প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] গ্রাম সাংবাদিকতার পথিকৃৎ ছিলেন কাঙাল হরিনাথ!

মুসবা তিন্নি : [২] কাঙাল হরিনাথ বাংলাদেশের প্রথম সংবাদপত্রের জনক ও গ্রামীণ সাংবাদিকতার প্রবাদ পুরুষ। পুরোনাম হরিনাথ মজুমদার। যদিও তিনি ওই নামে খ্যাতিমান নন, পরিচিত কাঙাল হরিনাথ নামে। কাঙাল হরিনাথ এদেশে প্রথম বাংলা সংবাদপত্র ‘গ্রামবার্ত্তা’ প্রকাশ করেন এবং অগ্রসরমান সামাজিক ক্ষতগুলোকে তুলে ধরে সমাজ সংস্কারক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। চলমান সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতায় তার আদর্শ যেন আজ রূপকথারই মতো। আসলে তার সততা, দক্ষতা ও নিষ্ঠা একজন প্রকৃত নির্ভীক সাংবাদিকের আদর্শ হওয়া উচিত।

[৩] তার জীবন দর্শন থেকে তাই জানা যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীর কালজয়ী সাধক, সংবাদিক, সাহিত্যিক, সমাজসেবক ও নারী জাগরণের অন্যতম দিকপাল কাঙাল হরিনাথ । তৎকালীন সময়ে তিনি ইংরেজ নীলকর, জমিদার, পুলিশ ও শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে হাতে লেখা পত্রিকা ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’র মাধ্যমে লড়াই করেছেন। অত্যাচার ও জলুমের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন আপসহীন কলমযোদ্ধা। ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার ও সামাজিক কুপ্রথার বিরুদ্ধে লিখে নির্ভীক সাংবাদিকতার পথিকৃৎ হিসেবে ১৮৫৭ সালে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর প্রাচীন জনপদের নিভৃত গ্রাম থেকে তিনি হাতে লিখে প্রথম প্রকাশ করেন মাসিক ‘গ্রামবার্ত্তা’ প্রকাশিকা। হাজারো বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে তিনি এ পত্রিকাটি প্রায় এক যুগ প্রকাশ করেছিলেন। মাসিক থেকে পত্রিকাটি পাক্ষিক এবং পরবর্তীতে ১৮৬৩ সালে সাপ্তাহিক আকারে কলকাতার ‘গিরিশচন্দ্র বিদ্যারত’ প্রেস থেকে নিয়মিত প্রকাশ করেন। এতে চারদিকে সাড়া পড়ে যায়। ১৮৭৩ সালে হরিনাথ মজুমদার সুহৃদ অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়’র বাবা মথুরানাথ মৈত্রেয়’র আর্থিক সহায়তায় কুমারখালীতে এমএন প্রেস স্থাপন করে ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’র প্রকাশনা অব্যাহত রাখেন।

[৪] এই খ্যাতিমান সাধক পুরুষ কুষ্টিয়ার কুমারখালী শহরে ১২৪০ সালের ৫ শ্রাবণ (ইংরেজি ১৮৩৩) কুষ্টিয়া জেলার (তদানীন্তন পাবনা জেলার নদীয়া) কুমারখালী শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম হলধর মজুমদার এবং মা কমলিনী দেবী। তিনি ছিলেন মা-বাবার একমাত্র সন্তান। তার জন্মের পর শৈশবেই মাতৃ ও পিতৃবিয়োগ ঘটে। এরপর দারিদ্র্যের বাতাবরণে বেড়ে উঠতে থাকেন কাঙাল হরিনাথ। তার ৬৩ বছরের জীবনকালে তিনি সাংবাদিকতা, আধ্যাত্ম সাধনাসহ নানা সামাজিক আন্দোলন এবং কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। গ্রামীণ সাংবাদিকতা এবং দরিদ্র কৃষক ও সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের একমাত্র অবলম্বন কাঙাল হরিনাথের স্মৃতি আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। অথচ তিনি ছিলেন সংগ্রামী এক ভিন্ন নেশা ও পেশার মানুষ।

[৫] কাঙাল হরিনাথ নিজেই গ্রামগঞ্জ ঘুরে সংবাদ সংগ্রহ করতেন এবং পাঠকদের হাতে তুলে দিতেন একটি বলিষ্ঠ পত্রিকা। সাহসী এ কলম সৈনিক ১৮৭২ সালে দুঃখী মানুষের পক্ষে কালাকানুনের বিরুদ্ধে পত্রিকার মাধ্যমে প্রতিবাদ জানান। গ্রামে বসবাস করেও উনিশ শতকের বুদ্ধিজীবী কাঙাল হরিনাথ ১৮৬৩ সালে নীলকর সাহেব অর্থাৎ শিলাইদহের জোড়াসাঁকোর ঠাকুর জমিদারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে কৃষকদের পক্ষে প্রবন্ধ লিখে তোলপাড় সৃষ্টি করেন। এ কারণে ঠাকুর জমিদার হরিনাথকে খুন করার জন্য ভাড়াটে গুণ্ডা পাঠান। কিন্তু বাউল সাধক লালন ফকির নিজেই তার দলবল নিয়ে কাঙালকে রক্ষা করার জন্য জমিদারের লাঠিয়ালদের প্রতিরোধ করেন। লালন ফকিরের সঙ্গে তার যোগাযোগ থাকার কারণেই তিনি রক্ষা পেয়েছিলেন। অত্যাচার-জুলুম-নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার পাশাপাশি হরিনাথ সে সময় ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’কে ঘিরে লেখক গোষ্ঠী তৈরি করেন। ফলে এ পত্রিকার মাধ্যমে ঐতিহাসিক অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সুসাহিত্যিক রায় বাহাদুর জলধর সেন, দীনেন্দ্র কুমার রায়, মীর মশাররফ হোসেন, শিবচন্দ্র বিদ্যানর্ব প্রমুখ সাহিত্যিক সৃষ্টি করে গেছেন। এছাড়া দেড়শ বছর আগে সাহিত্য আড্ডা বসিয়ে তিনি যে জ্ঞানের দ্বীপ জ্বেলেছিলেন তা ছিল অনন্য এক দৃষ্টান্ত। সে সময় ওই আড্ডায় নিয়মিত সময় দিতেন মীর মশাররফ হোসেন, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় ও বাউল সম্রাট লালন ফকির। বাংলা সাহিত্যের কবি ঈশ্বর গুপ্ত এবং কাঙাল হরিনাথের ভূমিকা সম্পর্কে বলা হয়েছে, কবি ঈশ্বর গুপ্ত রাজধানী কলকাতার বৃহত্তর গুণী সমাজে অবস্থান করেও প্রাচীন ও আধুনিক যুগের সন্ধিক্ষণে তিনি রক্ষণশীল মনোভাব পোষণ করেছেন। অথচ কাঙাল হরিনাথ কুষ্টিয়ার কুমারখালীর মতো একটি ছোট শহরে বসবাস করেও তার চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক, উদার, নির্ভীক ও যুক্তিপূর্ণ মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু উপযুক্ত মূল্যায়ন এবং প্রচারের অভাবে তিনি ‘কাঙাল’ ভনিতায় বাউল গান রচনাকারী হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি বাউল সাধক ছিলেন না। তিনি ছিলেন উদার হৃদয়ের সাধক পুরুষ। এ কারণে কেউ কেউ তাকে ‘ব্রহ্ম’ ধর্মাবলম্বীও মনে করতেন।

[৬] তার জীবনের সবসময়ই ছিল গুরুত্বপূর্ণ সময় তার গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা পত্রিকাটি গ্রামীণ মানুষের আশা-আকাংক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। কৃষক-প্রজা-রায়ত-শ্রমজীবী এবং মধ্যবৃত্তের মানুষের সবচেয়ে বেশি আনুকুল্য পেয়েছিল তার এই পত্রিকাটি। পাশাপাশি অসহায় মানুষের পাশে একমাত্র আশ্রয় ছিল কাঙাল হরিনাথ। স্বদেশ শিল্প-বাণিজ্য বিকাশের এক পুরধাও ছিলেন তিনি। এই মহান ব্যক্তিত্ব সংগ্রামীময় জীবনের অনেক দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে বাংলা ১৩০৩ সালের ৫ বৈশাখ (১৮৯৬ সাল, ১৬ এপ্রিল) কাঙাল হরিনাথ কুমারখালী শহরের কুণ্ডুপাড়া গ্রামের নিজ বাড়িতে দেহত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তিনি তিন পুত্র, এক কন্যা এবং স্ত্রী স্বর্ণময়ীকে রেখে ৬৩ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন। উনিশ শতকে কুষ্টিয়ায় কাঙালের মতো এমন কৃতী পুরুষ আর দ্বিতীয়টি ছিলেন না। কুমারখালীতে একদিন কাঙাল হরিনাথ যে জ্ঞানের আলো জ্বালিয়েছিলেন, তার মৃত্যুর পর তা নিভে যায়। সূত্র : ইতিহাস ও মিথলজি, উইকিপিডিয়া

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত