সবুজে ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর পরিচ্ছন্ন পরিবেশের জন্য নাগাল্যান্ডের খোনোমা গ্রাম যেকোনো ভ্রমণপিপাসুর তালিকায় জায়গা করে নেওয়ার মতো। তবে এটি কোনো চেনা-পরিচিত পর্যটনকেন্দ্র নয়। এখানে নেই জমজমাট নাইটলাইফ, ভিড়ঠাসা এলাকা বা পকেটমারের ভয়।
বরং খোনোমা এমন এক গ্রাম, যেটি কম বর্জ্য উৎপাদন, টেকসই জীবনযাপন এবং পারস্পরিক বিশ্বাস ও নাগরিক দায়িত্ববোধের অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছে।
এমন উদাহরণ বিভিন্ন দেশের অনেক শহরে আজ ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। ভালো জীবনের খোঁজে বড় বড় শহরে গিয়ে মানুষ শেষ পর্যন্ত বিষাক্ত বাতাসে শ্বাস নেয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকে এবং দূষিত পানীয় পায়। এর ঠিক উল্টো চিত্র খোনোমায়। এটি শান্ত, ছোট, পরিচ্ছন্ন এবং কংক্রিটের জঙ্গলের সম্পূর্ণ বিপরীত।
১৯৯৮ সালে খোনোমা নেচার কনজারভেশন অ্যান্ড ট্রাগোপান স্যাংচুয়ারি (কেএনসিটিএস) প্রতিষ্ঠার পর থেকেই গ্রামটি পরিচিতি পেয়েছে ভারতের প্রথম ‘গ্রিন ভিলেজ’ হিসেবে।
খোনোমায় শিকার নিষিদ্ধ
প্রায় ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত খোনোমা গ্রামটি আঙ্গামি উপজাতির আবাসস্থল। একসময় এই উপজাতির মধ্যে শিকার একটি প্রচলিত প্রথা ছিল, যা ১৯৯৮ সালে নিষিদ্ধ করা হয়।
২০১১ সালের জনশুমারী অনুযায়ী, গ্রামটির জনসংখ্যা প্রায় ২ হাজার এবং পরিবার সংখ্যা ৪২৪টি।
শিকার বন্ধ হওয়ার পর গ্রামবাসীরা নিজেদের জীবনধারা বদলে নেয়। বর্তমানে আঙ্গামি নাগা জনগোষ্ঠী বনজ সম্পদ, কৃষিকাজ ও পশুপালনের ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করে।
দোকানি ছাড়াই চলে দোকান
খোনোমার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো এখানকার মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস ও সম্মানবোধ। সাধারণত সন্ধ্যা নামলেই দোকানপাট বন্ধ করে তালা লাগানো হয়। কিন্তু খোনোমায় চিত্রটা সম্পূর্ণ আলাদা।
এখানে শুধু দোকান বন্ধ করা হয় না, অনেক দোকান চলে দোকানদার ছাড়াই। বহু ট্রাভেল ব্লগার এই বিষয়টি তুলে ধরেছেন। প্রতিটি পণ্যের গায়ে দাম লেখা থাকে। প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে মানুষ নিজেই দাম দিয়ে যায়।
গ্রামবাসীরা এতটাই একে অপরের ওপর বিশ্বাস রাখে যে প্রতারণার আশঙ্কাই থাকে না। শুধু দোকান নয়, বাড়ির দরজাও তালাবদ্ধ থাকে না। রয়েছে একটি কমিউনিটি লাইব্রেরি। সেখান থেকে বই নিয়ে পড়া যায় এবং পড়ে ফেরত দেওয়া যায়। কেউ চাইলে নিজের বই সেখানেই দানও করতে পারেন।
খোনোমায় কী কী করবেন
ছোট গ্রাম হলেও খোনোমায় ঘুরে দেখার মতো অনেক কিছু আছে। অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্য, মনোমুগ্ধকর ল্যান্ডস্কেপ, গাইডেড নেচার ওয়াক ও ট্রেকিং—সব মিলিয়ে এখানে একঘেয়েমির কোনো সুযোগ নেই।
এখানকার অন্যতম দর্শনীয় স্থান হলো খোনোমা দুর্গ। উনিশ শতকে এই দুর্গেই আঙ্গামি নাগা উপজাতি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। সেই সময় গ্রাম থেকে জোর করে মানুষকে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক হিসেবে নেওয়ার প্রথার বিরোধিতা করেছিল তারা।
যে শিক্ষা দেয় খোনোমা
নাগাল্যান্ডের খোনোমা কোনো সাধারণ পর্যটনকেন্দ্র নয়। এটি এমন এক জায়গা, যা সম্প্রদায়ভিত্তিক মূল্যবোধে গড়ে ওঠা টেকসই জীবনযাপন ও সামাজিক দায়িত্ববোধের বাস্তব শিক্ষা দেয়।
সূত্র : এনডিটিভি