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন কর্তৃপক্ষ (বেজা)। কিন্তু সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে একটি সার্কুলার ইস্যু করে এসব ইকোনমিক জোনে জমি ইজারার ক্ষেত্রে নতুন করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের মাথায় রীতিমতো মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে চেপেছে। এমনিতেই করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে বিশ্বব্যাপী অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

ফলে থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিনিয়োগ টানতে নানা ধরনের ছাড় দিচ্ছে। আর বাংলাদেশে ঘটেছে এর ঠিক উল্টো। ছাড় না দিয়ে জমি ইজারার ক্ষেত্রে আরও নতুন করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে, যা বিনিয়োগের জন্য অন্যতম প্রধান বাধা বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

খোদ বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, এটা বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করবে। আর এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেছেন, ইকোনমিক জোনের জমি ইজারার ওপর নতুন করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করায় বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হবেন। এতে বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাসও কমে যাবে। ফলে পরিস্থিতি বিবেচনায় এটা প্রত্যাহার হওয়া উচিত। অন্যদিকে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী কে বলেন, ‘বিনিয়োগ বাড়াতে করনীতিসহ জমি প্রাপ্তি সহজ করতে আমরা বদ্ধপরিকর। এ মুহূর্তে নতুন করে কোনো ধরনের কর আরোপ বিনিয়োগকারীদের জন্য এক ধরনের বাধা হিসেবেই কাজ করবে। ফলে তারা নিরুৎসাহিত হবেন।’

এদিকে এ সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারি ইকোনমিক জোনে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বেজার বোর্ড অব ডিরেক্টরদের একটি বৈঠক ডাকা হয়েছে আগামী ২০ আগস্ট। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, অন্তত কভিড মহামারী পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে অতিরিক্ত এই ভ্যাট প্রত্যাহার করবে সরকার। সূত্র জানায়, দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে মন্থর গতি দীর্ঘদিন থেকেই। নানা ধরনের ঝুঁকি নিয়েই বিনিয়োগ করে আসছিলেন উদ্যোক্তারা। এর মধ্যে রয়েছে আমলাতান্ত্রিকতা, ভ্যাট ও করনীতির জটিলতা। এ ছাড়া কারখানা স্থাপনের জমি বরাদ্দ পাওয়ার প্রক্রিয়াও বেশ জটিল। এতে আগ্রহ হারান উদ্যোক্তারা। অন্যদিকে দেশি ও বিদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য পৃথক পৃথক ভ্যাট-করনীতিও বিনিয়োগকারীদের বাধার মুখে ফেলে দেয়। এজন্য সহজ করনীতি, সহজ জমি প্রাপ্তি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন ছাড়া দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিনিয়োগকারীরা। খোদ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন অথরিটিও (বেজা) মনে করে, বিনিয়োগের জন্য দরকার সহজ করনীতি। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ-সংক্রান্ত বৈঠকেও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এসব বাধার কথা উঠে এসেছে।

সূত্র জানায়, বর্তমানে করোনাভাইরাস প্রেক্ষাপটে স্থানান্তরিত বিনিয়োগ ধরতে না পারার কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে দেশে কোনো ইনসেনটিভ বা প্রণোদনার ব্যবস্থা না থাকা। এ ছাড়া আছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে ভেটিং না করে প্রকল্পের বা অন্য এজেন্সির সঙ্গে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর, দেশি এবং বিদেশি কোম্পানির মধ্যে করপোরেট করের বৈষম্য, দেশি ও বিদেশি কোম্পানির জন্য ভিন্ন বিনিয়োগ নীতি, দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ সম্পর্কে বহির্বিশ্বে ইতিবাচক ভাবমূর্তি ও ঘাটতি, পিপিপিতে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত কর ও ভ্যাট জটিলতা, এনআরবি অ্যাকাউন্টধারী বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ ও মূলধন নিয়ে যাওয়া নিয়ে সমস্যা, ব্যাংকিং পদ্ধতিতে জটিলতা, অনিবাসীদের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উচ্চ করহার, বিদ্যমান পলিসি বাস্তবায়নে জটিলতা এবং অনলাইনে ব্যাংক হিসাব খোলার সীমাবদ্ধতা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন অথরিটির (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী বলেন, ‘জমি ইজারার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে তা বিনিয়োগের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। বিনিয়োগের সুবিধার্থে কর ও ভ্যাটনীতি আরও সহজ করা দরকার এটাও আগে থেকেই বলে আসছি। এ ছাড়া জমি বরাদ্দের ব্যাপারে যত রকম জটিলতা রয়েছে সেগুলো দূর করার চেষ্টা করছে বেজা। এজন্যই সারা দেশে ১০০টি ইকোনমিক জোন তৈরি করা হচ্ছে। জাপান, কোরিয়া, চীনসহ বিনিয়োগকারী অন্য দেশগুলোকে পৃথকভাবে ইকোনমিক জোন বা জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এর বাইরে আরও অনেকগুলো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’ এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে দেশি-বিদেশি উভয় ধরনের বিনিয়োগ বাড়বে বলে তিনি মনে করেন। এসব জোনে আগামী কয়েক বছরে অন্তত ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

জানা গেছে, চলমান করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে যেসব বিনিয়োগ স্থানান্তরিত হচ্ছে, তা ধরতে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়াসহ অনেক দেশ এরই মধ্যে প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। দেশটিতে নতুন শিল্প স্থানান্তরের ক্ষেত্রে ১৩ বছরের জন্য কোনো জমির ভাড়া না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে থাইল্যান্ড। একই রকম ঘোষণা দিয়েছে ইন্দোনেশিয়া। কভিডের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে অর্থনীতি চাঙ্গা রাখতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ট্যাক্স হলিডেসহ নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়েছে ফিলিপাইন, মিয়ানমার ও ভিয়েতনাম। এ ছাড়া নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পাঁচ বছর জমির কোনো ভাড়া নেবে না- এমন ঘোষণা দিয়েছে ইন্দোনেশিয়া। অথচ বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বললেও এ ধরনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি বাংলাদেশ।

এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমি মনে করি জমি ইজারার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করায় বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হবেন। এতে তাদের আস্থা ও আত্মবিশ্বাসটা নষ্ট হয়ে যাবে, যা এ মুহূর্তে করা ঠিক হবে না বলে তিনি মনে করেন। কেননা কভিড-১৯ মহামারীর কারণে এমনিতে সবাই বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। অনেক বিনিয়োগকারীই পুঁজির সংকটে রয়েছেন। এর মধ্যেই যদি এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয় সেটি তো বিনিয়োগের জন্য সুখকর হবে না।’বাংলাদেশ প্রতিদিন

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত