স্পোর্টস ডেস্ক : বিশ্বকাপ ফুটবলে মরক্কোর বিস্ময়কর যাত্রা চলছেই। শক্তিশালী ইউরোপীয় দলগুলোকে হারানোর ধারাবাহিকতাও অক্ষুণ্ণ রাখলো আফ্রিকার এই দেশটি। গত আসরেও মাগরেবের এই দেশটি হারিয়েছিলো স্পেন, পর্তুগাল এবং বেলজিয়ামের মতো শক্তিশালী দলকে। ২০২২ সালের আসরে সেমিফাইনাল পর্য্ত গিয়েছিল তারা। এবারের আসরেও দ্বিতীয় রাউন্ডের নক আউট ম্যাচে শক্তিশালী নেদারল্যান্ডকে হারিয়ে পরের রাউন্ডে উঠে গেছে দেশটি।
২০২৬ বিশ্বকাপ আসরে প্রথম ম্যাচেই পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে রুখে দিয়ে যাত্রা শুরু করে ফিফা র্যাংকিং এ ছয় নম্বরে থাকা দলটি। সেই খেলাটি ১-১ গোলে ড্র হলেও মরক্কো জেতার মতোই খেলেছিলো এবং ব্রাজিলের বিরুদ্ধে মধ্যমাঠের নিয়ন্ত্রণ করে। ------ বিবিসি বাংলা
এর পরের খেলায় ইউরোপের দল স্কটল্যান্ডকে নিয়ন্ত্রিত ফুটবল খেলে ১-০ গোলে হারায় এবং গ্রুপের শেষ ম্যাচে হাইতিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে ব্রাজিলের সমান পয়েন্ট পেলেও গোল ব্যাবধানে দ্বিতীয় স্থানে থেকে গ্রুপ পর্যায় শেষ করে। নেদারল্যান্ডের সাথে দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচটি নির্ধারিত সময়ে ১-১ গোলে ড্র হয়। অতিরিক্ত সময়ে সুফিয়ান রহিমি সহজ সুযোগ নষ্ট না করলে ম্যাচটা হয়তো টাইব্রেকারেই গড়াতো না। তবে, সেখানে ৩-২ এ জেতে মরক্কো।
পরের রাউন্ডে, রাউন্ড অব সিক্সটিনে মরক্কোর প্রতিদ্বন্দ্বী হবে স্বাগতিক কানাডা। আগামী শনিবার হিউস্টনে ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে। এই কানাডাকেই গত আসরে ২-১ গোলে হারিয়েছিলো মরক্কো। ইতিহাস, দলীয় সামর্থ্য এবং সাম্প্রতিক ফর্ম বিবেচনা করলে আবারো আফ্রিকার দেশটিই ফেভারিট এবং প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল করলে দলটি টানা দ্বিতীয়বারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে যাবে।
মরক্কোর এই অভাবনীয় ফলাফলের অন্যতম কান্ডারী দলের গোলকিপার ইয়াসিন বুনো। তিনি কেবল নির্ধারিত সময়েই দারুন সেভ দেন না, খেলা টাইব্রেকারে গড়ালে গোলবারে তিনি প্রাচীর হয়ে উঠেন। নেদারল্যান্ডের সাথে ম্যাচটিতেও তিনি সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন।
নির্ধারিত সময়ের খেলা এবং অতিরিক্ত ৩০ মিনিট খেলার পর ১-১ অবস্থায় শেষ হলে খেলা টাইব্রেকারে গড়ায়। সাডেন ডেথে যাওয়া টাইব্রেকারে নেদারল্যান্ড ৩টি শট মিস করে যার একটি বুনো অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন এবং তার শরীরি উপস্থিতিতে ভড়কে গিয়ে ডাচরা বাকি দুইটি মিস করে।
বুনো গত আসরে স্পেনের বিপক্ষেও টাইব্রেকারে তিনটি শট ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন।
বিশ্বকাপের সামনের ম্যাচগুলোতে মরক্কোর অন্যতম কৌশল হবে খেলায় জিততে না পারলেও জমাট রক্ষণে ড্র নিশ্চিত করা এবং টাইব্রেকারে নিয়ে যাওয়া। সেখানে তারা বুনোর উপর ভরসা করতেই পারে।
গোলের ব্যাপারে মরক্কো ভরসা করবে ইসমাইল সাইবারীর উপরে। গ্রুপের তিন ম্যাচের প্রতিটিতেই তিনি একটি করে গোল দিয়েছেন। নেদারল্যান্ডের সাথে নির্ধারিত সময়ে গোল না পেলেও শ্বাসরুদ্ধকর টাইব্রেকারের শেষ শটটিতে গোল দিয়ে তিনি জয় নিশ্চিত করেছেন। সাইবারী যেরকম ফর্মে আছেন তা বিপক্ষ দলগুলোর জন্য ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
মরক্কোর এই স্কোয়াডের ২৬ জনের মধ্যে মাত্র আট জন মরক্কোতে জন্মেছেন এবং বাকি ১৮ জনেরই জন্ম অন্য কোনো দেশে। এদের মধ্যে স্পেনে পাঁচ জন, ফ্রান্সে পাঁচ জন, নেদারল্যান্ডসে তিন জন, বেলজিয়ামে তিন জন, কানাডায় একজন এবং জার্মানিতে একজন।আটলাসের সিংহ নামে পরিচিত মরক্কো দলটি দারুণ পরিকল্পনা করে বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মরক্কো বংশোদ্ভুতদের নিয়ে দল সাজিয়েছে। বিশ্বের সেরা লীগগুলোতে খেলা খেলোয়াড়দের মরক্কোর হয়ে খেলার জন্য দেশটি উদ্যাগ নিয়েছে।
মরক্কোর এই উত্থান ছিল বহু বছরের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার ফল। ২০০৮ সালে মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ দেশটির ফুটবলের উন্নয়নে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় প্রকল্প হাতে নেন। এর অধীনে রাজধানী রাবাতের কাছে আন্তর্জাতিক মানের 'মোহাম্মদ ষষ্ঠ ফুটবল একাডেমি' গড়ে তোলা হয়। এই বিশ্বমানের একাডেমি থেকেই উঠে এসেছেন ইউসুফ এন-নেসিরি, নায়েফ আগুয়ের্দ এবং আজুদিন উনাহির মতো কাতার বিশ্বকাপের মূল তারকারা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রবাসী প্রতিভারা।
মরক্কো ফুটবল ফেডারেশন ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা মরোক্কান বংশোদ্ভূত প্রতিভাদের খুঁজে বের করার জন্য দারুণ স্কাউটিং নেটওয়ার্ক তৈরি করে। আশরাফ হাকিমি (স্পেনে জন্ম) এবং হাকিম জিয়াশের (নেদারল্যান্ডসে জন্ম) মতো তারকারা ইউরোপের বড় দলে খেলার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও মরক্কোকে বেছে নেন।
এর আগে দেখা যেত, আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিভাদের গ্রাস করে নেয় ফ্রান্সসহ নানা ইউরোপীয় দেশ। উন্নত জীবনের টানে অভিবাসীরা সেসব দেশের হয়ে লড়াই করেন। সেই দ্বিতীয় বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা থেকে ইতালিতে যাওয়া অভিবাসীরা থেকে ২০১৮তে একগাদা আফ্রিকান অভিবাসীর সন্তানদের নিয়ে গড়া দল ফ্রান্স যুগে যুগে বিশ্বকাপ জয় করেছে। পরিবর্তিত দুনিয়ায় মরক্কো দেখালো যে, এর উল্টোটাও হয়।
গতবারের সেমিফাইনাল খেলাটা যে অপ্রত্যাশিত সাফল্য ছিল না, মরক্কো তা প্রমাণ করে দেখাচ্ছে। গত চারবছরে র্যাঙ্কিং এ দারুন উন্নতি করা দলটি এই বিশ্বকাপেও দলগুলোর সাথে টক্কর দিচ্ছে। আগামী ২০৩০ বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক মরক্কো যদি ২০২২ বিশ্বকাপের মতো চলতি আসরেও সেমিফাইনাল বা আরো সামনে এগিয়ে যায় তবে তা মোটেই কোনো অবাক ব্যাপার হবে না।