আল্লাহ যার কল্যাণ চান বান্দা তার কোনো ক্ষতিই করতে পারে না। বান্দা যখন কোনো ব্যাপারে অসহায় হয়ে যায়, আর আল্লাহ তার সহায় হয়; তার কোনো চিন্তা থাকে না। আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুল (ভারসা) রাখা এক ফিলিস্তিনি শরণার্থী হাতেনাতে পেয়ে গেলেন তার প্রমাণ। ফিরে পেলেন তার হারানো সম্পদ। এ যেন এক অলৌকিক ঘটনা। যা মুমিনের হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ইমান আরও বাড়িয়ে দেয়।
ব্রিটেনে বসবাসরত এক ফিলিস্তিনি প্রবাসী বলেন, আমার ভিসার মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি ছিল। ফিলিস্তিনি শরণার্থী হিসেবে আমার কাছে পাসপোর্টের চেয়ে দামি আর কিছুই ছিল না। আমি আমার ও পরিবারের সব নথিপত্র একটি ছোট প্লাস্টিকের ব্যাগে নিলাম এবং খুব সাবধানে হাতের মুঠোয় রাখলাম, যাতে কোনো ছিনতাইকারী তা নিতে না পারে।
সেদিন সকালে আমি আমার অফিসে গেলাম। গিয়ে দেখি—রাতের বেলা চোরেরা আমার অফিসের দরজা ভেঙে সব দামি জিনিসপত্র নিয়ে গেছে। এই দৃশ্য দেখে আমি এতটাই ভেঙে পড়লাম এবং বিধ্বস্ত হয়ে গেলাম যে, অফিসের জিনিসপত্র গোছাতে গিয়ে আমার হাতের সেই নথিপত্রের ব্যাগটির কথা ভুলেই গেলাম।
পরদিন যখন আমার মনে পড়ল, আমি হন্যে হয়ে ব্যাগটি খুঁজতে লাগলাম। গাড়ি, বাড়ি, অফিস—কোথাও তা নেই! পুলিশ আমাকে এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ করে সময় দিল। অবশেষে পুলিশের পক্ষ থেকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে চিঠি এলো যে—নির্দিষ্ট দিনে হাজির না হলে আমার অবস্থান অবৈধ হয়ে যাবে। আমার সামনে তখন মহাবিপদ।
পুলিশের কাছে যাওয়ার নির্দিষ্ট দিনটি এলো। যাওয়ার আগে আমি আমার অফিসে গেলাম কিছু কাজ সারতে। হঠাৎ আমার মনে হলো—সব তো হারিয়েই ফেলেছি, এখন একবার আমার রবের কাছে কেঁদে দেখি না ! আমি জায়নামাজে দাঁড়ালাম।
সিজদায় গিয়ে আমি হৃদয়ের সবটুকু আকুতি ঢেলে দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করলাম— "হে আল্লাহ! আপনি আমার বিপদ দূর করুন, আমার হারানো জিনিসটি খুঁজে পেতে সাহায্য করুন। আপনি ছাড়া আমার আজ আর কোনো সাহায্যকারী নেই।"
দোয়া শেষে যখন আমি সালাম ফিরালাম, ডানে সালাম ফিরিয়ে বামে তাকাতেই আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম! আমার চোখের সামনে সেই প্লাস্টিকের ব্যাগটি পড়ে আছে! আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। আমি দ্রুত ব্যাগটি হাতে নিলাম— হ্যাঁ, এটিই সেই ব্যাগ! (সুবহানাল্লাহ!)
আমি সঙ্গে সঙ্গে সিজদায়ে শোকর আদায় করলাম। আমার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আমি নিজেকে জিজ্ঞাসা করলাম— কেন আমি এই কাজটা (দোয়া ও সিজদা) অনেক আগেই করলাম না?
পরে বিষয়টি পরিষ্কার হলো— যেদিন অফিসে চুরি হয়েছিল, সেদিন আমি অস্থির হয়ে ব্যাগটি একপাশে রেখেছিলাম। অফিসের জিনিসপত্র গোছানোর সময় কিছু মালামালের নিচে ব্যাগটি ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। আজ আল্লাহর কুদরতে সেটি আমার নজরে এলো।
মানুষের সব চেষ্টা যখন ব্যর্থ হয়, তখন একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা ও দোয়াই হলো মুক্তির পথ। এ ঘটনায় নবীজি (সা.)-এর একটি হাদিসের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাহলো—
হজরত আব্দুল্লাহ বিন আববাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একদিন রাসুলুল্লাহ (স) আমাকে কিছু মূল্যবান বাণী শুনিয়েছেন যার কিয়দাংশ নিম্নরূপ— ‘কিছু চাইলে তা একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাছেই চাইবে। কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হলে তা একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাছেই কামনা করবে। জেনে রেখো, পুরো বিশ্ববাসী একত্রিত হয়েও যদি তোমার কোন কল্যাণ করতে চায় তাহলে তারা ততটুকুই কল্যাণ করতে পারবে যা তোমার জন্য বরাদ্দ রয়েছে। আর তারা সকল একত্রিত হয়েও যদি তোমার কোন ক্ষতি করতে চায় তাহলে তারা ততটুকুই ক্ষতি করতে পারবে যা তোমার জন্য বরাদ্দ রয়েছে।’
তাই অসহায় অবস্থায় আমরা কুরআনুল কারিমের একটি দোয়া করতে পারি। যেখানে বান্দার ক্ষমতা শেষ, সেখানে মাওলার দয়া শুরু। অসহায়ের সহায় হতে পারে দোয়াটি— কেননা ব্যর্থতার মুহূর্তে এটি ছিল হজরত নুহ (আ.)-এর দোয়া। তিনি দীর্ঘদিন মানুষকে দাওয়াত দিয়েছিলেন। উপহাস, প্রত্যাখ্যান আর নিরন্তর ব্যর্থতার পর অবশেষে তিনি আল্লাহর দরবারে শুধু এটুকুই বলেছিলেন—
رَبِّ أَنِّي مَغْلُوبٌ فَانْتَصِرْ
উচ্চারণ: ‘রাব্বি আন্নি মাগলুবুন ফানতাসির’
অর্থ: ‘হে আমার রব! আমি সম্পূর্ণ পরাভূত— আপনি আমাকে সাহায্য করুন।’ (সুরা আল-কামার: আয়াত ১০)
এ দোয়ায় কোনো অভিযোগ নেই, কোনো দীর্ঘ বাক্য নেই— আছে শুধু অসহায় স্বীকারোক্তি আর আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা।
সূত্র: মিন আজাইবিদ দোয়া