প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কেন লিখি, ক্ষোভে, প্রতিনিধিত্বে, নাকি বইমেলার জন্য?

কাকন রেজা

কেন লিখি, এ প্রশ্নের সবচেয়ে ভালো উত্তর দিয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ। ‘বল পয়েন্টে’ তিনি লিখলেন, ‘লেখালেখি একধরনের থেরাপি। ব্যক্তিগত হতাশা, দুঃখবোধ থেকে বের হয়ে আসার পথ। আমি এই থেরাপি গ্রহণ করে নিজের মনকে সুস্থ রাখার চেষ্টা করি।’ প্রতিটি লেখকই তাই করেন। যাদের লেখার অভ্যাস বা সুযোগ নেই, তারাও ক্ষোভ ও হতাশা থেকে সান্ত¡না অন্যার্থে থেরাপি নেয়ার নানা কসরত করেন। সেই কসরতেরও ধরন অনেক। কেউ বিক্ষোভে প্রকাশ করেন। অনেকে হয়ে উঠেন অপরাধপ্রবণ। কেউ বা বেছে নেন আত্মহননের পথ। তবে লেখকদের সাথে অন্যদের মূল পার্থক্যটা হলো, লেখক হলেন ব্যক্তির সমষ্টি। সমষ্টিগত মানুষের জীবনবোধ, জীবনাচরণকে সমন্বিত করেই গড়ে উঠে একজন লেখকের ‘ব্যক্তিগত’। অন্য কথায় ‘ব্যক্তি’র নিজটা ‘গত’ হয় লেখক হবার সাথে সাথেই।

বিষয়টি আরেকটি খোলাসা করি, হুমায়ূন আহমেদের আরেকটি উদ্ধৃতির উল্টো অর্থে। ‘আঙুল কাটা জগলু’তে তিনি বললেন, ‘একজন ঘুমন্ত মানুষের সঙ্গে আরেকজন ঘুমন্ত মানুষের কোনো প্রভেদ নেই। জাগ্রত মানুষই শুধু একজন আরেকজনের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যায়।’ লেখকরা জাগ্রত থাকেন, আর ঘুমিয়ে থাকা মানুষের সমষ্টিগত দুঃখ আর হতাশাবোধ ধারণ করেন নিজের ভেতর। আর সেইসব ধারণকৃত দুঃখ-হতাশার সেলুলয়েডই হচ্ছে লেখকের রচনা-চিত্র।

রফিক আজাদ যখন বলেন, ‘ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাব’। তখন রফিক আজাদের এই কাব্যাংশ বিশ্বের সকল ক্ষুধার্ত মানুষের হৃদয়ের ভাষা হয়ে দাঁড়ায়। যখন বলেন, ‘লাথির বিকল্পে লেখা পাঠাই মুদ্রিত অক্ষরে’। তখন ক্ষোভের স্ফুরণ ঘটে লেখাতেই। কবির এই ক্ষোভ কী শুধু তারই একান্ত, ব্যক্তিগত?

ক্ষোভের কথা থাক, বলি লেখক হওয়া নিয়ে। আমার এক পরিচিতজন আছেন। যিনি লেখক-কবিকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। মূলজন, নষ্ট জন, কষ্টজন। মূল তো মূলই। নষ্টজন হলেন, স্তুতি-স্তাবকতার রচয়িতা। যার কোনো বিষাদ নেই, ক্ষোভ নেই, যার ভুবন আনন্দময়। কষ্টজন, যিনি লেখক-কবি হবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। নিজ গাঁটের টাকা খরচ করে ফি বছর মেলাতে বই বের করছেন। যা অনেকটা আলোচিত এক শিল্পীর ভাস্কর্যের মতো, পরিচিতি না দিলে বোঝা যায় না, ওটা কার ও কিসের ভাস্কর্য।  বইমেলা শুরু হয়েছে। একাডেমির বয়ানে ‘গ্রন্থমেলা’। বই অনুরাগীরা বরাবর বইমেলাই বলেন। যে নামেই বলুক, মুশকিলটা হলো, বই বা গ্রন্থের চেয়ে মেলাটাই অনেক সময় মুখ্য হয়ে উঠে। কেন হয়ে উঠে, তার ব্যাখ্যায় না গেলাম, আপাতত বইয়ের কথা বলি। গত মেলায় নয়া কবিতার বইয়ের সংখ্যা নাকি হাজার ছাড়িয়েছিলো। এর মধ্যে নিশ্চয়ই নতুন কবির সংখ্যা অনেক। এ নিয়ে গতবারেই মৃদু অস্বস্তিতে পড়েছিলাম এবং তা লিখেও জানিয়েছি। কবি ও বইয়ের সংখ্যাই মূলত বিভ্রান্ত করেছে। জিডিপি গ্রোথের মতো হয়েছে ব্যাপারটি। যেন জিডিপির সাথে পাল্লা দিয়ে ক্রমান্বয়ে বাড়ছে কবি, লেখকের গ্রাফ। অস্বস্তিটা সেখানেই। শিল্পের মূল্য থাকলেও, সেটা পণ্য নয়, সেজন্যই।

এমন অস্বস্তি আর বিভ্রান্তিটা যে খুব ভুল ছিলো না তা এবার কিছুটা পরিষ্কার হয়েছে। করেছেন দেশের অন্যতম প্রকাশনী ‘বিদ্যাপ্রকাশে’র স্বত্বাধিকারী মুজিবর রহমান খোকা। ভয়েস অব অ্যামেরিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘৪০ বছরে ৪০ জন প্রতিনিধিত্বকারী লেখককে তুলে আনা সম্ভব হয়নি।’ এবারও মেলায় প্রায় পাঁচশো প্রকাশনীর স্টল হয়েছে। বইয়ের সংখ্যা তবে কতো? এতো শত বইয়ের মাঝে কেন প্রতিনিধিত্বকারী লেখক উঠে আসলেন না, এটা একটা বড় প্রশ্ন। বাংলা একাডেমি মেলার আয়োজনের সাথে সাথে এ ব্যাপারে একটা সাড়ম্বর গবেষণারও আয়োজন করতে পারে।

যদিও মেলা আয়োজন বাংলা একাডেমির দায়িত্ব কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন, লেখক জাকির তালুকদার। প্রশ্ন রয়েছে যোগ্যতারও। হুমায়ূন আহমেদের একটি কথা রয়েছে সম্ভবত এই রকম, ‘তুমি স্বাধীন হওয়ার যোগ্য হলেই স্বাধীনতা পাবে।’ বইয়ের নামটি মনে নেই, এটা তার নিজের কথা না, কারো উদ্ধৃতি তাও মনে পড়ছে না। তবে মেলা আয়োজনের স্বাধীনতা ও যোগ্যতার প্রশ্নে এই উদ্ধৃতির কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। মনে ধরার মতো বলেই কথাটা বলা। আমরা তো কতোই ‘কথার কথা’ বলি, লিখি। সব লেখাই কী প্রতিনিধিত্ব করে, সব লেখকই কী প্রতিনিধিত্বকারী?

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত