কনকনে শীতের সকালে শরীর কাঁপে, নি:শ্বাস ভারি হয়ে আসে। প্রকৃতি যেন আমাদের চারপাশে কঠোর এক বাস্তবতা মেলে ধরে। আধুনিক বিজ্ঞান একে ব্যাখ্যা করে সূর্যের অবস্থান, পৃথিবীর অক্ষ ও বাতাসের গতিপথ দিয়ে। কিন্তু একজন মুমিনের দৃষ্টিতে প্রশ্ন এখানেই শেষ নয়— এই তীব্র শীত কি কেবলই আবহাওয়ার পরিবর্তন, নাকি এর পেছনে কোনো গভীর গায়েবি বাস্তবতাও রয়েছে?
রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর বর্ণিত হাদিস আমাদের এই প্রশ্নের দিকে নতুন এক দৃষ্টিতে তাকাতে শেখায়— যেখানে দুনিয়ার ঠান্ডা আমাদের মনে করিয়ে দেয় আখিরাতের এক ভয়াবহ বাস্তবতা।
বিশ্বাসই মূল ভিত্তি
এ বিষয়ে আলেমরা সর্বপ্রথম যে মূলনীতির কথা বলেন, তা হলো— একজন মুমিনের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর প্রতিটি বাণী নিঃশর্তভাবে সত্য বলে বিশ্বাস করা। কারণ আল্লাহ তাআলা কুরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন—
وَمَا يَنطِقُ عَنِ الْهَوَىٰ إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَىٰ
‘তিনি (নবী) নিজের খেয়াল থেকে কিছু বলেন না। এটি তো কেবল ওহি, যা তার প্রতি নাজিল করা হয়।’ (সুরা আন-নাজম: আয়াত ৩–৪)
এ কারণেই সাহাবায়ে কেরাম (রা.) রাসুল (সা.)–এর হাদিস বর্ণনার সময় বলতেন— ‘আস-সাদিকুল মাসদুক’—অর্থাৎ, তিনি সত্যবাদী এবং সত্যে সমর্থিত।
হাদিসে শীত ও গ্রীষ্ম সম্পর্কে কী বলা হয়েছে?
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে—
اشْتَكَتِ النَّارُ إِلَى رَبِّهَا فَقَالَتْ: يَا رَبِّ أَكَلَ بَعْضِي بَعْضًا، فَأَذِنَ لَهَا بِنَفَسَيْنِ، نَفَسٍ فِي الشِّتَاءِ وَنَفَسٍ فِي الصَّيْفِ
‘জাহান্নাম তার রবের কাছে অভিযোগ করল— হে আমার রব! আমার এক অংশ আরেক অংশকে গ্রাস করছে।’ তখন আল্লাহ তাকে বছরে দুটি নিঃশ্বাস নেওয়ার অনুমতি দিলেন—একটি শীতে, একটি গ্রীষ্মে।’
فَأَشَدُّ مَا تَجِدُونَ مِنَ الْحَرِّ مِنْ سَمُومِهَا، وَأَشَدُّ مَا تَجِدُونَ مِنَ الْبَرْدِ مِنْ زَمْهَرِيرِهَا
‘তোমরা যে প্রচণ্ড গরম অনুভব কর, তা জাহান্নামের উত্তাপ থেকে। আর যে তীব্র শীত অনুভব কর, তা-ও জাহান্নামের জমহরির (চরম ঠান্ডা) থেকে।’ (বুখারি ৩২৬০; মুসলিম ৬১৭)
অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে—
মানুষ যে ধ্বংসাত্মক গরম ও ধ্বংসাত্মক শীত অনুভব করে, তার উৎসও জাহান্নাম।
পৃথিবীর বাস্তবতার সঙ্গে এই হাদিস কিভাবে মেলে?
আলেমরা ব্যাখ্যা করেছেন— পৃথিবীর সব অঞ্চলে একসঙ্গে গরম বা ঠান্ডা অনুভূত হবে— এমন কোনো দাবি হাদিসে নেই। সূর্যের অবস্থান, সমুদ্রঘেঁষা অঞ্চল, বাতাসের প্রবাহ, বৃষ্টি, অক্ষাংশ ও ভৌগোলিক গঠন— এসব দৃশ্যমান কারণেই কোথাও শীত বেশি, কোথাও কম; কোথাও গ্রীষ্ম তীব্র, কোথাও মৃদু হয়।
ইউরোপের বহু এলাকায় গ্রীষ্ম অপেক্ষাকৃত শীতল থাকার পেছনেও সামুদ্রিক বাতাস ও নিয়মিত বৃষ্টির বড় ভূমিকা রয়েছে।
দৃশ্যমান কারণের পাশাপাশি গায়েবি কারণ
তবে আলেমরা বলেন, এখানেই বিষয়টি শেষ নয়। ইসলাম দৃশ্যমান কারণের পাশাপাশি গায়েবি বা অদৃশ্য কারণের অস্তিত্বও স্বীকার করে— যা আমরা কেবল ওহির মাধ্যমে জানতে পারি। তাদের মতে—
> সূর্যের তাপ → দৃশ্যমান কারণ
> জাহান্নামের নিঃশ্বাস → গায়েবি কারণ
ঠিক একইভাবে—
> শীতে সূর্যের দূরত্ব → দৃশ্যমান কারণ
> জাহান্নামের জমহরির নিঃশ্বাস → অন্তর্নিহিত গায়েবি কারণ
দুটোই পরস্পর বিরোধী নয়; বরং আল্লাহর কুদরতে একসঙ্গে কার্যকর।
জাহান্নামে কি গরম ও ঠান্ডা একসঙ্গে আছে?
এ বিষয়ে আলেমদের ব্যাখ্যা ভিন্ন ভিন্ন—
> কেউ বলেছেন, জাহান্নামের বিভিন্ন স্তরে ভিন্ন ভিন্ন শাস্তি রয়েছে— কোথাও আগুনের প্রচণ্ড তাপ, কোথাও তীব্র ঠান্ডা।
> আবার কেউ বলেছেন, আখিরাতের বাস্তবতা দুনিয়ার মানদণ্ডে পুরোপুরি মাপা যায় না। আল্লাহ চাইলে একই স্থানে বিপরীত দুটি অবস্থা একত্র করতেও সক্ষম।
কুরআনেই জমহরির শাস্তির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন—
لَا يَرَوْنَ فِيهَا شَمْسًا وَلَا زَمْهَرِيرًا
‘সেখানে তারা সূর্যের তাপও দেখবে না, আবার জমহরির ঠান্ডাও নয়।’ (সুরা আল-ইনসান: আয়াত ১৩)
(এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, জমহরির একটি স্বতন্ত্র শাস্তি রয়েছে।)
হাদিসের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণই সঠিক
ইমাম নববি (রহ.)–সহ বহু মুহাদ্দিসের মত হলো— এই হাদিসকে রূপক বা উপমা হিসেবে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। বরং এর বাহ্যিক অর্থই গ্রহণযোগ্য। কারণ, এতে এমন কিছু নেই যা বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ায় এমনভাবে কার্যকারণ স্থাপন করেছেন, যাতে প্রাকৃতিক কারণ ও শরিয়তি (গায়েবি) কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
হাদিস থেকে যে শিক্ষা পাওয়া যায়
শায়খ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল-উসাইমিন (রহ.) বলেছেন— যেমন সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে, আবার একই সঙ্গে সেগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্য সতর্কবার্তাও— ঠিক তেমনি গরম ও ঠান্ডার ক্ষেত্রেও প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা থাকলেও, হাদিসে বর্ণিত গায়েবি বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
শীতের কনকনে ঠান্ডা শুধু শরীরের জন্য কষ্টকর নয়—এটি মুমিনের হৃদয়ে আখিরাতের ভয় জাগানোর একটি নিদর্শন। এই ঠান্ডা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জাহান্নামের শাস্তি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। দুনিয়ার শীত ও গ্রীষ্মের মাঝেই আল্লাহ আমাদের শিক্ষা দেন— ফিরে আসো, সাবধান হও, আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নাও।
একজন ইমানদারের কর্তব্য হলো— দৃশ্যমান বাস্তবতাকে অস্বীকার না করে, ওহির আলোয় তার গভীর অর্থ অনুধাবন করা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই নিদর্শন থেকে শিক্ষা গ্রহণের তৌফিক দিন। আমিন। সূত্র: যুগান্তর