প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সত্য পরবর্তী যুগের সংবাদ দর্শন

নূর মাজিদ : আধুনিক গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকতার সূচনা ১৭ শতকের মাঝামাঝি সময়ে হলেও মানবজাতির সঙ্গে সংবাদের পরিচয় আরো প্রাচীন। সভ্যতার শুরু থেকেই এই উপাদান সকল মানব সম্প্রদায়ের সামাজিক রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করেছে। প্রস্তরযুগে যখন গুহাবাসী মানুষের আদি পুরুষেরা দলবদ্ধ অবস্থায় বসবাস করতো তখনো তাদের মাঝে সংবাদের আদানপ্রদানের বিষয়টি ছিলো। বিশেষ করে, সেই সময়ের মানব সমাজ পশু শিকার এবং আবাস্থল পরিবর্তনে অগ্রিম সংবাদের ওপর নির্ভর করতো। এই ক্ষেত্রে কোনো এলাকায় শিকারে যাওয়ার পূর্বে তারা আগাম অনুসন্ধানী দল পাঠাতো, যাদের প্রধান কাজ ছিলো ওই এলাকায় শিকারের পশুর পালের অবস্থান এবং সম্ভাব্য বিপদ স¤পর্কে মূল দলকে অবহিত করা। সংবাদের এই যে সমাজকে সতর্ক করার প্রক্রিয়া তা এখন আধুনিক গণমাধ্যমের অন্যতম একটি পরিচালক নীতি। সাংবাদিকতার অভিধানে এই প্রক্রিয়াকে সারভেইল্যান্স বলা হয়। সারভেইল্যান্স ছাড়াও বিনোদন, সচেতনতা সৃষ্টি, সমাজে শিক্ষা ও জ্ঞানের প্রসার গণমাধ্যমের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। পাঠককে নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় সংবাদ পরিবেশন করার পাশাপাশি একটি আদর্শ সংবাদমাধ্যমকে এই সকল দায়িত্বও পালন করতে হয়।

বিগত দুই দশকে আধুনিক গণমাধ্যম একটি নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, শীতযুদ্ধের অবসান এবং নাগরিক জীবনে তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার বৃদ্ধি এখন সংবাদ জগতে নতুন এক অধ্যায় শুরু করেছে। যেখানে ব্যক্তি স্বতন্ত্রতা অনুযায়ী পাঠকরা তাদের পছন্দের খবরাখবর অতি সহজেই নিজের ফোন বা ল্যাপটপে ঘরে বসেই পাঠ করতে পারেন। তবে প্রযুক্তির বিকাশ এবং বিশ্বজুড়ে মুক্ত অর্থনীতিভিত্তিক বাণিজ্যিক স্বার্থের এই যুগে দেশ এবং সংস্কৃতি ভেদে আংশিক সত্যকেন্দ্রিক সংবাদ পরিবেশনের এক নতুন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই প্রবণতার কারণেই এডওয়ার্ড হারম্যান, নোয়াম চমস্কি, নরম্যান ফ্লিঙ্ক্যানস্টেইনের মতো বুদ্ধিজীবীরা এই সময়কে সত্য পরবর্তী যুগ বলে অবহিত করেছেন। কারণ আংশিক সত্য অনেক ক্ষেত্রেই স¤পূর্ণ মিথ্যার চাইতেও বেশি মারাত্মক প্রভাব ফেলে সমাজে, যা মানুষকে সত্য বিমুখ করে তোলে। এই ধরনের সংবাদ পরিবেশনের চর্চা দীর্ঘদিন ধরেই দেশে-বিদেশে সংবাদ মাধ্যমের নৈতিকতাকে বিতর্কিত করে তুলেছে।

পশ্চিমের সচেতন ব্যক্তিরা এখন অনেকেই প্রচলিত গণমাধ্যমের পরিবেশিত খবরের ওপর আস্থাও হারিয়ে ফেলছেন। যা মোটেই অন্যায্য নয়। মূলত, সত্য পরবর্তী যুগ এক নতুন ধরণের বিকাশমান হলদে সাংবাদিকতার রূপ। যার সঙ্গে সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক স¤পর্কের গভীর সংযোগ রয়েছে। হারম্যান ও চমস্কি তাদের ম্যানুফ্যাকচারিং মিডিয়া কনসেন্ট তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গণমাধ্যমের মূল পাঁচটি সেন্সর বা ফিল্টার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করেছেন। যেগুলো তাদের প্রপাগান্ডা মডেলের অপরিহার্য অংশ। গণমাধ্যমের মালিকানা, বিজ্ঞাপন দাতার সঙ্গে তাদের স¤পর্ক, গণমাধ্যমের প্রচলিত বিশ্বাস এবং অভিজাতদের বিশ্বাস ও সংজ্ঞা, ফ্লাক বা প্রচলিত ধারার বাহিরে গেলেই গণমাধ্যম কর্মীদের বিরুদ্ধে সামস্টিক ব্যবস্থাগ্রহণ বা তাদের একঘরে করে ফেলা এসবই এই প্রক্রিয়ার অংশ। এছাড়াও, আংশিক সত্য বা বিভ্রান্তিকর সংবাদ পরিবেশনের অংশ হিসেবে আধুনিক গণমাধ্যম একটি কল্পিত শত্রুর জন্ম দেয়। যার বিরুদ্ধে তারা টানা প্রপাগান্ডা চালিয়ে যায়। বর্তমান বিশ্বে একাধিক ঘটনার উদাহরণ দিয়ে এই মডেলকে ব্যাখ্যা করা যায়। যেমন, সাম্প্রতিক সময়ে চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো চীনের অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে ভবিষ্যৎ হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করছে। আবার, ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখলের সময়েও রুশ গণমাধ্যম দাবি করে ক্রিমিয়ার জনগণের ইচ্ছেতেই সেখানে রাশিয়া সমর্থন দিয়েছে। এই সকল সংবাদের প্রচারণার প্রক্রিয়া উল্লেখিত সময়ে দুই ধরনের রাজনৈতিক অবস্থান, জাতীয়তাবাদী কায়েমি স্বার্থ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের সংবাদ কাঠামোয় বিরোধীদের মতামতকে অগ্রাহ্য করা হয়। ফলে বস্তুনিষ্ঠতা হারিয়ে আধুনিক যুগে সংবাদ পরিদর্শন যে এক অন্ধকার সত্য পরবর্তী যুগে প্রবেশ করছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত