প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

৫ বছরে ১০০৮ নারী গণধর্ষণের শিকার

ডেস্ক রিপোর্ট : সারা দেশে বাড়ছে ধর্ষণ। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও নারী-শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে গত পাঁচ বছরে সারা দেশে তিন হাজার ৭১৯ নারী-শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এরমধ্যে ২০১৪ সালে ৭০৭ জন, ২০১৫ সালে ৮২০ জন, ২০১৬ সালে ৭০৪ জন, ২০১৭ সালে ৮৭৫ জন ও ২০১৮ সালে ৬১৩ জন। এই সময়ে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৮ জন। আর একক ধর্ষণ হয়েছেন ২ হাজার ২৯২ জন। গড়ে প্রতিদিন ২ জন ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হন। সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, মাদকের ভয়াবহতা, সামাজিক অস্থিরতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মনোভাব, পর্নোগ্রাফির ছড়াছড়ি থাকার কারণে এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে স্বাভাবিক মানসিকতার বিকৃত রূপ ধারণ করছে।

এছাড়া দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া, বিচারে দীর্ঘসূত্রতার কারণে এর পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।

আসকের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে একক ধর্ষণ হয়েছেন ৩৮৭ জন, গণধর্ষিত হয়েছেন ২১৮ জন, ধর্ষণের ধরন জানা যায়নি ৩১ জনের। ২০১৫ সালে একক ধর্ষিত হয়েছেন ৪৮৪ জন, গণধর্ষিত হয়েছেন ২৪৫ জন ও ধর্ষণের ধরন জানা যায়নি ২৩ জনের। ২০১৬ সালে একক ধর্ষিত হয়েছেন ৪৪৪ জন, গণধর্ষিত হয়েছেন ১৯৭ জন ও ধর্ষণের ধরন জানা যায়নি ১৮ জনের, ২০১৭ সালে একক ধর্ষিত হয়েছেন ৫৯০ জন, গণধর্ষিত হয়েছেন ২০৬ জন ও ধর্ষণের ধরন জানা যায়নি ২২ জনের এবং ২০১৮ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত একক ধর্ষিত হয়েছেন ৩৮৭ জন, গণধর্ষিত হয়েছেন ১৫২ জন ও ধর্ষণের ধরন জানা যায়নি ২১ জনের।

শুধু ধর্ষণ আর গণধর্ষণ নয়, ধর্ষণের পর হত্যা করা হচ্ছে নারী-শিশুকে। আসক বলছে গত পাঁচ বছরে হত্যা করা হয়েছে ২৬১ জনকে। এরমধ্যে ২০১৪ সালে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৬৮ জনকে, ২০১৫ সালে ৬০ জন, ২০১৬ সালে ৩৭ জন, ২০১৭ সালে ৪৭ জন ও ২০১৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৪৯ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া একই সময়ে ধর্ষণের কলঙ্ক সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন ৩৮ জন নারী। এরমধ্যে ২০১৪ সালে ১৩ জন, ২০১৫ সালে ২ জন, ২০১৬ সালে ৬৫ জন, ২০১৭ সালে ১০৪ জন ও ২০১৮ সালে ৭৮ জন।
আসকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত শূন্য থেকে ৬ বছর বয়সী ২৩৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর বাইরে ৭-১২ বছর বয়সী ৬৩৪ শিশু, ১৩-১৮ বছর বয়সী ৭৩২ জন নারী, ১৯-২৪ বছর বয়সী ১৩১ জন নারী, ২৫-৩০ বছর বয়সী ৯৩ নারী এবং ৩০ বছরের ওপরে আরো ৭১ নারী। একই সময়ে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন কিন্তু বয়স উল্লেখ করা হয়নি এমন নারী রয়েছেন ১ হাজার ৫৪১ জন।

চলতি মাসের ১০ তারিখ রাতে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলায় এক নারী গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। রাত সাড়ে ৮টার দিকে ওই নারী হেঁটে উপজেলার বারপাড়া বাজারে যাচ্ছিলেন। এ সময় পাঁচ দুর্বৃত্ত তার পথরোধ করে পাশের কলাবাগানে নিয়ে যায়। পরে তার মুখ চেপে ধরে গণধর্ষণ করে। এ সময় তার চিৎকারে লোকজন এগিয়ে এলে ধর্ষকরা পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় ধর্ষিতা বাদী হয়ে থানায় মামলা করেন। পুলিশ ঘটনায় জড়িত দু’জনকে গ্রেপ্তার করেছে। গত ২৭শে আগস্ট রাজধানীর গুলিস্তান এলাকায় গণধর্ষণের শিকার হন চাঁদপুর ফরিদগঞ্জ উপজেলার পূর্ব সাকুয়ার এক নারী। তিনি চাকরির উদ্দেশ্যে ঢাকায় এসে দুঃসর্ম্পকের এক আত্মীয়ের বাসায় উঠেছিলেন। সেখানেই তিনি ধর্ষিত হয়েছেন। তিন দুর্বৃত্ত ওই নারীকে গণধর্ষণ করে মারাত্মক আহত অবস্থায় ফেলে রেখে যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে। পরে হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসিতে) চিকিৎসা দেন।

সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, ধর্ষণ একটি সামাজিক অসুখ। ধর্ষণের ঘটনা নতুন কিছু নয়। আগেও নারীরা ধর্ষণের শিকার হয়েছে এখনো হচ্ছেন। তবে, এখন হয়তো ধর্ষক ধর্ষণের কৌশল পরিবর্তন করেছে। মানুষ যখন মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় তখন একে অপরকে হেয় করার প্রতিযোগিতা চলে। আর প্রতিপক্ষ যদি নারী হয় তাহলে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করার জন্য ধর্ষণটাই বেছে নেয়া হয়। তিনি বলেন, আমাদের সমাজে শারীরিক সুস্থতার বিষয় যতটুকু গুরুত্ব পাচ্ছে সে তুলনায় সামাজিক সুস্থতা অনেকটা উপেক্ষিত। বিপরীত লিঙ্গের মানুষকে আমাদের কিভাবে সম্মান দেয়া দরকার সেটা আমরা দিচ্ছি না এবং তাদের সমান মানসিকতা দিয়ে মেনে নিতে পারছি না। ধর্ষণের প্রবণতা সমাজের দুই শ্রেণির মানুষের মধ্যে রয়েছে বলে এই সমাজবিজ্ঞানী মনে করেন। আর সেটা একেবারে উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মানুষের মধ্যে। উচ্চবিত্তরা অর্থ ক্ষমতা, প্রভাবপ্রতিপত্তি দিয়ে সবকিছু বিচার করে। আর নিম্নবিত্তরা মূলত জিদ ও কাউকে সমাজে হেয় করার চিন্তা থেকে ধর্ষণের বিষয়টি সামনে আনে। এ ছাড়া ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে যৌন উত্তেজক ভিডিও, সিনেমার সঙ্গে অতি দ্রুত পরিচিত হওয়ার কুফল। তাদের মধ্যে এক অপরের প্রতি সম্মান শ্রদ্ধা, সামাজিক সহনশীলতার বিষয়টি তৈরি হচ্ছে না।

ধর্ষকদের বিচার নিয়ে এই অপরাধ বিজ্ঞানী বলেন, বিচারের দীর্ঘসূত্রতার জন্য ধর্ষণ বাড়ছে। কারণ একটি সামাজিক অপরাধের বিচার ছয় মাসের মধ্যে হওয়া উচিত। একটি ঘটনা শেষ না হতে হতে দেখা যায় অন্য একটি ঘটনা সামনে চলে আসে। তখন আগের বিষয়টি কম গুরুত্ব পায়। আর বিচারে যখন দীর্ঘায়িত হয় তখন অপরাধীরা সাহস পায়।
সূত্র : মানবজমিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত