প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. শোয়েব সাঈদ : জাপানে কোভিড সৌজন্যতা, দায়, লজ্জা

ড. শোয়েব সাঈদ : newspaper Illness বা অসুস্থতা থেকে আই বা আমিটা সরিয়ে উই বা আমরা লাগিয়ে দিলে হয়ে যায় Wellness বা কল্যাণ। যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার প্রবক্তা ম্যাল্কম এক্স এর বিখ্যাত এই উক্তিটি কোভিড যুদ্ধে মানব সভ্যতার জন্যে সবচেয়ে বড় অস্ত্র। Illness কে Wellness এ রূপান্তরণে “আমরা” শব্দটির বিরাট ভূমিকা। লকডাউন শিথিল বা কঠোর, রাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত বা স্বেচ্ছা প্রণোদিত যে কোন অবস্থায় “আমিত্ব” ছেড়ে “আমরা বা আমাদের” এই যুদ্ধ জয়ের মূল কৌশল। সমষ্টিগত এই কৌশলে নিবেদিত জাপানের করোনা যুদ্ধে বিজয় নিয়ে জাপান টাইমসে গত ২২শে মে প্রকাশিত পল ডে ভ্রিসের COVID-19 versus Japan’s culture of collectivism শীর্ষক একটি আর্টিক্যাল পড়ছিলাম। প্রবন্ধে বিভিন্ন প্রসঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে, ঐদিকে না গিয়ে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে জাপানি সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রোথিত কিছু ফ্যাক্টরকে এড্রেস করা হয়েছে বিজয় ত্বরান্বিত হবার জন্যে। লেখাটি পরে ভাবছিলাম “তাইতো”, এটাই তো সেই জাপান আর তাঁদের কালচার যা বিশ্বে অন্যদের থেকে পজিটিভ বৈচিত্রে আলাদা যা কেবল তাঁদের পরিচয় বহন করে। সংস্কৃতি আর আচার ব্যবহারে রেজিমেন্টেড একটি সমাজ রাষ্ট্রের সংকট মোকাবিলায় সফলতার পরিচয় দেবে এটাই তো স্বাভাবিক। সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে জাপানে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ১৬৬২৮ আর মৃত্যু ৮৫১। বেশী ক্ষতিগ্রস্ত আর অব্যবস্থাপনার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুলনা নাই দিলাম, দায়িত্বশীল কানাডার সাথে মেলাতে গেলেও দেখা যায় যে জনসংখ্যায় কানাডার প্রায় ৪ গুন হয়েও সংক্রমণে কানাডার ৫ ভাগের একভাগ আর মৃত্যুতে প্রায় ৮ ভাগের একভাগ। জাপান প্রথম থেকেই করোনাকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল।

সামার অলিম্পিক বন্ধের আগ পর্যন্ত গুজব ছিল সরকার করোনার খবর লোপ্রোফাইলে রাখতে চাচ্ছে। অলিম্পিক ২০২১ সালে নিয়ে যাবার ঘোষণার পরপরই জাপানে শুরু হয় চেরী দর্শন বা হানামি উৎসব যাতে পার্কে পার্কে বিপুল লোক সমাগম হয়। জাপানে কখনই আনুষ্ঠানিক লকডাউন ছিলনা এবং সংবিধান অনুসারে সরকারের সেই ক্ষমতাও নেই। হানামিকে কেন্দ্র করে সংক্রমণের মাত্রা বেড়ে যাওয়াতে অনেকেই ভাবছিলেন জাপান আবার যুক্তরাষ্ট্রের মত হয়ে যায় কিনা। এই রকম অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ৭ই এপ্রিল টোকিও সহ পরিস্থিতি অবনতি হয়েছে এমন প্রিফেকচারগুলোতে জরুরী অবস্থা জারী করেন, পরবর্তীতে জরুরী অবস্থা ৪৭ প্রিফেকচারের সবগুলোতে বলবৎ করেন। জরুরী অবস্থার ছায়ায় বল প্রয়োগের চাইতে জাপানিজ স্টাইলের “ওনেগাই” মানে “প্লিজ” ধরণের লকডাউনে জনগণ গণহারে মূলত তিনটি C এড়িয়ে চলেছে; confined, crowded spaces, close human contact। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টেস্ট টেস্ট টেস্ট পলিসি জাপান প্রয়োগ করেনি; টেস্টের পরিমান খুবই কম ছিল, তাই বলে গুরুতর রোগী চিহ্নিত করে অসুবিধে হয়নি বা বিনা চিকিৎসায় মারা যায়নি। ব্যাপক টেস্টে মেধা জনবল নিয়োজিত করার চাইতে জাপান শুধুমাত্র সিরিয়াস রোগীদের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করেছে। ফলে বিশ্বের অন্যতম সেরা মেডিকেয়ার সিস্টেমের দেশ জাপান তেমন কোন চাপ ছাড়াই পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছে। জরুরী অবস্থা তোলার বিষয়ে জাপান সরকার নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সংক্রমণের ন্যুনতম সংখ্যা সহ টেঁকসই সাফল্যের জন্যে কিছু শর্ত পূরণের বিষয় নির্ধারণ করেছিল। শর্ত পূরণ হলেই জরুরী অবস্থা তুলে নেওয়া হবে। সরকারে কোভিড ব্যবস্থাপনা পলিসি জনপ্রিয় ছিলনা, বিশেষ করে টেস্টের স্বল্পতা। প্রধানমন্ত্রী আবের জনপ্রিয়তা করোনা ব্যবস্থাপনা পলিসিতে ৫৭ শতাংশ থেকে ২৯ শতাংশে নেমে যায়। জনকল্যাণমূলক সরকার জনপ্রিয়তার চাইতে জনগণের কল্যাণে রাজনৈতিক পরিণতি নির্বিশেষে ঝুঁকি নেবার সাহস রাখে এবং আবে বলিষ্ঠভাবে সেই সাহস দেখিয়েছেন। একটা ভিন্ন ধারার কোভিড ব্যবস্থাপনায় দেড় মাসের মধ্যে জাপান আপাতত বিজয়ে জরুরী অবস্থা তুলে নিয়েছে। পরিস্থিতি খারাপ ছিল বা শর্ত পূরণে সময় লাগা হোক্কাইডো, টোকিও, কানাগাওয়া, সাইতামা, চিবা প্রিফেকচারগুলোর শর্ত পূরণের মধ্য দিয়ে জরুরী অবস্থা প্রত্যাহার করে প্রধানমন্ত্রী আবে গত সোমবারে ১২ কোটি ৬০ লক্ষ মানুষের “জাপান মডেলের” সক্ষমতা প্রদর্শন করলেন।

জাপানের ৭০% পাহাড়, পর্বত হওয়াতে শহরগুলোতে জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশী। তাছাড়া টোকিও এবং জাপানের বড় বড় শহরগুলোর পাবলিক ট্রান্সপোর্ট করোনা বিস্তারে খুবই উপযোগী একটি মাধ্যম। এরকম জটিল এক সমীকরণে, ইউরোপীয় ধরণের লকডাউনে না গিয়ে, এমনকি কানাডার মত বাধ্যবাধকতার পথে না হেঁটে বিপুল জনসংখ্যার দেশ জাপানের এই সাফল্যে ব্যাতিক্রমী কিছু ফ্যাক্টর অবশ্যই কাজ করেছে। সরকারের ব্যবস্থাপনা ছিল এবং এই ব্যবস্থাপনা চট করেই ধরতে পেরেছিল জাপানি সমাজের সামাজিক আর সাংস্কৃতিক দৈনন্দিন মেলোডিটুকু এবং কোভিড যুদ্ধ কৌশলে রণসজ্জাও ছিল সেই আঙ্গিকে। জাপানের কোভিড বিজয়ে সবচেয়ে বেশী মূল্যায়ন করা করা হচ্ছে জাপানীদের ঐতিহ্যগত মূল্যবোধের কিছু ফ্যাক্টরকে।

জাপান সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে, তাঁদের মননে জাপানীদের সম্পর্কে ভাবতে গিয়ে সৌজন্যতা, দায়বদ্ধতা আর লজ্জা পাবার প্রবণতার বিষয়টি উঁকি দেবার কথা। এগুলো জাপানিদের দৈনন্দিন আচার ব্যবহারের অংশ। জাপানের ওয়াকিবহাল মহল, রাজনৈতিক সহ বিশ্ব মিডিয়ায় ফলাও করে বলা হচ্ছে জাপানীদের তিনটি মোটিভেশনাল মূল্যবোধ সৌজন্যতা, দায় আর লজ্জা কোভিড যুদ্ধে

বিজয়ের মূলমন্ত্র। জাপানি সমাজে সৌজন্যতার অর্থ হচ্ছে অন্যের সুবিধে অসুবিধের প্রতি নিজের ভেতর থেকে উঠে আসা সন্মানবোধাশ্রিত নজরদারী । এদের কাছে দায় এর অর্থ হচ্ছে নিজের ব্যাক্তি স্বার্থের চাইতে গোষ্ঠী বা দলবদ্ধ স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া আর লজ্জার সংজ্ঞা হচ্ছে গোষ্ঠী বা সমাজের চোখে নিজে দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রতিপন্ন হওয়া।

জাপানি সমাজে কারো সাথে ধাক্কা লাগলে, কে দায়ী বুঝার আগেই সুমিমাসেন বা সরি বলে দিয়ে সরে যাওয়া একটা ট্রিপিক্যাল প্যাটার্ন। ওরা কিন্তু স্টুপিড নয়, ধাক্কা কে দিয়েছে ঠিকই বুঝে, রাগ হলে নিজে নিজে গরগর করবে কিন্তু প্রথম কাজটা হবে সরি বলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা। যখন বুঝবে নিজেই দায়ী তখন বারবার সরি বলতে থাকবে। সংকট মুহূর্তে দোকানে গেল পানি কিনতে, না ওরা পুরো কার্টুন কিনে নিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা হবেনা। পেছনে তাকিয়ে দেখবে কতজন অপেক্ষা করছে, সবাই যাতে পায় তাই নিজে একটি বোতল কিনে চলে আসবে। দোকানে কর্মী না থাকলেও পয়সা ফাঁকি দিবে না, বক্সে রেখে যাবে। আর লজ্জা যাকে বলে “হাজুকাশি”, এই হাজুকাশি মূলত কর্তব্য আর দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্যে। যার যে দায়িত্ব তা পালনে গাফলতিজনিত ব্যর্থতা এদের প্রাইডে আঘাত করে, ফলে আত্মহত্যা করতেও দ্বিধা হয় না। সরকারী অর্থ হরিলুটের যে ঘটনা আমাদের চারপাশে শুনি, দেশের পত্রিকায় দেখি, জাপানে তা ঘটলে সরকারী কর্মকর্তাসহ ঠিকাদার আর সংশ্লিষ্টদের লজ্জায় অপমানে আত্মহত্যার হিড়িক পরে যেত।

কোভিড যুদ্ধে জাপানীদের নিজস্ব এই মূল্যবোধ খুবই সক্রিয় থেকেছে। এমনিতেই সাধারণ সর্দি-কাশিতে এদের মধ্যে ব্যাপকভাবে মাস্ক পরার প্রবণতা আছে, যাতে অন্যের কোন প্রকার অসুবিধে না হয়। কাফুনশো বা পোলেন এলার্জির কারণে জাপানীদের ব্যাপকহারে সার্জিক্যাল মাস্ক পরার ঘটনা পশ্চিমাদের চোখে টিপ্পনী কাটার বিষয় হলেও কোভিড সংকটে এই অভ্যেস জাতিকে রক্ষা করেছে বলা যায়। কোভিড সংকটে জাপানীদের মাস্ক পরার ব্যাপকতা গ্রিনিজ বুক অব দ্যা ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে স্থান পাবার মত। মাস্ক পরা নিয়ে কোভিড সংকটে প্রথমদিকে বিশ্বব্যাপী কিছু বিভ্রান্তি থাকলেও, এক্ষণে মাস্ক পরার যৌক্তিকতা নিয়ে কোন বিতর্ক নেই। মাস্ক পরার গণঅভ্যেস বাংলাদেশে করোনা সংকটের লাগাম টেনে ধরতে পারত। এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে মাস্ক পরার কারণে জাপানীরা খুব কম সংখ্যক ড্রপলেট বাতাসে ছড়িয়েছে। সফট স্পোকেন, স্বল্পভাষী আর লো প্রিফাইলে থাকা জাপানীরা এমনিতেই বাতাসে কম ড্রপলেট ছড়ায়।

সমাজের প্রতি দায়দায়িত্ব পালনে শৈথিল্যজনিত যে লজ্জা, সেটি সামাজিক বা শারীরিক দূরত্ব বজার রাখতে জাপানীদের খুব সাহায্য করেছে। সরকারের আদেশ নয়, নিজ দায়িত্বে এরা এটি করেছে। দায়িত্ববোধে রেজিম্যান্টেড একটি কালচারে সরকারের পক্ষেও দেশ চালাতে সুবিধে। জাপানীদের হাত মেলানোর চাইতে মাথা নুয়ানো বা বো করার অভ্যেস, যেখানে সেখানে হাত লাগানোর কুঅভ্যেস না থাকায় করোনা ব্যবস্থাপনার ব্যাপক সুবিধে দিয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের ব্যাক্তি স্বাধীনতার সংজ্ঞা জাপানে একটু ভিন্নতর। যে জাতি লাঞ্চ টাইমে ধর্মঘট করে তারা লকডাউন খুলে দেবার জন্যে বিক্ষোভ করতে বরং লজ্জাই পাবে। লকডাউন শিথিলতায় পার্কে, বীচে হাজার মানুষের ঢলে প্রিমিয়ার বা মেয়র ক্ষুব্ধ হয়ে পার্কে ছুটে যাবার ঘটনা জাপানি কালচারে অচিন্তনীয়। বরং সরকারের সফট একশন যেমন বলপ্রয়োগ না করা কিংবা কম টেস্ট করার ঘটনায় জনগণ ক্ষুব্ধ। সরকার জনগণের পালস বুঝে বলে নিজে সফট থেকে জনগণকে এগিয়ে আসার সুযোগ দিয়েছে। এখানে সংস্কৃতির মেলোডিতা বুঝতে হবে। একই এপ্রোচ ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশ কিংবা অন্য কোন দেশে মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে।

প্রকাশ্যে হাঁচি কাশি দিতে যারা লজ্জা পায় না বরং মাস্ক পরতে লজ্জা যাদের, অন্যকে ধাক্কা দিয়ে লজ্জা পাবার সৌজন্যতার চেয়ে ঝগড়া করতে বীরত্ব যাদের, চিৎকার করে কথা বলা, চেঁচামিচি করার অভ্যেস যাদের, ফেলো ফিলিংসে অন্যের জন্যে কিছু রেখে দেবার চাইতে পুরোটাই দখলে নেবার মানসিকতা যাদের, সবাইকে নিয়ে ভাল থাকবার চাইতে একা ভাল থাকার ইচ্ছে যাদের কোভিড যুদ্ধটা তাঁদের জন্যে দীর্ঘ আর চরম মূল্যের হওয়াই স্বাভাবিক। জাপানীদের মত সৌজন্যতা, দায় আর লজ্জার মূল্যবোধে চলে যে জাতি তাঁদের পক্ষেই সম্ভব ক্যালকুলেটিভ পথে ননকনভেনশনাল পন্থায় কোভিড যুদ্ধে বিজয়ী হওয়া।

লেখকঃ কলামিস্ট এবং মাইক্রোবিয়াল বায়োটেক বিষয়ে বহুজাতিক কর্পোরেটে ডিরেক্টর পদে কর্মরত।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত