প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সিনহা আপিল বিভাগে পদোন্নতি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন?
প্রথম আলোর মিজানুর রহমান খানও সিনহার সমালোচনা করেছেন

মোহাম্মদ আলী বোখারী, টরন্টো থেকে : ২০০৯ সালে আমি ‘লোয়ার গেস্ট্রোইনটেস্টিনাল’ ক্যান্সারে আক্রান্ত হই। দুঃখজনকভাবে ডাক্তাররা তা প্রায় ছয় মাস পর নিরূপণে সক্ষম হন। দিন শেষ হয়ে আসছে এই ভেবে আমার শারীরিক দুর্গতি ও মানসিক চাপ বেড়ে যায়। রেডিয়েশন ও কেমোথেরাপির চিকিৎসা চলে। দ্বিতীয় কেমোথেরাপির পর এতোটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম, স্রষ্টার কাছে তীব্র ব্যথা ও যন্ত্রণার পরিবর্তে জীবন নেয়ার প্রার্থনা করেছিলাম।

এ সময় আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের কাছ থেকে ফোন পেলাম এবং জানালেন সরকার আমাকে অ্যাপিলেট ডিভিশনে পদোন্নতির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমি আমার দুর্গতি ও বেঁচে থাকবো কি না ব্যাখ্যা করে তা প্রত্যাখ্যান করি। উপরন্তু ডাক্তাররা জানতেন না, চিকিৎসার ছয় সপ্তাহ পর কী হবে। তিনি জানালেন, বাংলাদেশের সবাই ও সরকার আশা করছে আমি সেরে উঠবো এবং অ্যাপিলেট ডিভিশনে না গেলে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার শুনানি সম্ভব নয়। আমি তাকে জানালাম, আমার শারীরিক অসুস্থতায় এ দায়িত্ব নেয়া সম্ভব নয়। ছয়-সাত দিন পর তিনি আবারও ফোন করে শারীরিক খোঁজ নিলেন। এ সময় আমার কেমোথেরাপিতে দুই বা তিনটি রেডিওথেরাপির সেশন শেষ হয়েছে। বললাম, বমিভাব চলে গেছে, কিছু তরল খাবার খাচ্ছি। তিনি অনুরোধ জানিয়ে চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরতে বললেন এবং জানালেন প্রয়োজনে দেশে ফেরার বিশেষ ব্যবস্থাটিও সরকার করবে।

ভাবলাম এতো অর্থ খরচ করে সিঙ্গাপুরে থাকার চেয়ে বাংলাদেশে ফিরে যাই। সেভাবে মধ্য জুনে ঢাকায় ফিরি। ২০০৯ সালের ১৫ জুলাই মো. আবদুল আজিজ, বি কে দাস ও এ বি এম খায়রুল হকের সঙ্গে আমি শপথ নেই। আমি ছিলাম কনিষ্ঠতম জজ। শিকদার মকবুল হককেও ছাড়িয়ে গেলাম। সুপারসেশনের ক্ষেত্রে আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না, কিন্তু প্রথম আলোর সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান আমার সমালোচনা করেন। শিকদার মকবুলের মেয়াদ ছয় মাসের বেশি ছিল, আমাকে পরেও জায়গা করে দেয়া যেত। এই সুপারসেশনের ফলে বিচারপতি শিকদার মকবুল ও তার পরিবার আমার উপর ক্ষুব্ধ ছিলেন।

পরে জানতে পারি প্রধান বিচারপতিই বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আপিল শুনানির ক্ষেত্রে তফাজ্জল ইসলাম, মো. আবদুল আজিজ, বি কে দাস, মো. মোজাম্মেল হোসেন ও আমাকে নিয়ে বেঞ্চটি গঠন করেন। এক্ষেত্রে যদিও সেখানে ছয় জনের মতো সিনিয়র জজ ছিলেন, সবাই বেঞ্চে বসার উপযোগী ছিলেন না, কেউ অস্বস্তিতে ছিলেন এবং হাইকোর্ট ডিভিশনে আগেই ফজলুল করিম ও এ বি এম খায়রুল হক আপিল শুনানিটি করেছেন। এখানে সরলীকরণটি পরিস্কার কেন আমি শিকদার মকবুল হোসেনকে অতিক্রম করেছি। সব বিচারকই সিনিয়র ও দক্ষ ছিলেন, তবু আমাকে ছাড়া বেঞ্চে তাদের ক্রিমিনাল ল সম্পর্কিত ধারণা কম ছিল এবং সিভিল বিষয়াবলিতে তাদের স্বাচ্ছন্দ্য ছিল। শপথের পর চূড়ান্ত চেক-আপের জন্য আমি সিঙ্গাপুর গিয়েছিলাম, ডাক্তারদের বিশ্বাস চিকিৎসার ফলাফল ভাল, মাত্র ১০-১৫ ভাগ ক্রটিপূর্ণ। এ সময় আমার নাতনীর ভূমিষ্ঠের সংবাদে তাকে দেখায় ব্যাকুল হই। সিঙ্গাপুরে সিদ্দিকী নামের এক শুভাকাক্সক্ষী আছেন, চিকিৎসাকালীন তার সহযোগিতা ভুলবার নয়, যদিও তিনি আমার পূর্ব-পরিচিত নন। তাকে বলেছিলাম, পরিবারের কনিষ্ঠতম এ সদস্যের জন্য একটি স্বর্ণের চেইন কেনায় সাহায্য করতে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা শেষে আমি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলাম আমার চিকিৎসার দ্বিতীয় অভিমত নিতে। ডাক্তাররা মেডিক্যাল রেকর্ড ও রক্তপরীক্ষা শেষে পরামর্শ দিয়েছেন সব কাগজ ফেলে দিতে এবং একমাত্র সিঙ্গাপুরের ডা. চোংয়ের পরামর্শ মতো চলতে, কেন না তিনি বিশ্বের সেরা অনকোলজিস্ট হিসেবে আমাকে পরিপূর্ণ সারিয়ে তুলেছেন। তারা আরও বলেছেন, যদি আমি যথোপযুক্ত ডাক্তারের চিকিৎসা না নিতাম, তবে আমার ভাগ্য ভিন্ন হতো।
দ্রষ্ট্রব্য: ধারাবাহিক পর্যায়ে বিচারপতি সিনহা রচিত বইয়ের পঞ্চম অধ্যায়ের চুম্বকাংশগুলোই এখানে তুলে ধরা হয়েছে।

ই-মেইল[email protected]

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত