প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

১] ”আগর” বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া সবচেয়ে মূল্যবান পণ্য!

মুসবা তিন্নি : [২] বছরে শত কোটি টাকার আতর যাচ্ছে বিদেশে ও মৌলভীবাজার জেলার আগর গাছ থেকে তৈরি হচ্ছে মূল্যবান তরল আতর। ইউরোপ-মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের অনেক দেশেই চড়া দামে রফতানি হচ্ছে পণ্যটি। এটি মৌলভীবাজারের সবচেয়ে বিস্তৃত শিল্প। এরকম ব্যাপক আর সংগঠিত অন্য কোনো শিল্প মৌলভীবাজারে নেই।

[৩] দেশের নিবন্ধিত ১২১টি আগর তৈল তৈরির কারখানার মধ্যে সিলেটে রয়েছে ২টি। বাকি সবগুলো মৌলভীবাজারে। মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সুজানগর আগর উৎপাদনের এলাকা হিসেবে দেশে বিদেশে পরিচিত।

[৪] বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে মৌলভীবাজার জেলার মধ্যে আগর ব্যবসার মূল কেন্দ্র বড়লেখা উপজেলায় ১১১টি, কুলাউড়া উপজেলায় ৬টি, কমলগঞ্জ উপজেলায় ২টি এবং সিলেট সদরে ২টি আগরের কারখানা রয়েছে। তবে স্থানীয় লোকজন জানান, ব্যক্তি পর্যায়ে ৩০/৩৫ জন ব্যবসায়ী আগর উৎপাদন করে আসছেন। তারা তাদের উৎপাদিত আগর তেল স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেন। তাই সরকারি কোনো হিসাবে আসেন না। এসব আগরের কারখানার মধ্যে শুধুমাত্র সিলেটের দুটিতে জ্বালানি হিসেবে গ্যাস ব্যবহার করা হয়। অন্য ১১৯টি কারখানায় জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহৃত হয়।

[৫] মৌলভীবাজারের সুজানগরে ৩৫০টির বেশি ছোট-বড় আতর তৈরির কারখানা রয়েছে। এ শিল্পে জড়িত ৩০-৩৫ হাজার নারী-পুরুষ। সুজানগর, বড়থল, রফিনগর ও হালিজপুর গ্রামে আগর চাষ হচ্ছে। মৌসুমি ব্যবসা হওয়ার কারণে এখানকার নারী-পুরুষরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এ কাজে নিয়োজিত হচ্ছেন।

[৬] প্রায় ৩০০ বছর আগে থেকে মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার সুজানগরের আগর-আতর ক্লাস্টারের সমাদর রয়েছে। আরব বণিক থেকে ভারতীয় ব্যবসায়ী সবাই ছুটে এসেছেন এর সুবাস নিতে। বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যসহ সবখানেই এখানকার আতরের কদর রয়েছে।

[৭] আগর-আতর উৎপাদনকারীরা জানান, আগর গাছের ছাল-বাকলসহ সব অংশই মূল্যবান। বেশি আতর পেতে প্রতিটি আগর গাছে ২ ইঞ্চি পর পর পেরেক মারা হয়ে থাকে। গাছ বড় হওয়ার পর সেটি ছোট ছোট টুকরো করা হয়। এসব টুকরো তিন মাস পর্যন্ত ভিজিয়ে রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে চুলার মাধ্যমে দীর্ঘক্ষণ তাপ দিলে সেখান থেকে এক ধরনের রস বের হয়। ওই রসের উপরিভাগের তৈলাক্ত অংশ হাত দিয়ে তুলে উৎপাদন করা হয় আতর।

[৮] আগর থেকে উৎপাদিত প্রতি তোলা আতরের দাম ৬ হাজার টাকার বেশি। বিদেশের বাজারে এই একই আগর বিক্রি হয় মান ভেদে ৫ থেকে ৩০ হাজার ডলারে। এ কারণে আগরকে বাংলাদেশের ‘তরল সোনা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। আগর কাঠ থেকে তৈরি হয় আতর, আগরবাতি। মধ্যপ্রাচ্যে আগরের কদর অনেক। প্রতিবছর কয়েকশো কোটি টাকার আগরের পণ্য রফতানি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য সহ সারা দেশে।

[৯] আতর ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, বৈধ উপায়ে নানা হয়রানির শিকার হওয়ায় ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন আর্ন্তজাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আতর রফতানি করছেন, কেউ কেউ যাত্রীদের মাধ্যমেও বিদেশ পাঠাচ্ছেন। যার ফলে সিলেট আঞ্চলিক রফতানি ব্যুরোর কাছে নেই এর সঠিক হিসাব। বড়লেখা আতর-আগর রফতানির পরিমাণ বছরে ১০০ কোটি টাকার উপরে। তাদের তৈরি আতর সৌদি আরব, ইরাক, ইরান, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রোচ্যের প্রতিটি দেশ ছাড়াও ইউরোপে রফতানি হচ্ছে। বিদেশে আতরের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও তারা সে অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছেন না। আবার যতটুকু উৎপাদন করছেন, তাও সরবরাহ করতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রষ্ঠপোষকতা পেলে দেশের ৫ হাজার কোটি টাকার আগর ব্যবসা ১০ হাজার কোটি টাকায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

[১০] আন্তর্জাতিক বাজারে আগরের মূল্য সম্পর্কে ধারণা নেয়া যাক :-
ভালো মানের আগর কাঠের মূল্য প্রতি কেজি প্রায় ৭.৭৫ লক্ষ টাকারও বেশি হয়ে থাকে। চাষ হওয়া গাছের প্রতি কেজি আগর কাঠের মূল্য ৫০০০ ডলার বা প্রায় ৩.৮৭ লক্ষ টাকা। এভারেজ মানের আগর তেলের প্রতি কেজির মূল্য ৮০০০ ডলার বা প্রায় ৬.২০ লক্ষ টাকা। আশ্চর্যজনক তথ্য হলো উচ্চ মানের আগর তেল ৫০,০০০ ডলার বা প্রায় ৩৮.৭৫ লক্ষ টাকার বেশি মূল্যে বিক্রি হয়। প্রতিবছর সিংগাপুর থেকে ১.২ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৯,৩০০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের আগর জাত সামগ্রী রপ্তানি করা হয়। সিলেটের আগর চাষের ইতিহাস প্রায় ৪০০ বছরের পূরাতন। বন বিভাগর মাধ্যমে দেশের কিছু এলাকায় আগর বাগান করা হয়েছে। তাছাড়া চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ব্রাক এর নিজস্ব বাগানে ২০০৭ সাল থেকে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বল্প সময়ের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে আগর কাঠ সংগ্রহের লক্ষ্যে আগর প্লান্টেশন এর একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে জানা যায়।

[১১] আগর উৎপাদনকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শিল্প হিসেবে ঘোষণা করেছেন। বাংলাদেশের সিলেট, চট্টগাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে আগর চাষের জন্য উপযোগী ভূমি রয়েছে এবং বর্তমানে সেখানে আগরের আবাদ হচ্ছে। উৎপাদিত আগরের মান নিয়ন্ত্রণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মান সম্পন্ন আগর উৎপাদন করতে না পারলে বিদেশে ভাল দাম পাওয়া যাবে না। তাই উৎপাদিত আগরের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য একাধিক ল্যাবরেটরি স্থাপন করতে হবে। ইতোমধ্যে মৌলভীবাজারে ল্যাবরেটরি স্থাপন হচ্ছে। সনাতন পদ্ধতির বদলে আগর তেলসহ অন্যান্য আগরজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব হলে আগর শিল্পে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করতে পারে।

[১২] আগর চাষ বিষয়ে আমাদের আধুনিক কারিগরী জ্ঞানের অভাব রয়েছে। সনাতন চাষ পদ্ধতির কারণে পণ্যের মানও কম। আগর শিল্পে আমাদের সবচেয়ে সমস্যা অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য ও উচ্চ রপ্তানি শুল্ক।
সম্ভাবনাময় এই শিল্পকে এগিতে নিতে হলে সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির ব্যবহারের বিকল্প নেই। এ বিষয়ে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ভারত প্রভৃতি দেশের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। তাছাড়া যারা বংশ পরম্পরায় আগর চাষের সাথে জড়িত, তাদের উন্নত প্রযুক্তি ও সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার আওতায় এনে এ শিল্পকে দ্রূত সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। সরকারি পলিসি সাপোর্ট পাওয়া গেলে এ খাতে বিনিয়োগের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাবে। ফলে আগর শিল্প বাংলাদেশে একটি অন্যতম বৈদেশিক মূদ্রা অর্জনকারী খাত হিসেবে স্থান করে নিবে। সূত্র : ইতিহাস ও মিথলজি, উইকিপিডিয়া । সম্পাদনা : খালিদ আহমেদ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত